এসএসসিতে ভালো ফল করে আনন্দ-উচ্ছ্বাস চললেও স্বস্তিতে নেই শিক্ষার্থী-অভিভাবক। একাদশ শ্রেণীতে কোথায় ভর্তি হবে এ নিয়ে রয়েছে শংকা। ঢাকাসহ বিভাগীয় শহরে পর্যাপ্তসংখ্যক সরকারি-বেসরকারি কলেজ থাকলেও মানসম্মত কলেজের সঙ্কট রয়েছে। এ কারণে জিপিএ-৫ পাওয়া দেড় লাখের বেশি শিক্ষার্থী কোথায় ভর্তি হবে এ নিয়ে দুশ্চিন্তায় রয়েছেন তারা।
বাংলাদেশ শিক্ষা তথ্য ও পরিসংখ্যান ব্যুরোর (ব্যানবেইস) সর্বশেষ তথ্যমতে, সারাদেশে সরকারি-বেসরকারি ৩ হাজার ৫৪৭টি কলেজ রয়েছে। এর মধ্যে ঢাকা বিভাগে ৯২৩ টি, চট্টগ্রামে ৪৮৮টি, বরিশালে ২৫৭টি, খুলনায় ৫২৭টি, রাজশাহীতে ৬৫৮টি, রংপুরে ৫২৬টি এবং সিলেটে ১৬৮টি। আর ৭২৪টি স্কুল রয়েছে, যেখানে কলেজ সেকশন রয়েছে। ওইসব স্কুলের শিক্ষার্থীদের ভর্তি হতে কোন সমস্যা হবে না।
রাজধানীসহ দেশের সেরা প্রতিষ্ঠানগুলোয় যারা ভর্তির সুযোগ পাবে তাদেরও তীব্র প্রতিযোগিতার মুখোমুখি হতে হবে। এ নিয়ে চরম অনিশ্চয়তার মধ্যে রয়েছে শিক্ষার্থীরা। দেশে যত সংখ্যক ভালো স্কুল রয়েছে, তার এক-দশমাংশও ভালো কলেজ নেই। এ বছর এসএসসি পরীক্ষায় সারা দেশের ১০টি বোর্ডে পাস করেছে ১৩ লাখ ৩ হাজার ৩৩১ শিক্ষার্থী। আর আসন রয়েছে এর চেয়ে বেশি। ফলে আসন নিয়ে কোনো সঙ্কট হবে না। কিন্তু হাতেগোনা ভালো কলেজে ভর্তি নিয়ে তীব্র প্রতিযোগিতা হবে, জিপিএ-৫ পেয়েও ভর্তি হতে পারবে না ভালো কলেজে। এবার পরীক্ষায় ১ লাখ ৪২ হাজার ২৭৬ শিক্ষার্থী জিপিএ-৫ (এ+) পেয়েছে। জিপিএ ৪-৫ এর মধ্যে (এ) পেয়েছে ৫ লাখের বেশি। এদের মধ্যে ঢাকা বোর্ডেই জিপিএ-৫ পেয়েছে ৪৬ হাজার ৭৯৫ জন। শুধু জিপিএ-৫ পাওয়া মেধাবীদের আসন করে দেয়ার মতো প্রতিষ্ঠান ঢাকা এবং দেশের বড় শহরগুলোয় নেই। রাজধানীতে ভালো মানের ১৫ থেকে ১৭টি কলেজে আসন আছে মাত্র ১২ থেকে ১৫ হাজার। ফলে জিপিএ-৫ পাওয়া শিক্ষার্থীরাও ভালো কলেজে ভর্তির সুযোগ পাবে না।
শিক্ষক, অভিভাবকদের দেয়া তথ্য অনুযায়ী, সারাদেশে খ্যাতনামা কলেজের সংখ্যা মাত্র ১৭০ থেকে ১৮০টি। এই কলেজগুলোর মধ্যে ঢাকা বিভাগে ৭১, চট্টগ্রাম বিভাগে ১৬, রাজশাহী বিভাগে ৫, খুলনা বিভাগে ১১, বরিশাল বিভাগে ১২, সিলেট বিভাগে ২২ ও রংপুর বিভাগে রয়েছে ২০টির মতো।
মিরপুরের নজরুল ইসলাম নামে এক অভিভাবক বলেনঃ ভাল ফল নিয়ে উচ্ছ্বাস থাকলেও কোথায় সন্তান ভর্তি করবো এ নিয়ে শংকায় আছি। রাজধানীতে হাতে গোনা কয়েকটি ভালো কলেজ রয়েছে। যার সন্তান জিপিএ-৫ পেয়েছে তিনি চাইবেন সে সন্তান ভালো কলেজে ভর্তি হোক।
তিনি জানান, ভিকারুন নিসা নূন, আইডিয়াল স্কুলসহ বেশকিছু নামিদামি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান রয়েছে যারা নিজস্ব শিক্ষার্থী ভর্তি করবে। ভালো কলেজের মধ্যে নটরডেম, সিটি কলেজ, কমার্স কলেজসহ হাতেগোনা কয়েকটি কলেজ রয়েছে। তীব্র প্রতিযোগিতার মধ্যে ভর্তি হতে পারবে কিনা এ নিয়ে শংকায় আছি।
শিক্ষকরা জানিয়েছেন, ভালো কলেজ হওয়ার ক্ষেত্রে যে বৈশিষ্ট্য থাকা দরকার তা নেই অধিকাংশ কলেজে। ভালো কলেজের জন্য প্রয়োজন ভালো শিক্ষক, দক্ষ কলেজ প্রশাসন ও শিক্ষার্থীদের পর্যাপ্ত সুযোগ-সুবিধা। কিন্তু এ তিনটি বৈশিষ্ট্য না থাকায় কলেজগুলো ভালো তালিকায় যেতে পারেনি। ভালো কলেজের পরীক্ষার ফলও ভালো হয়। অধিকাংশ কলেজ অধ্যক্ষ ব্যস্ত থাকেন শিক্ষাবহির্ভূত কাজে। আর্থিক সুযোগ-সুবিধা আদায়ে ব্যস্ত থাকেন তারা। কীভাবে কলেজটিকে ভালো করা যায়- এ বিষয়ে কোন পদক্ষেপও নেন না। এ বিষয়ে সরকারের আরো কঠোর হওয়া প্রয়োজন বলে মনে করেন অভিভাবকরা।
একাদশ শ্রেণিতে ভর্তি
এবার উচ্চ মাধ্যমিক ২০১৪-১৫ শিক্ষাবর্ষে একাদশ শ্রেণিতে ভর্তি কার্যক্রম শুরু হচ্ছে আগামী ২৮ মে। আর ক্লাস শুরু হবে ১ জুলাই। নীতিমালা অনুযায়ী ২৮ মে থেকে ১২ জুন পর্যন্ত ভর্তি ফরম উত্তোলন ও জমা দেয়া যাবে। ভর্তির জন্য নির্বাচিতদের তালিকা প্রকাশ করা হবে ২২ জুন। একাদশ শ্রেণিতে ভর্তির জন্য এবারও ভর্তি পরীক্ষা নেয়া হবে না। প্রতিবারের মতো শিক্ষার্থীদের মাধ্যমিক ও সমমানের পরীক্ষার ফলাফলের ভিত্তিতেই ভর্তি করা হবে। নীতিমালা অনুযায়ী পুনঃপরীক্ষণের ক্ষেত্রে যাদের ফল পরিবর্তন হবে তাদের জন্য আবেদন গ্রহণের শেষ তারিখ ১৬ জুন। বিলম্ব ফি ছাড়া ভর্তির শেষ তারিখ ৩০ জুন, বিলম্ব ফিসহ ভর্তির শেষ তারিখ ২২ জুলাই। একাদশ শ্রেণির ক্লাস শুরু হবে ১ জুলাই।
গত বছরের মতো এবারো ৩০০ জনের বেশি শিক্ষার্থী ভর্তি করানোর অনুমতি আছে- এমন সব প্রতিষ্ঠানে বোর্ডগুলো অনলাইনে ভর্তি কার্যক্রম সম্পন্ন করার ব্যবস্থা নেবে। তবে ৫০০ জনের বেশি হলে অবশ্যই অনলাইনে ভর্তি নিতে হবে। এবারও ভর্তি ফরমের মূল্য নির্ধারণ করা হয়েছে ১২০ টাকা। নীতিমালা অনুযায়ী সাতটি বিভাগীয় শহরের কলেজে ভর্তির ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট কলেজের ৮০ শতাংশ আসন উন্মুক্ত থাকবে। অবশিষ্ট ১০ শতাংশ আসনের মধ্যে ৩ শতাংশ সংশ্লিষ্ট বিভাগীয় সদরের বাইরের এলাকার শিক্ষার্থীদের জন্য, ৫ শতাংশ মুক্তিযোদ্ধা কোটা এবং ২ শতাংশ শিক্ষা মন্ত্রণালয় এবং এর অধীনস্থ দপ্তরের কর্মকর্তা-কর্মচারী, শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের শিক্ষক-কর্মচারী এবং নিজ নিজ প্রতিষ্ঠানের পরিচালনা পর্ষদের সদস্যদের সন্তানদের জন্য সংরক্ষিত থাকবে। এছাড়া বাকি ১০ শতাংশ শিক্ষার্থী শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলো নিজেদের ইচ্ছেমতো ভর্তি করাতে পারবে। বিভাগীয় শহর ছাড়া অন্য জেলা শহরের কলেজের জন্যও একই নিয়ম প্রযোজ্য। জিপিএ-৫ পাওয়া শিক্ষার্থীদের ক্ষেত্রে সব বিষয়ের উপর সর্বোচ্চ ৪৩ গ্রেড পয়েন্ট ধরে জিপিএ’র ভিত্তিতে মেধাক্রম নির্ধারণ করতে হবে। বিজ্ঞান শাখা থেকে কৃতকার্যরা যে কোনো বিভাগে ভর্তি হতে পারবে। মানবিক শাখা থেকে কৃতকার্যরা মানবিকের পাশাপাশি ব্যবসায় শিক্ষা শাখায় ভর্তি হতে পারবে। আর ব্যবসায় বিভাগের শিক্ষার্থীরা ব্যবসায় শিক্ষা ও মানবিক বিভাগে ভর্তি হতে পারবে। বিজ্ঞান বিভাগে ভর্তির ক্ষেত্রে সমান জিপিএ প্রাপ্তদের মেধাক্রম নির্ধারণের ক্ষেত্রে সাধারণ গণিত, উচ্চতর গণিত অথবা জীববিজ্ঞানে প্রাপ্ত জিপিএ বিবেচনায় আনা হবে।
আর মানবিক ও ব্যবসায় শিক্ষা বিভাগে সমান জিপিএ প্রাপ্তদের ভর্তির ক্ষেত্রে পর্যায়ক্রমে ইংরেজি, গণিত ও বাংলায় অর্জিত গ্রেড পয়েন্ট বিবেচনা করা হবে। স্কুল ও কলেজ সংযুক্ত প্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থীরা অগ্রাধিকারভিত্তিতে নিজ প্রতিষ্ঠানে ভর্তির সুযোগ পাবে।
