হাজার কোটি টাকা ক্ষতির চিঠি, এখন ২শ কোটি লাভ!

আপডেট : ২১ মে ২০১৪, ২৩:১৯
মাত্র আড়াই মাস আগে বাংলাদেশ টেলিযোগাযোগ নিয়ন্ত্রণ কমিশন (বিটিআরসি) যে প্রস্তাবের কারণে বছরে হাজার কোটি টাকার বেশি ক্ষতি হবে বলে বলেছিল এখন তারাই আবার সেই প্রস্তাবকে দুইশ’ কোটি টাকা লাভ হবে বলে দাবি করছে। বিদেশ থেকে আনা ফোন কলের রেট কমাতেই বিটিআরসির এই আজগুবি দাবি। বর্তমানে আইজিডব্লিউগুলো প্রতি মিনিটের কল দেশে আনে তিন সেন্ট রেটে। বিটিআরসি এটি দেড় সেন্ট করতে চেষ্টা তদবির চালাচ্ছে। অর্থ মন্ত্রণালয়ে পাঠানো চিঠিতে বিটিআরসি শুধু গোজামিল নয়, মিথ্যা তথ্যও দিয়েছে। বিটিআরসির এই প্রস্তাব মানলে সরকারের বছরে হাজার কোটি টাকার বেশি ক্ষতি হবে বলে মনে করেন সংশ্লিষ্টরা। আড়াই মাস আগে বিটিআরসি মন্ত্রণালয়ে একটি চিঠি পাঠায়। সেখানে বলা হয়, প্রতিদিন সাড়ে তিন কোটি মিনিট টেলিফোন কল দেশে আসে। প্রতি মিনিট টেলিফোন কল দেশে আসে তিন সেন্ট বা বাংলাদেশি আড়াই টাকার মতো দামে। এই টাকা আইজিডব্লিউ, আইসিএক্স, মোবাইল বা ল্যান্ডফোন অপারেটর এবং সরকারের মধ্যে ভাগাভাগি হয়। বিটিআরসি প্রতি মিনিটের কল আনার ক্ষেত্রে ট্যারিফ তিন সেন্ট থেকে কমিয়ে দেড় সেন্ট করার প্রস্তাব দেয়। পাশাপাশি রাজস্ব ভাগাভাগিতেও সরকারের অংশ প্রায় ১২ শতাংশ কমানোর প্রস্তাব দেয়। তখন বিটিআরসি বলেছিল, বর্তমান অবস্থায় টার্মিনেশন রেট কমালে সরকারের ১ হাজার ৭৩ কোটি টাকা লোকসান হবে। অর্থ মন্ত্রণালয় তাদের সে প্রস্তাব ফিরিয়ে দেয়। এখন নতুন করে মিথ্যা তথ্য দিয়ে আবার প্রস্তাব দিয়েছে বিটিআরসি। এবারের প্রস্তাবে দেখানো হয়েছে সরকারের বছরে দুইশ’ কোটি টাকা লাভ হবে। দুইশ’ কোটি টাকা লাভের প্রস্তাবে বিটিআরসি বলেছে, বর্তমানে দেশে প্রতিদিন সাড়ে তিন কোটি মিনিটের মতো বৈধ কল আসে এবং টার্মিনেশন রেট কমিয়ে দেয়া হলে তা নয় কোটি মিনিটে চলে যাবে। ফলে সরকারের কোনো লোকসান হবেই না বরং আরো দুইশ’ কোটি টাকা বেশি আয় হবে। বিটিআরসি সংশ্লিষ্টরা বলছেন, বাংলাদেশে বর্তমানে প্রতিদিন বৈধ পথে বিদেশ থেকে টেলিফোন কল আসে ছয় কোটি মিনিট। কিন্তু তারা এটি প্রায় অর্ধেকে নামিয়ে উল্লেখ করছে। বিটিআরসি সরকারের কাছে প্রতি মাসেই বৈধ পথে আসা আন্তর্জাতিক টেলিফোন কলের একটা হিসেব পাঠায়। সেসব প্রতিবেদন যাচাই-বাছাই করে বা গত কয়েক বছরের বিটিআরসি বার্ষিক প্রতিবেদনেও দেখা গেছে ২০১২ সালের ডিসেম্বরের পরে আর কখনোই ইনকামিং টেলিফোন কল চার কোটি মিনিটের নীচে নামেনি। সর্বশেষ তিন মাসে আসা ফোন কল প্রতিদিন ছয় কোটি মিনিটের ওপরে। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, ট্যারিফ দেড় সেন্ট করলে এমনিতেই দেশে ডলার অনেক কম আসবে। সেখান থেকে সরকারের আয়ও যাবে কমে। আবার উল্টো সরকারের রাজস্বের অংশ ৫১ দশমিক ৭৫ শতাংশ থেকে কমিয়ে ৪০ শতাংশ করার প্রস্তাব করেছে বিটিআরসি। বর্তমান কাঠামো অনুসারে আইজিডব্লিউ’র আনা আয়ের ৫১ শতাংশ দশমিক ৭৫ পায় সরকার। বাকি অর্থের মধ্যে ১৫ শতাংশ পায় আইসিএক্স, ২০ শতাংশ পায় যে মোবাইল বা ল্যান্ডফোনে কলটি যায় তারা এবং ১৩ দশমিক ২৫ শতাংশ পায় আইজিডব্লিউ অপারেটরটি। এই কাঠামো বদলে সরকারের জন্য ৪০ শতাংশ, আইজিডব্লিউদের জন্য ২০ শতাংশ, আইসিএক্সদের জন্য ১৭ দশমিক ৫০ শতাংশ এবং যে মোবাইল বা ল্যান্ডফোনে কলটি যায় তাদের জন্য ২২ দশমিক ৫০ শতাংশ রাখার প্রস্তাব করা হয়েছে। সূত্র মতে, এক সময় দেশে ৮ সেন্টে বিদেশ থেকে ফোন কল আসত। পরে সেটি ছয় সেন্ট করা হয়। আর ২০০৮ সালে নিলামের সময় টার্মিনেশন রেট নামিয়ে ৩ সেন্ট করা হয়। সংশ্লিষ্ট ব্যবসায়ীরা জানিয়েছেন, মালদ্বীপে প্রতি মিনিটের টার্মিনেশন রেট ২৫ সেন্ট। নেপালে সাড়ে ৯ সেন্ট, শ্রীলঙ্কায় ৯ সেন্ট এবং পাকিস্তানে সম্প্রতি টার্মিনেশন রেট বাড়িয়ে ৮ দশমিক ৮ সেন্টে উন্নীত করা হয়েছে। কিন্তু এখানেও তথ্য লুকিয়ে মিথ্যাচার করেছে বিটিআরসি। চিঠিতে বিটিআরসি বলছে, পার্শ্ববর্তী দেশগুলোতে কল টার্মিনেশন রেট ১ সেন্ট। বিটিআরসি’র বিভিন্ন পর্যায়ের কর্মকর্তারাও মিথ্যাচারের বিষয়টি স্বীকার করেছেন। কিন্তু তাদের কেউ এ বিষয়ে মুখ খুলতে রাজি হননি। একজন কর্মকর্তা বলেন, তাদেরকে যেভাবে প্রস্তাব তৈরি করতে বলা হয়েছে তারা সেভাবেই তৈরি করেছেন। বিটিআরসি’র চেয়ারম্যান সুনীল কান্তি বোসের সঙ্গে এ বিষয়ে কথা বলার জন্য বারবার চেষ্টা করা হলেও তিনি রাজি হননি।