শিল্পের অন্তিম বিষয়বস্তু মানুষ। তাই হয়তো দেবতা, দেবতা আদলে মানুষ, আর এই ক্রমধারায় সাহিত্যের শেষ আশ্রয়স্থল আজ শুধু মানুষ। সকাল দুপুর রাত অর্থাত্ চারধারের সাধারণ মানুষ; পূর্বের সেই ওপর তলার রাজরাজড়া নয়। আমাদের সভ্যতার পিলসুজশেষাবধি হয়ে ওঠে সাহিত্যেরও পিলসুজ। শাসক ও সামন্ত শ্রেণির আস্ফাালন কমতে থাকে সাহিত্য-সংসারেও। উন্মিলিত হয় অপাঙেক্তয়দের অনাদৃত জীবনের সকল সুষমা গরিমা। আর এই উন্মিলনকে আরো বেগবান করবার জন্য যিনি সদর্পে এগিয়ে আসবেন তিনি তো প্রকৃত গণমানুষের কবি। ঠিক এ কাজটিই করেছেন কবি কাজী নজরুল ইসলাম। তিনি এক্ষেত্রে সফল ঝাণ্ডা বাহক। কবির সৃজনধারার উচ্চারণ হয়ে ওঠে গণবাণী রূপে। ল্যাটিন কবির মতো নজরুল ইসলামও সদর্পে, সগর্বে যেন বলে উঠলেন—‘মানুষ আমি, মানুষ সম্পর্কিত কোন কিছুই আমার কাছে উপেক্ষার বিষয়বস্তু হতে পারে না (Homo sum humani nihil a me alienum puto)’।
কবিগুরুর কবিতা ও গান শিক্ষিত সমাজকে অভিভূত করেছে। কবিতা ও গানে ছিল একলা চলায় উদ্বুদ্ধ হবার খোরাক। ছিল দেশের অনুরাগ, কিন্তু সেই অনুরাগের মুক্তি-মন্ত্রে ছিল, সীমার মধ্যে অসীমের মিলন গাঁথনের সুর। আর ছিল শত্রুর প্রতি প্রেম ও ক্ষমার আদর্শ। সবাইকে নিয়ে মহা বিপ্লবে ঝাঁপ দেবার আহ্বান বা প্রেরণা অনুপস্থিত। কিন্তু নজরুলই প্রথম দেখালেন বিশ্বজোড়া মহাবিপ্লবের আয়োজনে কী করে সবাইকে উদ্বুদ্ধ করতে হয়। সাম্রাজ্যবাদের বিরুদ্ধে তিনি হয়ে উঠলেন আপোষহীন সংগ্রামের বাণীমূর্তি। তাঁর কণ্ঠে শোভা পেল সেই অমোঘ বাণী—‘বল বীর-/ বল মাহাবিশ্বের মহাকাশ ফাঁড়ি/ ................/ খোদার আসন ‘আরশ’ ছেদিয়া/ উঠিয়াছি চির বিস্ময় আমি বিশ্ব বিধাত্রীর!’
শনিবারের চিঠির সজনীকান্ত দাস, যিনি নাকি কাজী নজরুলকে এক সময় বলেছিলেন ‘গালির গালিচার বাদশা’ তিনিও লিখলেন—‘স্বদেশী আন্দোলনের মুখে রবীন্দ্রনাথ প্রমুখ কবিগণ যেভাবে বহুবিধ সঙ্গীত ও কবিতার সাহায্যে বাঙালীকে দেশপ্রেমে উদ্বুদ্ধ করিয়াছিলেন, অসহযোগ আন্দোলনের বৃহত্তর বিপ্লবে যে কারণেই হউক, তাঁহারা ঠিক সেভাবে সাড়া দেন নাই। একমাত্র কবি নজরুলই ছন্দে গানে এই আন্দোলনকে জয়যুক্ত করিয়াছিলেন; পরবর্তী আন্দোলনের চারণ-কবি তাঁহাকেই বলা যাইতে পারে।’
প্রথম বিশ্বযুদ্ধের পর কেবল গুছিয়ে উঠবার পর্ব চলছিল চারদিকে। সশস্ত্র আন্দোলনের প্রথম পর্যায় শেষ হলেও নতুন করে শুরু হয় অসহযোগ আন্দোলন। আর এই সময়ের রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে খরতর বেগে ছুটে এলেন নজরুল। তাঁর গান কবিতা বক্তৃতা ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদের বিরুদ্ধে হয়ে উঠল প্রতিবাদের খড়্গ। শুধু তা-ই নয়, নজরুল হয়ে ওঠেন কুলি-মজুর, গ্রাম বাংলার কৃষকের এবং সাম্যবাদী কবি। আসলে ছকে রেখে প্রমাণ করা যাবে না নজরুল ইসলাম কীসের বা কার কবি। নজরুল ইসলাম বিদ্রোহী, বাঁধনহারা, অগ্নিবীণা, দোলন-চাঁপা, প্রলয় শিখা, ফণী মনসা, বিষের বাঁশি, ভাঙার গানের কবি। নজরুল ইসলাম কেন যুগ-মানসের কবি, তার প্রামাণ্য দলিল এই রচনার অধিক আর কিছু হতে পারে না। শেষাবধি এও সহজে বলা যায় যে, তিনি জনগণের কবি। পরাধীনতা, লাঞ্ছনা, দরিদ্রতা, শোষক শ্রেণির ভণ্ডামী আর ধর্মের নামে, রাজনীতির নামে নানাবিধ শোষণ কবিকে করেছিল বিচলিত। তাই তাঁর সকল উচ্চারণ হয়ে উঠেছিল শোষিত মানুষের সংগ্রামের হাতিয়ার।
নজরুলের বিদ্রোহ সর্বগ্রাসী। তাঁর বিদ্রোহ ধ্বংসে, তাঁর বিদ্রোহ সৃষ্টিতে। অন্যকথায় ধ্বংসের মাঝে সৃষ্টির উল্লাস। আর সেই সময়কে বিবেচনা করলে এও অনুধাবন করা যায় যে, নজরুল ইসলামের রচনার বিষয়বস্তুতে কেন বিদ্রোহের সুর বেজে উঠেছিল। জনগণের ভাবাবেগ, চিন্তাধারার সঙ্গে সঙ্গতি ছিল তাঁর রচনার। প্রকৃত অর্থে যুগ-ধর্মের বেদনাবোধই কবিকে করে তুলেছিল বিদ্রোহী। এমনই এক বিশেষ পরিস্থিতিতে জর্জরিত ফরাসি কবি পল এলুয়ার কোনো এক জবানবন্দিতে বলেছিলেন—‘সময় এসেছে যখন, সব কবির উপর অধিকার ও কর্তব্য ন্যস্ত হয়েছে—এই কথা ঘোষণা করবার যে তারা অন্য মানুষদের জীবনে, সর্বসাধারণের জীবনে গভীরভাবে প্রোথিত..... মূক জনতার হয়ে কথা বলবার সাহস তার থাকা চাই।’ নজরুল ইসলাম সেই সময় হয়ে উঠেছিলেন মূক জনতার হয়ে কথা বলার প্রতীক পুরুষ। তাঁর বিদ্রোহের বাণী আগুনের গোলা হয়ে সকল জড়তাকে করেছির উষ্ণায়িত। করেছিল তাড়িত। অনেকে বলে থাকেন, নজরুলের কবিতায় কাব্যমূল্য যতটুকু আছে তার অধিক আছে হইচই। কিন্তু নজরুল ইসলাম তো সর্বোপরি মানুষ। বলা যেতে পারে ভাবের নয়, মূক নয়, রক্তমাংসে গড়া জ্যান্ত কবি-মানুষ। তাঁর ‘বিদ্রোহী’ কবিতা নিয়ে প্রেমেন্দ্র মিত্র এক আলোচনায় বলেছিলেন—‘কাব্য-বিচারে ‘বিদ্রোহী’র মূল্য সকলের কাছে সমান না হতে পারে, কিন্তু তদানীন্তন যুগ-মানস যে এই কবিতার মাধ্যমেই প্রতিবিম্বিত এ কথা কেউ বোধ হয় অস্বীকার করবেন না। এ কবিতার বিশৃঙ্খল ছন্দ ও উগ্র উত্কট উপমা উেপ্রক্ষাও যেন সে যুগের অন্তরলোকের নিরুদ্ধ বাষ্পাবেগের দ্বারা উিক্ষপ্ত’ (প্রেমেন্দ্র মিত্র; নজরুল স্মৃতি; পৃষ্ঠা-৭৩)। অনেক নিন্দুকের উত্তর খুঁজে পাওয়া যাবে প্রেমেন্দ্র মিত্রের এই সহজ উক্তিতে। আর নজরুল ইসলামের সহজ উক্তি আমাদের সবার জানা—‘বন্ধুগো আর বলিতে পারি না, বড় বিষজ্বালা এই বুকে,/ দেখিয়া শুনিয়া ক্ষেপিয়া গিয়াছি, তাই যাহা আসে কই মুখে,/ ................/ বড় কথা বড় ভাব আসেনাক মাথায়, বন্ধু বড় দুখে!/ অমর কাব্য তোমরা লিখিও, বন্ধু, যাহারা আছ সুখে!’ (আমার কৈফিয়ত্; সর্বহারা)
নজরুল ইসলাম এতবড় জনপ্রিয় সৈনিক কবি হবার মূল কারণ ছিল, তিনি উঠতে পেরেছিলেন জাতি ধর্ম বর্ণ গোত্র সবকিছুর ঊর্ধ্বে। অবশ্য এই অসাম্প্রদায়িকতার বীজ নজরুলের মনে গ্রথিত হয় শৈশবেই। মুসলিম হিন্দু খ্রিস্টান নির্বিশেষে সকলের সঙ্গে বন্ধুত্ব তাঁকে একজন সত্যিকারের অসাম্প্রদায়িক কবি হিসেবে গড়ে উঠতে সাহায্য করেছিল। আর এর ধারাবাহিকতায় কবির অন্তরে অঙ্কুরিত হয় সাম্যবাদের বীজ। সাম্যবাদের আত্মপ্রতিষ্ঠার ঢিবিতে দাঁড়াতেই নজরুল দেখতে পেলেন জগদ্দল পাহাড়, ভারতবর্ষের পরাধীনতা। ব্রিটিশ রাজের বিরুদ্ধে জোর সংগ্রাম ঘোষণা করে নজরুল হয়ে উঠলেন আরো জনপ্রিয়। বিশেষ করে ‘বিজলী’ ও ‘মোসলেম ভারত’ পত্রিকায় ‘বিদ্রোহী’ কবিতা প্রকাশিত হবার পর বাঙালি তরুণ সমাজকে ভীষণভাবে প্রভাবিত করে। তারুণ্যের আদিত্য সকল তরুণের বুকে জ্বলে উঠল একসাথে। তরুণ সমাজের আটপৌরে ভাষাতেও প্রতিফলিত হতে দেখা গেল বিদ্রোহের সুর। তাদের চাল চলনের ভাষাও যেন এমন— ‘আপনারে ছাড়া কাহারে করি না কুর্নিশ’। যেন একটি আত্মা উপমহাদেশের সমস্ত আত্মার সঙ্গে একাত্মতা ঘোষণা করে দুর্বার গতিতে এগিয়ে চলেছে মুক্তির সন্ধানে। সবাই আজ মুক্তির উদ্দাম আনন্দে দিশেহারা। ‘আমি যাঁদের দেখেছি’ শিরোনামের এক স্মৃতিকথায় পরিমল গোস্বামী বলেছেন—‘অত্যাচারীর বিরুদ্ধে এমন ভাষায় আর কোন বাঙালী কবি চ্যালেঞ্জ জানাননি। সমাজের উত্পীড়নে এমন শপথ আর কারো মুখে তো শুনিনি। Must fight to the finish মন্ত্রে দীক্ষিত আর কোন বাঙালী কবি শত্রুপক্ষকে এমন আহ্বান জানাননি।’ দেশমাতৃকাকে শৃঙ্খল মুক্ত করবার লক্ষ্যেই যেন নজরুল ইসলামের জন্ম। তাঁর চলা, বলা কিংবা লেখায় সেই সুরই ধ্বনিত সারাক্ষণ। তাঁর তত্ত্বাবধায়নে প্রকাশিত পত্রিকার সুরও তা-ই। ব্রিটিশ রাজ বুঝতে পারে আন্দোলনমুখী জনগণকে থামাতে হলে প্রথমে থামাতে হবে নজরুলকে; তাঁর গতিধারাকে। সকল রোষ গিয়ে পড়ে নজরুলের ওপর। কিন্তু প্রবল গতিসম্পন্ন স্রোতধারাকে হঠাত্ বাঁধ দিয়ে আটকানো যায় না। বরং গতি আরো বাড়িয়ে স্রোত তার পথ বদলায়; দু’কূল উপচায়। নজরুলেরও খুলে গেল সকল বাঁধ। কবি ‘ধূমকেতু’র মাধ্যমে ঘোষণা করেন ভারতবর্ষের পূর্ণ স্বাধীনতা। কবির ভাষায়—‘সর্বপ্রথম ‘‘ধূমকেতু’’ ভারতের পূর্ণ স্বাধীনতা চায়। স্বরাজটরাজ বুঝি না। কেননা, এ কথাটার মানে এক এক মহারথী এক এক রকম করে থাকেন। ভারতের এক পরমাণু অংশও বিদেশিদের অধীনে থাকবে না। ভারবতর্ষের পূর্ণ স্বাধীনতা রক্ষা, শাসনভার সমস্ত থাকবে ভারতীয়ের হাতে।’ (১৯২২, ২৩ অক্টোবর)। নজরুল ইসলামের এই সমস্ত অগ্নিগর্ভ সম্পাদকীয় ও নিবন্ধগুলো আরো অনুপ্রাণিত করল যুবসমাজকে। স্বাধীনতার জন্যে যারা সশস্ত্র আন্দোলনে বিশ্বাস করতেন তারাও যেন নতুন করে দীক্ষিত হলেন নজরুল-মন্ত্রে। এক্ষেত্রে মুজাফ্ফর আহমেদের মন্তব্য উল্লেখ করা যেতে পারে। তিনি মনে করেন—‘১৯২৩-২৪ সালে সন্ত্রাসবাদী আন্দোলন আবার যে মাথা তুলল, তাতে নজরুলের অবদান ছিল, এ কথা বললে বোধহয় অন্যায় হবে না। সন্ত্রাসবাদী বিপ্লবীদের দু’টি বড় বিভাগের মধ্যে ‘যুগান্তর’ বিভাগের সভ্যরা তো বলেছিলেন যে, ‘‘ধূমকেতু’’ তাঁদেরই কাগজ।’ (কাজী নজরুল ইসলাম স্মৃতিকথা। পৃষ্ঠা : ২৯১।) আসলে তখন সকল বিপ্লবীদের কর্মকাণ্ডে প্রতিফলিত হলো নজরুলের ছায়া। নজরুল তাদের সমনে আদর্শসম। সাম্রাজ্যবাদী শক্তি হয়ে পড়লেন দিশেহারা। এর ফল যথার্থই ভোগ করতে হলো নজরুলকে। একের পর এক নিষিদ্ধ হতে থাকল তাঁর লেখা ও লেখা বই। খাটতে হলো জেলও।
একক লেখক হিসেবে সমসাময়িককালে নজরুল ইসলামের রচনাই সবচেয়ে বেশি শাস্তিপ্রাপ্ত। নিছক সংখ্যার দিক থেকে কারো কারো বেশি হলেও সমাজে তার প্রভাব বিস্তারের দিক থেকে কিংবা সাহিত্যমূল্যের দিক থেকে নজরুলের ধারে কাছেও তারা ছিলেন না।
নজরুল ইসলামের প্রথম নিষিদ্ধ বই ‘যুগবাণী’ (১৯২২)। যুগবাণীর পরে যে বইটি বাজেয়াপ্ত হয়, তার নাম ‘বিষের বাঁশি’ (১৯২৪)। বই দুটি বাংলা সরকার নিষিদ্ধ করে ফৌজদারি বিধির ৯৯ এ ধারা অনুসারে। এরপর একের পর এক নিষিদ্ধ হতে থাকে ‘ভাঙার গান’ (১৯২৪), ‘প্রলয় শিখা’ (১৯৩১), চন্দ্রবিন্দু (১৯৩১)। এছাড়া ‘অগ্নিবীণা’ ‘রুদ্রমঙ্গল’কেও ব্রিটিশ রাজের নানা রোষের মুখে পড়তে হয়। একের পর এক নিষিদ্ধ হতে থাকলেও বইয়ের প্রচার বন্ধ করা যায়নি। নজরুলের বিশের বাঁশির অগ্নিসুরে মাতোয়ারা ভারতবর্ষ। তরুণদের উত্সাহ আরো হাজার গুণ বেড়ে যায় নিষিদ্ধ বই পড়াতে। বই না পেলেও ছাপাখানার কোনো গুদামে কাগজের জঞ্জালের কোনো তলায় যদি কোনো ফর্মা পেয়েও যায়, তাই-ই অমূল্য রতন ভেবে কুড়িয়ে নিয়েছে তারা। পড়েছে আর হাত বদল করেছে অন্যদের সাথে। সরকারের এত কড়াকড়ির পরেও কলকাতার অলিগলি, ফুটপাত এমনকি বিভিন্ন সভা সম্মিলনে প্রকাশ্যেই বিক্রি হয়েছে নজরুলের বই। আর এতে শাসকগোষ্ঠীর ক্রোধ আরো বেড়ে যায়। ক্ষেপে ওঠে আমলা, গোয়েন্দা। তল্লাশি চালানো হয় কলকাতার প্রায় সকল লাইব্রেরিতে। কিন্তু বই যথেষ্ট পরিমাণে তারা পায় না। ততক্ষণে বিলি যা হবার তা হয়ে গেছে সারা বাংলায়। পুলিশ কমিশনার টেগার্ট ২৯ অক্টোবর ১৯২৪ সালে একটি চিঠি লিখেন চিফ সেক্রেটারিকে। সেখানে এই তল্লাশি সম্পর্কে কিছুটা বিবরণ আছে। ২৩ অক্টোবর সারা কলকাতা তল্লাশি চালিয়ে ৪৪টি বই জব্দ করা হয়েছে। তবে হুগলিতে কবির বাড়ি তল্লাশি করে কোনো বই পাওয়া যায়নি।
নজরুল-ভয়ে ব্রিটিশ-ভারত রাজন্যবর্গ কত বেশি ভীতসন্ত্রস্ত হয়েছিল, তার একটি ছোট্ট উদাহরণ দেওয়া যেতে পারে। আমাদের জানা আছে যে, ‘ধূমকেতু’তে ‘আনন্দময়ীর আগমনে’ নামক কবিতাটি ছাপা হলে (২৬ সেপ্টেম্বর ১৯২২) নজরুলের এক বছরের কারাদণ্ড হয় (ভারতীয় দণ্ডবিধির ১২৪ এ ধারা অনুসারে)। ওই সংখ্যায় ছাপা হয়েছিল ‘বিদ্রোহীর কৈফিয়ত্’ শিরোনামে একটি ছোট্ট নিবন্ধ। যার রচক ছিলেন ১১ বছর বয়সী এক শিশু। এখানে উল্লেখ্য বিষয় হচ্ছে, ওই লিখাটিও রাজরোষ থেকে রক্ষা পায়নি। বাজেয়াপ্ত হয় ‘বিদ্রোহীর কৈফিয়ত্’। এ হলো এক চরম পর্যায় রাজরোষের। যা হয়তো ছিল, ভালোমন্দের বিচারবুদ্ধি লোপ পাবার মানদণ্ডও।
কিন্তু পাখি সে তো গান গাইবেই। অন্যের ভালো লাগলেও গাইবে, না লাগলেও গাইবে। এ তার স্বভাব। কোনো প্রতিকূলতাই তাকে আটকাতে পারবে না। নজরুলও তা-ই। ঘুমন্ত চেতনাকে জাগিয়ে তোলার পাখি। তাইতো বিচারের কাঠগড়ায় দাঁড়িয়েও গেয়েছেন সেই সুরে গান। তিনি বলেছেন—‘আমার উপর অভিযোগ, আমি রাজবিদ্রোহী!... রাজার পেছনে ক্ষুদ্র, আমার পেছনে রুদ্র।... রাজার বাণী বদ্বুদ, আমার বাণী সীমাহারা সমুদ্র।’ আর সেই বিচারে চিফ প্রেসিডেন্সি ম্যাজিস্ট্রেট কবি সুইনহো নজরুলকে রাজদ্রোহের অভিযোগ এনে ১ বছরের সশ্রম কারাদণ্ড প্রদান করেন। একজন কবি হয়েও নজরুলকে কোনো প্রথম বা দ্বিতীয় শ্রেণি নয়, প্রদান করা হয় সাধারণ কয়েদির মর্যাদা। নজরুল ইসলামের অপরাধ, তিনি গভীর আক্রোশে উমা আনন্দময়ীকে ডেকেছেন ভূ-ভারতে। উমাকে কবির জিজ্ঞাসা—‘দেব-শিশুদের মারছে চাবুক, বীর যুবাদের দিচ্ছে ফাঁসি,/ ভূ-ভারত আজ কসাইখানা, আসবি কখন সর্বনাশী?’
শুধু তা-ই নয়, যারা অহিংস আন্দোলনের কথা বলেন, তাদের কবি বলেছেন নপুংসক। তাদেরও খড়েগর তলে ফেলার কথা বলেছেন। কবির সাফ কথা, সকল মুক্তি আজ সহিংস আন্দোলনেই মিলবে।—‘ঢাল তরবার, আন মা সমর, অমর হবার মন্ত্র শেখা,/ মাদীগুলোয় কর মা পুরুষ, রক্ত দে মা রক্ত দেখা।’
নজরুলকে কারাকক্ষে রেখে লাভ হলো না ব্রিটিশরাজের। বরং ফল হলো উল্টো। নজরুলের বিদ্রোহ এতদিন ছিল মুক্ত আবহে। এবার সেই বিদ্রোহের বাষ্প ছড়িয়ে পড়লো কারার অভ্যন্তরে। হয়তো এর বিশেষ দরকারও ছিল। শিকল পরেও যে শিকল ভাঙার গান এত প্রাণ শক্তি নিয়ে গাওয়া যায়, তা এর আগে কেউ দেখেনি কখনো। শিশির কর তাঁর এক গবেষণায় দেখিয়েছেন—‘তাঁর প্রচণ্ড প্রাণশক্তি জেলখানাকেও সজীব করে তুলেছিল। জেলের ভেতরে বসে তিনি গান বানাতেন, দলও গড়তেন। এসে জুটতো অন্য রাজনৈতিক বন্দিরা। হাতে-পায়ের শিকল ঝনঝনিয়ে সকলে তাঁর সুরে সুর মিলিয়ে গাইতেন—‘এই শিকল পরা ছল মোদের এ শিকল পরা ছল,/ এই শিকল পরেই শিকল তোদের করবো রে বিকল’
এতে কারা কর্তৃপক্ষ আরো কঠোর থেকে কঠোরতর হলো। বন্দিদের একে অপরের মধ্যে কথা বলা পর্যন্ত বন্ধ করে দিল। কিন্তু কারার সকল দ্বার বন্ধ হলেও নজরুলকে বাঁধতে পারল না কোনো দ্বার। বরং নতুন করে সজীব ও প্রাণশক্তি ফিরে পেলেন কবি। গেয়ে উঠলেন সমস্বরে—‘লাথি মার ভাঙরে তালা!/ যত সব বন্দী-শালায়/ আগুন জ্বালা,/ আগুন জ্বালা, ফেল উপাড়ি!’
সে-সময়ে নজরুলের জন্য কারাজীবন বিশেষ করে উদ্দেশ্য সফলের জন্য আশীর্বাদ হিসেবে ধরা দিল। আর আমাদের মাঝে উন্মোচিত হয় তাঁর গণসাহিত্যের নতুন অধ্যায়। সুভাষচন্দ্রের মূল্যায়ন এরকম—‘কারাগারে আমরা অনেকে যাই, কিন্তু সাহিত্যের মধ্যে সেই জেল জীবনের প্রভাব কমই দেখতে পাই। তার কারণ অনুভূতি কম।.... এতে বুঝা যায় যে, তিনি একটি জ্যান্ত মানুষ। আমরা আর একটু বাড়িয়ে বলতে পারি, নজরুল প্রকৃত অর্থে জ্যান্ত কবি। সরকারী কেউটের ছোবল কবিকে নীল করতে পারেনি। যা করেছে, তা সবুজ।’
সময় বিবেচনায় সেই অসহযোগ আন্দোলনে কবির সেই দীপ রাগিনীর সুর অধিকারবঞ্চিত দেশবাসীকে মৃত্যুঞ্জয়ী সুধা পান করিয়েছিল। উদ্বুদ্ধ হয়েছিল নতুন করে জেগে উঠার মন্ত্রে। শুধু সাম্রাজ্যবাদের বিরুদ্ধে নয়, মৌলিক অধিকার হারিয়ে যারা প্রায় বিলীন পথের যাত্রী, তাদের সজীব করে আন্দোলনে যুক্ত করাও ছিল নজরুলের মূল লক্ষ্য। রাজনৈতিক, অর্থনৈতিকসহ সকল মৌলিক প্রশ্নে যখন সহায়হীন সমাজ জড়ত্বের শেষ প্রান্তে, ঠিক তখনই নজরুল শোনালেন দেয়াল ভাঙার গান। নিকষ অন্ধকারে প্রজ্জ্বলিত হলো নব চেতনার আলো। সারা দেশে জাতীয় জীবনের ভাবনায়, সংগ্রামমুখী চেতনার সঞ্চার হলো। কবির মানস সেদিন গাইলো ‘অন্তর ন্যাশনাল সঙ্গীত’—‘শোন অত্যাচারী! শোন রে সঞ্চয়ী।/ ছিনু সর্বহারা, হব সর্বজয়ী\ সেদিনের সেই ‘অন্তর ন্যাশনাল সঙ্গীত’ যেন ছিল পরাধীন ভারতবর্ষের স্বাধীন হবার মন্ত্রগীত। হয়তো সেই সময়ের বিশেষ পরিস্থিতির জাতীয় সঙ্গীতও। যদিও এই উপমহাদেশের কোনো দেশে নজরুলের কোনো গান জাতীয় সঙ্গীতের মর্যাদা পায়নি। তবে সমাজনীতি, রাজনীতি, অর্থনীতি, ভাবনীতি; সকল বিবেচনা করে এবং ইংরেজ থেকে স্বাধীন হবার ইতিহাস পর্যালোচনা করে, কাজী নজরুল ইসলামকে যদি সমগ্র ভারতবর্ষের কিংবা খানিকটা কৃপণ হয়ে সমগ্র বাংলাভাষাভাষী অঞ্চলের জাতীয় কবি বলি, তবে অত্যুক্তি হবে কি? কারণ, নজরুল ইসলামের প্রেম, বিদ্রোহ, অনুরাগ, অভিমানের সঙ্গে বাংলা ও বাঙালি মানসের আত্মীয়তা চিরকালীন। নজরুল যুগ-মানসের, যুগ-ধর্মের কবি। নজরুল বিদ্রোহী কবি, নবজাগরণের কবি। অপরপক্ষে সফলতম প্রেমের কবি। নজরুল-বীণার একই তারে মানব মৌলের সকল সুর বাঁধা। যা বাঙালি মানসের সুর। অন্তত ইতিহাস তা বলে।
