বাজেট ভাবনা

আপডেট : ১৮ মে ২০১৪, ১৯:৫০
১১ মে বিশ্ব মা দিবসে জাতীয় প্রেসক্লাবে ‘বাজেট ভাবনা:সংগ্রামে উন্নয়নে দারিদ্র্য বিমোচনে মা’ শীর্ষক আলোচনা সভা অনুষ্ঠিত হয়। যৌথভাবে এই আলোচনা সভার আয়োজন করে দৈনিক ইত্তেফাক ও বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থা ডর্প। ইত্তেফাকের ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক তাসমিমা হোসেনের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি ছিলেন জাতীয় সংসদের স্পিকার ড. শিরীন শারমিন চৌধুরী। বিশেষ অতিথি ছিলেন অর্থ ও পরিকল্পনা প্রতিমন্ত্রী এম এ মান্নান। আলোচক হিসেবে উপস্থিত ছিলেন সংসদ সদস্য শিরীন আক্তার ও কেয়া চৌধুরী, এ্যাকশন এইডের কান্ট্রি ডিরেক্টর ফারহা কবির, ভাস্কর শিল্পী ফেরদৌসি প্রিয়ভাষিনী, কবি রুবী রহমান, সাংবাদিক নাদিম কাদের, শিল্পী ফাহমিদা নবী, সহকারী উপ-পুলিশ কমিশনার মুক্তা ধর, ডর্পের লিগ্যাল এন্ড মিডিয়া উইংয়ের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার সাদিরা খাতুন প্রমুখ। অনুষ্ঠানে মূল প্রবন্ধ পাঠ করেন ডর্পের প্রতিষ্ঠাতা এ এইচ এম নোমান। ড. শিরীন শারমিন চৌধুরী মায়ের উন্নয়ন মানে জাতির উন্নয়ন, দেশের উন্নয়ন। তাই মায়ের উন্নয়নের জন্য মাতৃ স্বাস্থ্যসেবা, কর্মসংস্থানে নারীবান্ধব পরিবেশ নিশ্চিত করা এবং দক্ষতা অর্জনে প্রশিক্ষণসহ উদ্যোক্তা তৈরিতে প্রণোদনা দিতে হবে। আর তাই আসন্ন বাজেটে ৪০টি মন্ত্রণালয় যুক্ত করে জেন্ডার সংবেদনশীল করলেই হবে না, বরাদ্দ কোথায় কিভাবে খরচ করা হবে সেদিকেও তদারকি করতে হবে, যেন তা যথাযথভাবে বাস্তবায়ন হয়। নারীর ক্ষমতায়ন ও বাজেট ভাবনায় মা বিষয়টা পূর্বের বাজেট থেকে বেশি গুরুত্ব পাচ্ছে। আমাদের বাজেটে নিরাপত্তা বেষ্টনী হিসেবে বয়স্ক ভাতা, প্রতিবন্ধী ভাতা যেমন গুরুত্ব পেয়েছে, তেমনি হতদরিদ্র নারীর জন্য মাসে ৩০ কেজি চাল দেয়া ও বিধবা ভাতা এসব বিষয়ও আছে। গত বাজেটে নারী উদ্যোক্তাদের জন্য ১০০ কোটি টাকার বাজেট বরাদ্দ রাখা হয়েছে। কিন্তু তা খরচ করা যায়নি বলে এবছর তা কমিয়ে আনা হবে। অনেক নারী উদ্যোক্তা আছেন যাদের দুয়ার পর্যন্ত এই সেবা পৌঁছায় না। তাই সেদিকে যত্নশীল হয়ে পুরো টাকা কাজে লাগাতে হবে। তাসমিমা হোসেন যোগ্যতাই ড. শিরীন শারমিন চৌধুরীকে স্পিকারের আসনে বসিয়েছে। আজকের অবস্থানে আসার পিছনে তার মায়ের বিশেষ অবদান আছে। প্রত্যেক সন্তানের সফলতায় মায়ের ভূমিকা থাকে। আমরা জাতিগতভাবে মায়েদের অবস্থার উন্নয়নে সংবেদনশীল বাজেট করার দাবি করছি। বাল্যবিবাহ, মাতৃস্বাস্থ্য, শিশুমৃত্যু, নারীর প্রতি সকল প্রকার সহিংসতা রোধ করতে হবে। নারী উন্নয়নে বর্তমান সরকার কাজ করে আমাদেরকে আলোর দিকে নিয়ে যাচ্ছে। শিরীন আক্তার রাষ্ট্র কতোদিন মাকে সুরক্ষা দিবে, সেটা নির্দিষ্ট করতে হবে। প্রতিটি গ্রামে মনিটরিং করে মায়েদের ভাতা প্রদান করতে হবে। যাতে করে কোন মা এই তালিকা থেকে বাদ না যান। আমরা যতই ব্যস্ত থাকি না কেন মাকে উপেক্ষা করা ঠিক নয়। মায়েদের সুরক্ষা আমাদের দিতে হবে। মা স্বপ্ন দেখে নতুন একটা শিশু। আর শিশু দেখে নতুন একটা পৃথিবীর। একজন মা নতুন দিনের স্বপ্ন দেখাতে শেখায়। মায়ের এই শক্তির প্রতি আমাদের শ্রদ্ধা দেখানো দরকার। মায়েদের সহযোগিতা করা দরকার। হয়ত কোন এক মায়ের সন্তান দেশের প্রধানমন্ত্রী হবেন। অথবা দেশের রাষ্ট্রপতি হবেন। ফারাহ কবির আজকে আমি এখানে আসতে পেরেছি আমার মায়ের জন্য। আমার শিক্ষা, মানবিক হওয়া এসব বিষয় তার কাছ থেকেই শিখেছি। মায়ের অবদান বলে শেষ করা যাবে না। আমাদের দেশে যাদের আমরা মা বলছি তাদের অনেকেই কিশোরী। যে কিশোরীটি মা হচ্ছেন তাকে মাসিক ৩০০ টাকা মাতৃত্বকালীন ভাতা দিয়ে তার পুষ্টিসাধনে কতটুকু সহায়তা হবে সেটা ভাববার বিষয়। কিশোরী এইসব মায়েরা স্বাস্থ্যসেবাসহ সকল সুযোগ থেকে বঞ্চিত। তাদেরকে যে টাকা খাবার কেনার জন্য দেয়া হয় সেটা দিয়ে তারা হয়ত গরু কিনে ফেলে। ফাহমিদা নবী আসলে সব মায়েরাই সংগ্রামী হয়। আমি চাই, এমন মা হতে যাতে করে আমার সন্তানরা ভালোভাবে গড়ে উঠতে পারে। আমার বাসায় একজন কাজ করে। একদিন দেখি সে খুব অসুস্থ। তবুও কাজ করছে। না খেয়েই আমাকে বলে তার খাবারটা নিয়ে যাবে নিজের মেয়ের জন্য। সে জানায়, তার মেয়ে একটি বিশ্ববিদ্যালয়ে আইনে পড়ছে। শুনেই এমন ভালো লাগলো বলে বুঝাতে পারবো না। উত্তরাধিকার আইনে সমস্যা আছে। আমরা চাই সম-উত্তরাধিকার আইন। সাদিরা খাতুন আমার মায়ের জন্য আজ আমি গর্বিত। আমার বিশ্ববিদ্যালয়ে যোগদানের সুযোগ ছিল। আমি সেটা করিনি। কারণ আমার মা চেয়েছিল আমি পুলিশ অফিসার হই। আমার চাওয়া এই পৃথিবীর কোন মা যেন কষ্ট না পায়। মা যে কী সেটা মাকে না হারালে বুঝা যায় না। যাদের মা নেই তারা বোঝেন মাকে হারানোর যন্ত্রণা। আমার মায়ের ইচ্ছে ছিল তার এক মেয়ে পুলিশ অফিসার হবে, একজন ডাক্তার হবে। আর আরেক জন ব্যারিস্টার হবে। আমার এক বোন ডাক্তার হয়েছে। নাদীম কাদের আমি আমার বাবাকে বলি মুক্তিযুদ্ধে শহীদ। আর মাকে বলি যুদ্ধের পরে শহীদ। বাবার মৃত্যুর পর মা আমাদের যেভাবে বড় করেছেন সেটার জন্য মাকে স্যালুট। আমি দাবি জানাই, বাজেটে একা থাকা মায়েদের জন্য বরাদ্দ রাখা হোক। শুধু টাকা বরাদ্দ দিলে হবে না। এসব টাকা ঠিকমত কাজে আসছে কীনা সেটা দেখতে হবে। আমার কাছে বছরের প্রতিটা দিনই মা দিবস। একদিন ঘটা করে নয় প্রতিদিনই মাকে ভালোবাসা উচিত। এম এ মান্নান বাজেট সার্বিকভাবে সকল মানুষের জন্য। সেই হিসেবে নারীকেও সমান বরাদ্দ দেয়ার কথা। কিন্তু আমরা তাদের সমানভাবে দেখি না। আমরা সবাই নারীর জন্য সমান অধিকার চাই। আগামী বাজেটের পরিমাণ বাড়বে, পরিধিও বাড়বে। সরকার নারী শিক্ষার অগ্রগতি চায় বলেই উপবৃত্তির ব্যবস্থা করেছে। প্রাইমারি স্কুলগুলোতে দুপুরে খাবারের ব্যবস্থা করা হয়েছে। নারীদের উন্নয়নের জন্য সম্প্রতি ৯০ কোটি টাকার প্রকল্প চালু করেছে সরকার। নারী শ্রমিকদের প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করা হয়েছে। যাতে করে তারা বেশি আয় করতে পারে। কেয়া চৌধুরী আমি ব্যক্তিগতভাবে মা, মাটি, মাতৃভূমি এই তিনটি বিষয়কে সমান করে দেখি। আর এই এক করে ভাবতে শিখিয়েছেন আমার মা। তৃণমূলের নারীর ক্ষমতায়নের পাশাপাশি তাদের চিন্তার পরিবর্তন এলে আমরা উপকৃত হবো। সকল ধর্মে মায়েদের স্থান সবার উপরে। ইসলাম ধর্মে বলা হয়েছে, মায়ের পায়ের নিচে সন্তানের বেহেশত। মায়ের প্রতি দায়িত্ব পালন করা সবার অবশ্য কর্তব্য। মায়ের পরেই আসে মাতৃভূমির নাম। দেশকেও তাই ভালোবাসতে হবে। আমার বিশ্বাস যে মানুষ মাকে ভালোবাসতে পারে সে দেশকেও ভালোবাসতে পারে। এ এইচ এম নোমান মাতৃত্বকালীন ভাতাপ্রাপ্ত প্রতিটি পরিবারের জন্য ‘স্বপ্ন প্যাকেজ’ এর ৫টি ভিত্তি হল: স্বাস্থ্য, পুষ্টি ও জন্মনিয়ন্ত্রন কার্ড। শিক্ষা ও বিনোদন কার্ড। স্বাস্থ্য সম্মত ল্যাট্রিনসহ একটি গৃহ। জীবিকায়ন সরঞ্জাম। কর্মসংস্থানে সঞ্চয়সহ প্রয়োজনে উন্নয়ন ঋণ প্রদান করা। ইতোমধ্যে সরকারিভাবে নির্বাচিত মাতৃত্বকালীন ভাতাপ্রাপ্ত ৮৯২ জন মাকে কেন্দ্র করে একটি পরিবারকে স্বাবলম্বী করার উদ্দেশ্য নিয়ে ডর্প স্বপ্ন প্যাকেজ কার্যক্রমটি উপকুলীয় এলাকা লক্ষ্মীপুর জেলার রামগতি, কমলনগর ও লক্ষ্মীপুর সদর, নোয়াখালীর চাটখিল, গাজীপুরের কালীগঞ্জ উপজেলায় পাইলট আকারে বাস্তবায়ন সম্পর্ণ করেছে। রুবী রহমান মা মানে জীবনের উত্স। নানাভাবে অবদান রেখে চলেছে আমাদের জীবনে। আমার মা আমার জীবন স্বার্থক করে তোলার চেষ্টা করেছেন। আমরা অনেক ভূমিকায় মাকে দেখে অভিভূত। মাকে যে বাজেট ভাবনায়ও আনা যায়, আলোচনা করা যায় এটা ভাবতেই ভালো লাগছে। আমাদের পেশাজীবী নারীরা কর্মস্থলে নিজের দায়িত্ব পালন করার পর পরিবারেও সমান দায়িত্ব পালন করেন। আমার মা ভালো গাইতেন, অর্গান বাজাতেন। মা কবিতাও লিখতে পারতেন। ফেরদৌসি প্রিয়ভাষিণী আমি গোটা বাংলাদেশের মা। আমি আমার সন্তান আর দেশের অন্য ছেলে মেয়েদের কখনও আলাদা করে দেখিনি। আমার সন্তানদের আমি শিখিয়েছি, সকল মানুষকে ভালোবাসো। মানুষকে ভালোবাসলে অসম্মান হয় না। আমি ষোল বছর বয়সে মা হয়েছি। ছয়দিনের বাচ্চা রেখে যুদ্ধে গিয়েছি। আমার সন্তানদের আমি বলেছি, মানুষকে ভালোবাসতে। আমার ছেলেমেয়েরা আমার উপর রাগ করে। আমি তাদের চাইতে অন্যদের বেশি ভালোবাসি বলে। মুক্তা ধর আমার এ অনুষ্ঠানে এসে অনেক বেশি মাকে মনে পড়ছে। আমার আজকের অবস্থানের পেছনে মায়ের বিশেষ ভূমিকা আছে একথা না বললেই নয়। আমি নিজেও একটি সন্তানের মা। তাই আমি জানি, একদিন সন্তানকে জন্ম দিতে মায়ের কত কষ্ট করতে হয়। আমি কাজ করতে গিয়েও দেখেছি মায়েরা অনেক বঞ্চনার শিকার হয় এবং সন্তানের মঙ্গলের জন্য অনেক অত্যাচার মেনে নেন।