দুটি দেশের মধ্যে মিল বলতে একটাই—ভারত মহাসাগরের বুকে সবুজ এক দ্বীপ হয়ে ভাসছে তারা।
এ ছাড়া বর্ণে, ভাষায়, সংস্কৃৃতিতে, রাজনীতিতে এমন কোনো মিল শ্রীলঙ্কা আর অস্ট্রেলিয়ার মধ্যে খুঁজে পাওয়া কঠিন। কিন্তু সেই আদিকাল থেকে শ্রীলঙ্কার লোকেরা ভাগ্যের সন্ধানে অস্ট্রেলিয়ায় আবাস তৈরি করে একটা সম্পর্ক তৈরি করে ফেলেছে। উল্টোটাও হয়েছে—শ্রীলঙ্কার প্রকৃতি ও আবহাওয়ার টানে অনেক অস্ট্রেলিয়ান এখানে ‘সেকেন্ড হোম’ বানিয়ে শেষ জীবনটা কাটিয়ে গেছেন। তবে প্রথম দল, মানে শ্রীলঙ্কা থেকে কাজের সন্ধানে অস্ট্রেলিয়ায় শেকড় গাড়াদের সংখ্যাই ভারী শেষ পর্যন্ত।
এই দলে শ্রীলঙ্কার অনেক আন্তর্জাতিক ক্রিকেটারও নাম লিখিয়েছেন। অনেকেই ক্যারিয়ার শেষ করে কোচিং করতে গিয়ে আবাস অস্ট্রেলিয়ায়। আর এই ক্রিকেটারদের মধ্যে নিজেকে সত্যিকারের ‘অস্ট্রেলিয়ান’ করে তুলতে পেরেছেন একজনই—উপল চান্দিকা হাতুরুসিংহ।
বাংলাদেশের কোচ হিসেবে এই শ্রীলঙ্কান-অস্ট্রেলিয়ানকে নিয়োগ দেয়ায় বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ড (বিসিবি) ও স্থানীয় বিশেষজ্ঞরা তাই মূলত একই অঙ্গে হাতুরুসিংহর এই দুই রূপকেই সেরা প্রাপ্তি মনে করছেন। উপমহাদেশ কোচের ব্যাপারে অনেকদিন ধরে যে আগ্রহ বিসিবির সেটা পূরণ হল শ্রীলঙ্কায় বড় হয়ে ওঠা, সেই দেশের জাতীয় দলের হয়ে খেলা এই সাবেক ক্রিকেটারকে নিয়োগ দেয়ার ভেতর দিয়ে। আবার অস্ট্রেলিয়ান পেশাদারিত্ব থেকে না সরায় বিসিবির যে চাওয়া, সেটাও পূরণ হল অস্ট্রেলিয়ার ঘরোয়া ক্রিকেটের অন্যতম সফল এই কোচকে আনার ভেতর দিয়ে।
গতকাল এই কোচ নিয়োগ কেমন হল, এ ব্যাপারে কথা বলতে গিয়ে দেশের প্রবীণ কোচ, ক্রীড়া সাংবাদিক ও ক্রীড়া বিশেষজ্ঞ জালাল আহমেদ চৌধুরী ঠিক এই কথাটাই বলছিলেন, ‘উপমহাদেশের কোচ আমাদের জন্য বেশ ভালো ব্যাপার বলে আমি মনে করি। খেলোয়াড়দের সঙ্গে দ্রুত যোগাযোগ তৈরি হওয়া, মানিয়ে নেয়ার ব্যাপার তো থাকেই। এছাড়া সবচেয়ে বড় ব্যাপার হল, আমাদের এখানে বোর্ড বা ম্যানেজমেন্টকে সামলানোটাও বাইরের কোচের জন্য একটা বিরাট ঝামেলা। এখন এই কোচ শ্রীলঙ্কা দলে খেলেছে, তাদের বোর্ডও অনেকটাই আমাদের মতো। ফলে এই ধরনের বোর্ড কী কী করতে পারে, তা নিয়ে একটা ধারণা তার আছে বলেই মনে হয়। আবার সুবিধা হল, সে যেহেতু কোচিংয়ে নিজেকে সফল করেছে অস্ট্রেলিয়াতে, তাই পেশাদারিত্বটাও ভালোই থাকার কথা। সবমিলিয়ে যে কজনের নাম আলোচনায় ছিল, তার মধ্যে এই হাতুরুসিংহকেই আমার মনে হয়েছে বোর্ডের সেরা পছন্দ।’
প্রায় একই মত কোচকে যারা মূলত খুঁজে বের করলেন, সেই অনুসন্ধান কমিটির সদস্য, বোর্ড পরিচালক এবং জাতীয় দলের সাবেক অধিনায়ক খালেদ মাহমুদ সুজন। তিনিও মনে করছেন এই দুই সংস্কৃৃতির যে মিশ্র অভিজ্ঞতা আছে চান্দিকার, সেটাই সম্পদ হয়ে উঠতে পারে বাংলাদেশের।
হাতুরুসিংহকে নিয়ে খালেদ মাহমুদের ধারণা আজ থেকে নয়। অনেকদিন ধরেই তাকে অনুসরণ করছেন বলে বললেন পেশাগত জীবনে কোচিংয়ে জড়িয়ে থাকা সুজন, ‘ও যখন শ্রীলঙ্কা-এ দলের দায়িত্বে, তখন থেকেই তার সম্পর্কে জানি। সে অস্ট্রেলিয়াতে গিয়ে যখন ভালো করছে, তখন কোচ হিসেবে ওর সম্পর্কে আমরা খবর রাখতাম। হাতুরুসিংহ সম্পর্কে আমাকে সবচেয়ে ভালো ধারণা দিয়েছিল সাঙ্গাকারা ও মাহেলা। ওরা বলে, এখন বিশ্বের অন্যতম সেরা কোচ নাকি সে।’
এই কথাটা অবশ্য মিথ্যে নয়। হাতুরুসিংহ শ্রীলঙ্কা জাতীয় দলের ‘ছায়া কোচ’ পদ থেকে বহিষ্কৃত হওয়ার পর তাকে রাখার দাবি করে যে চিঠি দিয়েছিলেন, সেখানে সাঙ্গাকারা দাবি করেছিলেন, তার জীবনে পাওয়া অন্যতম সেরা কোচ এই ভদ্রলোক, ‘আমাদের সঙ্গে যোগ দেয়ার পর থেকে দলে চান্দিকার অবদান আমাদের প্রত্যাশাকেও ছাড়িয়ে গিয়েছিল। ব্যাটিং টেকনিক উন্নতিতে আমি সরাসরি ওর কাছ থেকে উপকৃত হয়েছি। ওর নিখুঁত টেকনিক্যাল জ্ঞান থেকে বোলাররাও দারুণ উপকৃত হয়েছে। দলীয় কৌশল নির্ধারণেও ওর ভূমিকা ছিল অসাধারণ। ওর মানসিকতা ভীষণ শক্ত এবং সবসময়ই ইতিবাচক। ঢিলেমি একটুও বরদাস্ত করে না, কমিটমেন্টে ঘাটতি বা শৃঙ্খলার মতো ব্যাপারগুলোতে বিন্দুমাত্র আপোষ করে না। সব ক্রিকেটারকে মাপে একই পাল্লায়, দেখে একই দৃষ্টিতে। এতে দলের সবার আন্তরিক শ্রদ্ধা আদায় করে নিতে পেরেছে। চিন্তা-ভাবনায় দারুণ সৃষ্টিশীল, সবসময়ই জিততে চায়। সম্ভবত, আমাদের প্রজন্মের পাওয়া অন্যতম সেরা কোচ চান্দিকা। ওর সবচেয়ে বড় অবদান সম্ভবত আমাদের মানসিকতা বদলে দেয়ার ক্ষেত্রে—যে কোনো চ্যালেঞ্জ জয়ের মানসিকতা গেথে দিয়েছে আমাদের ভেতর।’
বাংলাদেশের এইসব প্রত্যাশা এবং সাঙ্গাকারাদের সনদপত্র সত্যি হলে দলের জন্য যে একটা সুদিন আসছে, এটা আশা করাই যায়।
