কাঙ্ক্ষিত বৈদেশিক সহায়তা না পেলেও আসছে ২০১৪-১৫ অর্থবছরের বাজেটে প্রায় ২৯ হাজার কোটি টাকা বৈদেশিক সহায্যের প্রত্যাশা করছে সরকার। নতুন অর্থবছরে প্রায় আড়াই লাখ কোটি টাকার বাজেটে উন্নয়ন কর্মসূচিতে সবমিলিয়ে বরাদ্দ থাকছে ৮৪ হাজার ৭১৬ কোটি টাকা। উন্নয়ন বাজেটের ৩৫ শতাংশই থাকছে প্রকল্প সাহায্য নির্ভর।
চলতি বছরের প্রেক্ষাপটে এই প্রক্ষেপণ বাস্তবভিত্তিক নয় বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্ট অনেকেই। তাদের মতে, অভ্যন্তরীণভাবেও আয়ের যে উচ্চ লক্ষ্য স্থির করা হচ্ছে তাতে দেখা যায়, বছর শেষে অর্থ সংগ্রহে বড় ধরনের চাপের মুখোমুখি হতেই হবে। কেননা কাঙ্ক্ষিত মাত্রায় বিনিয়োগ না হওয়ায় কর্মসংস্থান ও ভোক্তাব্যয়ের উত্সাহ যোগান সম্ভব হবে না।
বৈদেশিক সহায়তা প্রাপ্তির তথ্যে দেখা যায়, চলতি অর্থবছরের জুলাই থেকে মার্চ পর্যন্ত নয় মাসে ১৫ হাজার কোটি টাকার সমপরিমাণ বৈদেশিক সহায়তার অর্থছাড় করা সম্ভব হয়েছে। প্রতিশ্রুতি আদায়ের পরিমাণও অনেক কমে গেছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, সময়ের সাথে পাল্লা দিয়ে বাজেটের আকার বাড়ছে, বড় হচ্ছে সরকাররে ঋণের আকার। বৈদেশিক সূত্র থেকে কাঙ্ক্ষিত সাড়া না পেলে বিশাল বাজেটের ঘাটতি মেটাতে ফের দেশের ব্যাংকগুলোর উপর চাপ বাড়বে। সেই চাপ দেশিয় বেসরকারি খাতের বিনিয়োগকে বাধাগ্রস্ত করবে। ফলে বছর শেষে একই ঘূর্ণাবৃত্তে রয়ে যাবে অর্থনীতি।
সূত্রমতে, নতুন অর্থবছরের বাজেটের আকার এক বছরের ব্যবধানে বাড়ছে প্রায় ২০ শতাংশ। পরিকল্পনা কমিশনের চূড়ান্ত হওয়া প্রস্তাবিত এডিপি আজ মঙ্গলবার জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের (এনইসি) অনুমোদনের জন্য উপস্থাপন করা হচ্ছে।
পরিকল্পনা কমিশন সূত্র জানায়, নতুন বাজেটের বাস্তবায়ন দক্ষতা বাড়াতে এবার মেয়াদ উত্তীর্ণ কোন প্রকল্প সরাসরি অন্তর্ভুক্ত থাকছে না। নতুন প্রকল্প গ্রহণের চেয়ে সমাপ্ত হবে এমন প্রকল্প গুরুত্ব পাবে। উন্নয়নের মূল ধারায় জলবায়ু পরিবর্তনকে সম্পৃক্ত করার লক্ষ্যে বিশেষ কার্যক্রম সম্পন্ন প্রকল্পকে অগ্রাধিকার দেয়া হয়েছে। সম্পদের সীমাবদ্ধতা বিবেচনায় রেখে একান্ত অপরিহার্য এবং উচ্চ অগ্রাধিকার প্রাপ্ত না হলে সরকারের নিজস্ব অর্থায়নে নতুন প্রকল্প এডিপিতে অন্তর্ভুক্তির প্রস্তাব সাধারণভাবে পরিহার করা হবে। অগ্রাধিকার পাবে সরকারি বেসরকারি অংশীদারিত্বের (পিপিপি) প্রকল্প।
নতুন এডিপিতে স্বায়ত্তশাসিত সংস্থা ও কর্পোরেশনের নিজস্ব অর্থায়নের পরিমাণ থাকছে ৫৬৮৫ কোটি টাকা। এটি বাদ দিলে মূল উন্নয়ন কর্মসূচির আকার দাঁড়াবে ৭৯ হাজার ৩১ কোটি টাকা। এতে সরকারের নিজস্ব তহবিল থেকে ৫১ হাজার ৩৩১ কোটি টাকার সংস্থান থাকছে। নতুন এডিপির জন্য জাপানি ঋণ মওকুফ তহবিল (জেডিসিএফ) অর্থায়িত ২১টি প্রকল্পের অনুকূলে বরাদ্দ থাকছে ৪৩৬ কোটি টাকা। প্রস্তাবিত নতুন এডিপিতে মোট ৯৫৯টি নতুন প্রকল্প থাকছে যার মধ্যে ৬৮৩টি বরাদ্দবিহীন অননুমোদিত নতুন বিনিয়োগ প্রকল্প এবং ২৭৬টি বৈদেশিক সাহায্য প্রাপ্তির সুবিধার্থে বরাদ্দবিহীন অননুমোদিত আকারে থাকছে। স্বায়ত্তশাসিত সংস্থা ও কর্পোরেশনের নিজস্ব অর্থায়নে বাস্তবায়নাধিক প্রকল্পের সংখ্যা ১৫৩টি।
অগ্রাধিকার খাতে বরাদ্দ বিভাজন
প্রস্তাবিত এডিপিতে যোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নয়ন ও পদ্মা সেতুর গুরুত্ব বিবেচনায় সর্বোচ্চ বরাদ্দ প্রস্তাব করা হয়েছে পরিবহন খাতে। এখাতে মোট বরাদ্দের প্রস্তাব করা হয়েছে ১৮ হাজার ৯৮ কোটি টাকা যা মোট এডিপির ২২.৯০ শতাংশ। শিক্ষার প্রসার ও গুণগতমান বৃদ্ধির লক্ষ্যে শিক্ষা ও ধর্ম খাতে দ্বিতীয় সর্বোচ্চ মোট ৯ হাজার ৪০৩ কোটি টাকার (মোট বরাদ্দের ১১.৯০%) প্রস্তাব রয়েছে। অগ্রাধিকার খাত বিবেচনায় বিদ্যুত্ খাতে তৃতীয় সর্বোচ্চ মোট ৯ হাজার ২৭৭ কোটি টাকা (১১.৭৪%) বরাদ্দের প্রস্তাব রয়েছে। এছাড়া ভৌত পরিকল্পনা, পানি সরবরাহ ও গৃহায়ন খাতে ৭৮৭৬ কোটি টাকা (৯.৯৭%), গ্রামীণ অর্থনীতিতে গতিশীলতা আনয়ন ও অধিক কর্মসংস্থান সৃষ্টির লক্ষ্যে পল্লী উন্নয়ন পল্লী প্রতিষ্ঠান খাতে মোট ৬ হাজার ৮৭১ কোটি টাকা (৮.৬৯%), কৃষি খাতে ৫ হাজার ৫৭৫ কোটি টাকা (৭.০৫%) এবং স্বাস্থ্য, পুষ্টি, জনসংখ্যা ও পরিবার কল্যাণ খাতে ৪ হাজার ৯৪৩ কোটি টাকা (৬.২৫%) বরাদ্দের প্রস্তাব রয়েছে।
বিভিন্ন উন্নয়ন সহায়তা খাতে বরাদ্দ
আসছে ২০১৪-২০১৫ অর্থবছরে এডিপিতে স্থানীয় সরকার বিভাগের অনুকূলে ৫টি উন্নয়ন সহায়তা খাতে যথা উপজেলা উন্নয়ন সহায়তা, ইউনিয়ন পরিষদের উন্নয়ন সহায়তা, পৌরসভা উন্নয়ন সহায়তা, জেলা পরিষদ উন্নয়ন সহায়তা এবং সিটি কর্পোরেশনের উন্নয়ন সহায়তা খাতে ১৩১০ কোটি টাকা বরাদ্দের প্রস্তাব রয়েছে।
অন্যদিকে পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের আওতায় ৩টি উন্নয়ন সহায়তা খাতে যথা পার্বত্য চট্টগ্রাম উন্নয়ন সহায়তা, পার্বত্য চট্টগ্রাম স্থানীয় সরকার উন্নয়ন সহায়তা এবং পার্বত্য চট্টগ্রাম উন্নয়ন বোর্ডের জন্য ১৯৫ কোটি টাকা বরাদ্দের প্রস্তাব থাকছে। প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের অনুকূলে বিশেষ এলাকার জন্য উন্নয়ন সহায়তা (পার্বত্য চট্টগ্রাম ব্যতীত) বাবদ ১৬ কোটি টাকা বরাদ্দের প্রস্তাব থাকছে। এছাড়া বিশেষ প্রয়োজনে উন্নয়ন সহায়তা খাতে রক্ষিত অর্থের পরিমাণ ১৫০৬ কোটি টাকার সংস্থান থাকছে। ফলে সকল উন্নয়ন সহায়তা খাতে প্রস্তাবিত বরাদ্দের পরিমাণ দাঁড়াচ্ছে মোট ৩ হাজার ২৭ কোটি টাকা।
