আবার ঘুরে দাঁড়াবে কংগ্রেস

আপডেট : ১৮ মে ২০১৪, ২২:৩০
ভারতের ১৬তম লোকসভা নির্বাচনে ভরাডুবি হয়েছে ক্ষমতাসীন কংগ্রেসের। দলের এই পরাজয়ের কারণ খুঁজতে এখন ব্যস্ত কংগ্রেসের ভেতর ও বাহিরের অনেকেই। ধরাশায়ী কংগ্রেস বুঝতে পারছে না এ ব্যর্থতার জন্য দায় কার! দলের নাকি সরকারের? পুরানো নেতৃত্বের নাকি নতুন প্রজন্মের? সাংগঠনিক দুর্বলতা নাকি জোটের বাধ্যবাধকতার? তবে জনগণের রায় বলছে, স্বাধীন ভারতে প্রথমবারের মতো গান্ধী-নেহেরু পরিবারের শোচনীয় পরাজয় হয়েছে। এই গান্ধী-নেহেরু পরিবার ভারত স্বাধীন হওয়ার পর থেকেই দেশটির রাজনীতি নিয়ন্ত্রণ করে এসেছে। স্বাধীন ভারতে বেশিরভাগ সময় তারা ক্ষমতায় ছিলো। ভারতের রাজনীতিতে এই পরিবারের উত্থান ছিলো জওহরলাল নেহেরুর হাত ধরে। স্বাধীনতা আন্দোলনের অন্যতম এই নেতা হয়েছিলেন ভারতের প্রথম প্রধানমন্ত্রী। ১৯৪৭ থেকে ১৯৬৪ সাল পর্যন্ত তিনিই ভারতের নেতৃত্ব দিয়েছিলেন প্রধানমন্ত্রী হিসেবেই। এরপর ক্ষমতায় আসেন তার মেয়ে ইন্দিরা গান্ধী। যার পদাঙ্ক অনুসরণ করে ভারতের প্রধানমন্ত্রী হন ছেলে রাজীব গান্ধী। মা ও ছেলে দুই জনই রাজনৈতিক গুপ্তহত্যার শিকার হওয়ার পর কংগ্রেসের হাল ধরেন রাজীব গান্ধীর বিধবা স্ত্রী সোনিয়া গান্ধী। ভারতের রাজনীতিতে প্রভাবশালী এই নেত্রী এখন ছেলে রাহুল গান্ধীর জন্য মঞ্চ তৈরি করছেন। যার হাত ধরে এবারের নির্বাচনে লড়েছে কংগ্রেস এবং গান্ধী পরিবার। এই নির্বাচনে তারা এককভাবে পেয়েছে মাত্র ৪৪টি আসন। জোটে পেয়েছে ৫৮টি। অন্যদিকে ভারতের রাজনীতির ইতিহাসে ভারতীয় জনতা পার্টি (বিজেপি) একক সংখ্যাগরিষ্ঠতা পেয়েছে। নির্বাচনে কংগ্রেস এতটাই খারাপ করেছে যে তারা গুজরাট, রাজস্থান, দিল্লি, উত্তরখণ্ড এবং মহারাষ্ট্রের মতো রাজ্যে কোনো আসনই পায়নি। এ ফলাফলের পর বিভিন্ন রাজ্যে কংগ্রেসের ক্ষমতাসীন কয়েকজন মুখ্যমন্ত্রী পদত্যাগও করতে চেয়েছেন। আশির দশকে সর্বশেষ খারাপ পরিস্থিতির মুখে পড়তে হয়েছিলো কংগ্রেসকে। বোফর্স ঘুষ কেলেঙ্কারির জেরে প্রধানমন্ত্রী রাজীব গান্ধীর সরকার হেরেছিলো। ঐবার কংগ্রেস পেয়েছিলো ১৯৭ আসন। এরপর খারাপ করেছিলো ১৯৯৬ সালের নির্বাচনে। ঐ নির্বাচনে কংগ্রেস পেয়েছিলো ১৪০ আসন, বিজেপি পেয়েছিলো ১৮৭ আর জনতা দল পেয়েছিলো ১৯২ আসন। ১৯৯৮ সালের নির্বাচনে বিজেপি নেতৃত্বাধীন এনডিএ জোট ক্ষমতায় এসেছিলো। অথচ ঐ বারও কংগ্রেস ১৪৪টি আসন পেয়েছিলো। বিগত দুই মেয়াদেই কংগ্রেস জোট ক্ষমতায় এসেছে। কিন্তু এবার কংগ্রেসের সঙ্গে ডুবেছে জোটও। কংগ্রেস প্রেসিডেন্ট সোনিয়া গান্ধী ও সহ-সভাপতি রাহুল গান্ধী প্রকাশ্যে নির্বাচনী ব্যর্থতার দায় কাঁধে নিয়েছেন। তবে অনেকেই বলছেন, মনমোহন সিংয়ের সরকার কংগ্রেস থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে গিয়েছিলো। আর ক্ষমতায় এতোদিন থাকার কারণে সরকার সর্বশেষ জনগণ থেকেও বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছিলো। কংগ্রেসের ভিতরকার অনেকের মতে, এ কারণেই সবচেয়ে অপমানজনক পরাজয় হয়েছে তাদের। অন্যদিকে, কংগ্রেস মুক্ত ভারতের ধারণাকে পুঁজি করে প্রচারণা চালিয়েছিলেন নরেন্দ্র মোদী। গান্ধী পরিবারের প্রতি মানুষের আস্থা নষ্ট করতে সক্ষমও হয়েছেন তিনি। প্রকৃতপক্ষে এই পরিবারকে জনগণক ত্যাগ করেছে। এছাড়া দুর্নীতি রোধ, বেকারত্ব দূরীকরণ আর অর্থনীতিকে শক্ত ভিত্তি দিতে না পারায় কংগ্রেসের প্রতি ক্ষুব্ধ ভোটাররা এবার মুখ ফিরিয়ে নিয়েছে। তরুণ নেতা রাহুল গান্ধী হয়তো ভারতের অর্থনীতিতে প্রাণসঞ্চার করতে পারতেন কিন্তু অনেক ভোটার মনে করেন, রাহুল সুবিধাপ্রাপ্ত, উদাসীন এবং সাধারণ মানুষের নাগালের বাইরে। এ কারণে রাহুল গান্ধীর নেতৃত্বকেও অনেকে দায়ী করছেন। তবে বিশ্লেষকদের মত এক্ষেত্রে অনেকটাই ভিন্ন। সোনিয়া গান্ধীর আত্মজীবনী লেখক ও জ্যেষ্ঠ সাংবাদিক রশিদ কিদওয়াই সম্প্রতি এক সাক্ষাত্কারে গণমাধ্যমকে বলেছিলেন, সবাই বারাক ওবামা হতে পারবেন না। আর রাহুল গান্ধী খারাপ করেছেন তা কিন্তু নয়। কংগ্রেসের বর্তমান দুরাবস্থার জন্য তাই তাকে দোষী করা ঠিক হবে না। তিনি গত ১০ বছর ধরে পার্লামেন্টের সদস্য। তার বিরুদ্ধে কোনো কেলেঙ্কারি শোনা যায়নি। তার সততা নিয়ে কখনো প্রশ্ন ওঠেনি। তার মতে, এবারের নির্বাচন রাহুল গান্ধীর জন্য ভাঙা-গড়ার কোনো বিষয় নয়। ভারতে বর্তমান মন্ত্রিসভায় প্রতিনিধিত্বকারীদের গড় বয়স ৬৫ বছর। অনেক বর্ষীয়ান নেতা তাদের ৭০ থেকে ৮০ বছরে গিয়ে ভালো করেছে। নেতাদের নিজেদের গুছিয়ে নিতে সময় লাগে। রাহুল গান্ধীর বর্তমানে বয়স ৪৩ বছর। তার জন্য অনেক সময় পড়ে রয়েছে। উত্তর প্রদেশের সাংবাদিক স্মিতা গুপ্তার মতে, এবারের নির্বাচনে যে জয় আসছে না তা মেনে নিতে অনেকটাই মানসিকভাবে প্রস্তুত ছিলো কংগ্রেস। তারপরও নেহেরু-গান্ধী পরিবারের বাইরে কেউ দলকে নেতৃত্ব দেবে সে কথা চিন্তাও করা যায় না। নির্বাচনের পর ফল যা হোক না কেন রাহুল গান্ধী তার অবস্থান ও গুরুত্ব হারাবেন না। ভারতের বর্ষীয়ান সাংবাদিক ইন্দার মালহোত্রার মতে, এ পরাজয়ে কংগ্রেস ধ্বংস বা অদৃশ্য হয়ে যাবে না। পুনরায় ঘুরে দাঁড়ানোর সক্ষমতা দলের রয়েছে। এটা সাময়িক বিপর্যয় মাত্র। আর গান্ধী পরিবার ছাড়া অন্য কেউ কংগ্রেসের নেতৃত্ব দিতে অক্ষম। তাদের বাইরে কারো নেতৃত্ব মেনে নিতে কংগ্রেস নেতারাও রাজি নন।