এক মায়ের বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন শিশুর জন্য তিনি একটি স্কুল করেন। তিনি অনুধাবন করতে পারেন এমন মায়েদের কষ্ট। তাই নিজে প্রশিক্ষণ নেয়, পড়াশুনা করেন, আর ছোট্ট পরিসরে চালু করেন স্কুল ফর গিফটেড চিলড্রেন। বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন এই স্কুলের দশ বছর পূর্ণ হল। এই স্কুলের শিক্ষকরা জানান, সাধারণ স্কুলের চেয়ে তাদের আন্তরিকতা, প্রশিক্ষণ শিক্ষা বেশি বই কম না হলেও তাদের অনেকে শিক্ষকের সম্মান দেন না।
রীনা দেবী ত্রিপুরা পড়াশুনা করেন গার্হস্থ্য অর্থনীতিতে। পাঠ্যসূচিতেই তার শিশু উন্নয়ন বিষয় ছিল। পড়াশুনা শেষ করে তিনি এখানে কাজ শুরু করেন। শুরু থেকেই কাজের প্রতি ভালবাসা থাকলেও প্রশিক্ষণ গ্রহণ করার পর শিশুদের সম্পর্কে অনেক কিছু জানতে পারে তা আরও বেড়ে যায়। তারা শিশুদের সাথে মিশলেই বুঝতে পারেন কোন শিশুর প্রয়োজন কি। সে কি বলতে চায় কি করতে চায়।
রীনা বলেন, অটিজম সকলের ক্ষেত্রে এক রমক হয় না। তাই সব অটিস্টিক শিশু এক করম নয়। আমরা শিশুদের সাথে তাদের মতো করে মিশে তাদের সমাজে গ্রহণযোগ্য করে তুলি। আমাদের অনেকে শিক্ষক নয় বরং গভর্নেস মনে করেন। শিক্ষক হিসেবে যোগ্য সম্মান করে না কিন্তু আমরা সকলেই মাস্টার্স কপ্লিট করে কাজ করছি। মন খারাপ হয় যখন যে শিশুদের জন্য কাজ করছি তাদের বাবা-মা অসম্মান করেন। আবার তাদের সন্তানকে যখন স্বভাবিক করতে পারি তখন তারাই সৃষ্টিকর্তার কাছে আমাদের জন্য প্রার্থনা করেন। তৃপ্তিটা এখানে। নিজের সন্তানকে ডে-কেয়ার সেন্টারে রেখে স্কুলে কাজ করেন শাহনাজ পারভিন। প্রথম শ্রেণিতে পড়া ছেলেকে তার অনেক সময় ডে-কেয়ারে রেখে অন্যের ছেলের মুখে ভাত তুলে দিতে হয়। কখনও তার বিরক্ত লাগে না বলে জানান শাহনাজ। তিনি মনে করেন অন্যের বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন বা অটিস্টিক শিশুকে আন্তরিকতার সাথে দেখা-শোনা করলেও তার শিশুকে আল্লাহ ভাল রাখবেন। এই পেশায় আসতে নিজের ইচ্ছাতো ছিলই। তারপর কাজ করতে এসে শাহনাজ অটিস্টিক মায়েদের কষ্টের কথা শুনে আরও বেশি আন্তরিক হন।
শাহানাজ বলেন, আমরা পড়াশুনা শেষ করে, আরও প্রশিক্ষণ নিয়ে কাজ করি। শিশুদের বোঝার সাথে সাথে মা-বাবাকেও বোঝাই ওদের জন্য কি করতে হবে। বাবা-মায়ের মধ্যে এমন শিশুর জন্য সম্পর্কের টানাপোড়েন হলে আমরা তা কমিয়ে আনতে কাজ করি। অনেক সময়ই তা পারি। যে যা ভাবুক এটাই আমার আনন্দ। আমি আর অন্য পেশাতে যেতে চাই না। উদ্ভিদ বিদ্যায় মাস্টার্স করে রোমান খানম সাড়ে চার বছর কাজ করছেন বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন শিশুদের জন্য। একটি মেয়ের মা রোমানা মেয়েকে অনেক সময় ফুপির কাছে রেখে স্কুলের বাচ্চাদের জন্য কাজ করেন। এটা তাকে অনেক আনন্দ দেয়।
রোমানা বলেন, অন্য পেশায় গেলে কি হত তা বলতে পারি না। কিন্তু যখন একটা শিশু আমাদের মারে, চুল টানে আর কামড়ে দেয় সেই ব্যথা প্রকাশ না করে স্বভাবিক থেকে যখন এই অভ্যাস ত্যাগ করাতে পারি তখন যে আনন্দ হয় তার তুলনা নেই। আমাদের অনেক শিশু অনেক কিছু করতে পারে। আমরা তাদের হাত ধরে সমাজের জন্য তৈরি করি। বাবা-মায়ের কৃতজ্ঞতা ভরা চোখ আমাদের সব হেলা ভুলিয়ে দেয়। আর এক্ষেত্রে আমাদের প্রিন্সিপ্যাল মারুফা হোসেনের বিশেষ অবদান থাকে। যিনি নিজের সন্তানের সাথে অসংখ্য সন্তানদের নিয়ে কাজ করছেন।
