বিদ্যুতের দাম কেন দুদিন পর পর বাড়ে, নাবিল জানে। একটা মেয়ে যদি সারাদিন ফোনে এত কথা বলে আর এতবার মোবাইলে চার্জ দেয়, তাহলে বিদ্যুতের দাম না বাড়ার কোনো কারণ আছে? সায়মাকে সে যখনই ফোন দেয়, হয় ওয়েটিং দেখায়, নয়তো বিজি। সে বোঝে না, এত কথা কেন বলতে হবে। যেহেতু মোবাইল কোম্পানি কলরেট কমিয়ে দিয়েছে, তাই সারাদিন কথা বললেও পয়সা খুব বেশি খরচ হয় না, সেটা ঠিক আছে। তাই বলে কথা বলাটাকে ‘মাই হবি’র পর্যায়ে নিয়ে যেতে হবে? মোবাইলে কথা বলা ছাড়া দুনিয়ায় কি আর কোনো কাজ নেই? আজ যদি মোবাইল আবিষ্কার না হতো, এই মেয়ে করতটা কী?
—ঘোড়ার ঘাস কাটতাম। সায়মার মুখস্থ উত্তর। রাগ কিংবা অসন্তুষ্টির সময় সে এই ধরনের মুখস্থ বাক্য ব্যবহার করে থাকে।
—ঘোড়ার ঘাস কাটলেও তো অন্তত কবি সাহেব খুশি হতেন।
—কবি! কিসের কবি! কোন কবি?
—সেই কবি, যে কবি লিখে গেছেন—‘জীবে প্রেম করে যেইজন, সেইজন সেবিছে ঈশ্বর।’ তুমি যে বললে ঘোড়ার ঘাস কাটতে, সত্যিই যদি ঘোড়ার ঘাস কাটতে, তাহলে ঘোড়া নামক জীবটার সেবা করা হতো। কাঁচা ঘাস খেয়ে ঘোড়ার দৃষ্টিশক্তি বাড়ত। কবি সাহেব এই ভেবে খুশি হতেন, তুমি তার কবিতায় উদ্বুদ্ধ হয়ে ঘোড়ার সেবা করে ঘোড়ার দৃষ্টিশক্তি বাড়িয়েছ।
রাগে দাঁত কড়মড় করে সায়মার। কারও ওপর হাত চালানোর অভ্যাস তার নেই। থাকলে উদ্ভট কথাবার্তা বলার অপরাধে নাবিলের অবস্থা মুমূর্ষু হয়ে যেতে পারত। সায়মা চুপচাপ বসে থাকে। নাবিল তার দিকে আড়চোখে তাকায়। তার রাগের সর্বশেষ অবস্থা অনুমান করার চেষ্টা করে। যদিও তাকে আড়চোখে তাকাতে দেখলে সায়মা তিনগুণ রেগে যাবে। কারণ সে মনে করে, আড়চোখে তাকায় বখাটেরা। অবশ্য বখাটেদের আড়চোখ মেয়েদের বুকের ওপরই বেশি যাতায়াত করে। সে নাবিলকে বেশ কয়েকদিন বলে দিয়েছে, তার দিকে আড়চোখে না তাকাতে। কিন্তু নাবিল সঙ্গে সঙ্গে যুক্তি দাঁড় করিয়েছে—আমি তো আড়চোখে কারও বুকের দিকে তাকাচ্ছি না, নাকি! আমি তাকাচ্ছি মুখের দিকে। সায়মাও যুক্তি নাকচ করে দিতে সময় নেয়নি—মুখ থেকে বুকে চলে যেতে কতক্ষণ। ছেলেদের চোখের তো আবার ব্রেক নেই।
—তাইতো বলি এত গরম লাগছে কেন! নাবিল কথাটা এমনভাবে বলে, যেন দীর্ঘদিন গবেষণার পর এইমাত্র সে গরম লাগার একটা অভিনব কারণ উদ্ভাবন করেছে। বলার ধরনটা ভালোই প্রভাবিত করে সায়মাকে। সে রাগের কথা ভুলে গিয়ে অতি আগ্রহের সুরে জিজ্ঞেস করে—কেন গরম লাগছে?
—তোমার মেজাজ অনেক গরম হয়ে আছে তো, তাই। হাসি চেপে বলে নাবিল।
নাবিল হাসি চেপে রাখলেও সায়মা হাসি চেপে রাখতে পারে না। নাবিলের কানের পর্দায় কাঁপন ধরিয়ে সে উচ্চশব্দে হেসে ওঠে। শব্দের পাশাপাশি হাসির দৈর্ঘ্যও একেবারে কম হয় না। নাবিল হাঁফ ছাড়ে। কারণ এই জাতীয় একটা হাসির বর্ষণ না হলে সায়মার রাগের মেঘ কাটে না। যেহেতু মেঘ কেটেছে, অতএব এবার প্রেম-ভালোবাসার সংলাপে যাওয়া যেতে পারে। নাবিল সায়মার দিকে ঘুরে বসে। রোমান্টিক কথা শুরু করার জন্যে মৃদু কাশি দিয়ে গলা পরিষ্কার করে নেয়। কিন্তু তার গলা পরিষ্কার কার্যক্রম সম্পন্ন হওয়ার আগেই সায়মা পরিচ্ছন্ন গলায় বলে ওঠে—আমার ফোনে কথা বলা নিয়ে দুদিন পর পর এভাবে মশকরা না করলে হয় না?
—কেন, তুমি কি আমার খালা শাশুড়ি টাইপের কিছু লাগো যে, তোমার সঙ্গে একটু মশকরাও করা যাবে না? তোমার সঙ্গে প্রেম করি, মশকরা তো করব তোমার সঙ্গেই। বলতে পারো একটার সঙ্গে আরেকটা ফ্রি। মশকরা করার জন্যে কি আরেকটা মেয়ে খুঁজে নেওয়া ঠিক হবে?
—সাহস থাকলে খুঁজে নাও না। আমি ছাড়া কোনোদিন যদি অন্যকোনো মেয়ের সঙ্গে তোমাকে দেখি, তাহলে একদম জীবন্ত পুঁতে ফেলব।
—মনে হচ্ছে ডায়লগটা বাংলা ছবির ভিলেনদের কাছ থেকে ধার করা। যদিও আমি পুরোপুরি নিশ্চিত না।
—নিশ্চিত হতে হবে না। কিন্তু আমি যে ঘণ্টার পর ঘণ্টা কোনো ছেলের সঙ্গে কথা বলি না, এই ব্যাপারে নিশ্চিত আছো তো?
—তা আছি। আচ্ছা, তোমার আপু কেমন আছে?
নাবিলের প্রশ্নের জবাব দেয় না সায়মা। সে অন্যদিকে মুখ ফিরিয়ে নেয়। নাবিল একই প্রশ্ন আবার করে। সায়মা এবার বাচ্চাদের মতো ভেংচি কেটে বলে—এতক্ষণে আমার আপুর প্রতি দরদ উথলে উঠেছে, না? আপুর সঙ্গে একটু কথা বলি বলে এত খোঁটা, এখন জানতে চাচ্ছে আমার আপু কেমন আছে! আমার আপু কেমন আছে, সেটা তোমার না জানলেও চলবে।
—চলবে না, চলবে না। উনার খোঁজ-খবর না নিলে চলবে না। শত হলেও উনি আমার হবু বউয়ের একমাত্র বড় বোন।
—শুধু বড় বোন? কেন, ‘সহোদর’ শব্দটা উচ্চারণ করলে ঠোঁট ব্যথা করে?
—ঠোঁট ব্যথা করলেও সমস্যা তো নেই। তুমি আছো না?
—আমি ঠোঁটের ডাক্তার নাকি?
—ডাক্তার না হলেও লিপস্টিক মাখা দুটো ঠোঁট তো আছে। ওই দুটো ঠোঁট এই ঠোঁটে ছোঁয়ালেই সব ব্যথা গায়েব হতে বাধ্য।
—একটা বাঁদরের ঠোঁটে ঠোঁট ছোঁয়াবো, আমার ঠেকা পড়েছে আরকি। ও ভালো কথা, যেকোনো সময় চ্যানেল থেকে আমার ফোন আসতে পারে। তোমাকে বলেছিলাম না একটা চ্যানেলে আমি সিভি জমা দিয়েছিলাম? চাকরিটা মনে হয় হয়ে যাবে। রিপোর্টিংয়ে।
নাবিলের গাল এমনিতেই অন্য ছেলেদের চেয়ে একটু বেশি ফোলা। তার চাপা ভাঙা বন্ধুরা হিংসের বশবর্তী হয়ে প্রায়ই তাকে জিজ্ঞেস করে—কিরে তোর গাল এত ফোলা কেন? গালের ভেতর গুপ্তধন লুকিয়ে রেখেছিস নাকি? নাবিলের ফোলা গাল সায়মার কথা শুনে আরেকটু ফুলে যায়—রিপোর্টার খেতাব গায়ে লাগলে তো তুমি আরো দুর্লভ হয়ে যাবে। এখন শুধু পড়াশোনা আর বড়বোনের সঙ্গে ফোনে কথা বলো। তাতেই শিডিউল নিয়ে তোমার সঙ্গে দেখা করতে হয়। রিপোর্টার হয়ে গেলে তো বছরেও একবার দেখা পাওয়া যাবে না। অথচ বাসা থেকে আমাকে বিয়ের জন্যে চাপ দিচ্ছে। তোমার সম্মতি পেলে যেকোনো দিন আমাদের বিয়ে হতে পারে।
নাবিলের কথায় ম্লান হাসে সায়মা। সে নাবিলের হাত ধরে নিজের গায়ে ছুঁইয়ে বলে—নাবিল, তোমার তুলনায় আমি কতটা তুচ্ছ, সেটা আর কেউ না জানলেও আমি জানি। তুমি বড়লোক বাবার একমাত্র সন্তান। জীবনে কোনোদিন চাকরি করার প্রয়োজন নেই। বাবার ব্যবসা দিয়েই চলবে। কিন্তু আমার মাও নেই, বাবাও নেই। আপুই আমার মা, আপুই বাবা। যেটুকু লেখাপড়া শিখেছি, সেটা আপুর জন্যেই। আপু যদি নিজের জীবনের সব সাধ আহ্লাদ বিসর্জন দিয়ে হাড়ভাঙা পরিশ্রম করে আমার টাকার জোগান না দিতেন, তাহলে হয়তো গণ্ডমূর্খ হয়েই জীবন কাটাতে হতো। এখন আপুর অবস্থাও ভালো না। দুলাভাই তাকে তালাক দেওয়ার পর অত্যন্ত কষ্টে তাকে জীবন যাপন করতে হচ্ছে।
—আমি কিন্তু সবসময়ই বলে আসছি, উনাকে ঢাকায় চলে আসতে বলো।
—বললেই তো শুধু হলো না! ঢাকায় এনে আমি উনাকে রাখব কোথায়? আমারই তো চলে না। আপুর জন্যে যে কাজের ব্যবস্থা করে দেবো, তাও তো পারব না। নাইন পাস মানুষ ঢাকা শহরে ভালো কোনো কাজ পায়? আমার খরচ জোগাতে গিয়ে আপু নিজের লেখাপড়াটাও করতে পারেননি।
—সায়মা, এই কথাগুলো তো আমি আগেই জানি। আজ আবার বলছ কেন? এগুলো শুনলে কি আমার কষ্ট লাগে না বলো?
—সরি, একই কথা বারবার শুনিয়ে তোমাকে কষ্ট দেওয়ার জন্যে। আমার চাকরি আর বিয়ের কথা উঠল তো, তাই কথাগুলো না বলে পারলাম না। আসলে চাকরিটা আমার দরকার দুই কারণে। প্রথম কারণ, আমার আপু। আমি চাই আপুকে ভালো রাখতে। তার আর্থিক কষ্ট দূর করে দিতে। দ্বিতীয় কারণ, নিজেকে একটু হলেও তোমার যোগ্য করে তোলা। আমার কিছু নেই। একটা চাকরিও যদি না থাকে, তাহলে আমার জন্যে তোমাকে আজীবন তোমার আত্মীয়-স্বজনের কাছে ছোট হয়ে থাকতে হবে।
কোনো প্রকার লবিং—তদবির ছাড়াই সায়মার চাকরিটা হয়ে যায়। অ্যাপয়েন্টমেন্ট লেটার হাতে পেয়ে সে প্রথম ফোন দেয় আপুকে। তবে আজকের ফোনালাপটা দীর্ঘ হয় না। আপুই দীর্ঘ হতে দেন না। জানতে চান নাবিলকে খবরটা জানানো হয়েছে কি না। সায়মা না বোধক উত্তর দিতেই তিনি তাগাদা দেন এক্ষুনি নাবিলকে ফোন দেওয়ার জন্যে। সায়মা ফোন কেটে নাবিলকে ফোন করে। খবর শুনে নাবিল চুপ করে থাকে। সায়মা ভেবেছিল, সে আনন্দে চিত্কার করে না উঠলেও অন্তত দায়সারা গোছের একটা কনগ্রাচুলেশনস জানাবে। যেহেতু চাকরির ব্যাপারে তাকে অনেক বোঝানো হয়েছে। খবর শুনে সে মুখের কথাটাও বলবে না, এটা সে ভাবতে পারেনি।
—খবরটা শুনে তুমি খুশি হওনি, তাই না?
—জি।
—আমি তো তোমাকে বলেছি চাকরিটা আমার কেন দরকার। তবু তুমি যদি না চাও, এই মুহূর্তে অ্যাপয়েন্টমেন্ট লেটারটা ফেরত দিয়ে আসব। আমি এখনও চ্যানেলেই আছি।
—একটু পরে ফেরত দিলেও চলবে। আগে নিচে নামো।
সায়মা চার তলা থেকে নিচে নামে। দেখে, নাবিল দাঁড়িয়ে আছে। সায়মা তার সামনে গিয়ে দাঁড়ায়—চেয়ারম্যান স্যার একটু পরেই বের হয়ে যাবেন। অ্যাপয়েন্টমেন্ট লেটার ফেরত দিলে এখনই দিতে হবে। আমি আগে দিয়ে আসি, তারপর তোমার সঙ্গে কথা বলি।
নাবিল এবার খপ করে সায়মার হাত ধরে ফেলে। তারপর তাকে একটা সরু গলিতে টেনে নেয়—এই নির্জন জায়গায় তোমাকে যে আমি যা ইচ্ছে তা-ই করে ফেলতে পারি, তুমি কি সেটা বোঝো?
—বুঝি।
—তাহলে করব?
—বিয়ের পর বিস্তর সময় পাবে, সুযোগ পাবে। তখন গলি টলি খুঁজতে হবে না। পুরো ঘরই তোমার থাকবে। সায়মা নির্লিপ্ত গলায় বলে যায়।
—থাক, এত সুযোগের কথা বলে লোভ দেখাতে হবে না। বিয়ের পর যে কেমন সুযোগ দেবে, সেটা আমার বোঝা হয়ে গেছে। দেখা যাবে সারাদিনেও একবার কাছে পাব না।
—দিনে কাছে পাওয়ার দরকার কী। রাতে পেলেই হয়।
—তাও পাব না। যে মেয়ে তার চাকরির খবরটা তার হবু স্বামীকে ফোনের মাধ্যমে দেয়, সশরীরে দেখা করার প্রয়োজন মনে করে না...
নাবিলকে এখানেই থামিয়ে দেয় সায়মা—ও, তাহলে এই কথা। সরাসরি দেখা করে খবরটা দিইনি বলে জনাবের এত অভিমান! সরি, আই অ্যাম রিয়েলি সরি। আমি আসলে বুঝতে পারিনি। এদিকে আমি কত কি নেগেটিভ চিন্তা করে বসে আছি। চলো, আজ আমি তোমাকে চায়নিজ খাওয়াব।
—ঘুষ দেওয়ার চেষ্টা করা হচ্ছে?
—আরে না। খুশি হয়ে খাওয়াতে চাচ্ছি।
—খুশি হয়েই যেহেতু খাওয়াচ্ছ, চায়নিজের বদলে অন্যকিছু খাওয়াও।
—কী?
—চায়নিজ যেমন ‘চ’ দিয়ে শুরু, আমি যা খেতে চাচ্ছি সেটাও ‘চ’ দিয়েই শুরু। আর ‘ম’ দিয়ে শেষ।
—আহা খাওয়াব তো, সবই খাওয়াব। আগে বিয়েটা তো হতে দাও। উফ! ছেলেটা এত খাই খাই করে!
এক সপ্তাহ পর। সায়মা নাবিলকে ফোন করে জানায় অফিসের কাজে তাকে জরুরি ভিত্তিতে গোলাপনগর যেতে হচ্ছে। নাবিল ডিটেইলইস জানতে চাইলে সে বলে—গোলাপনগরে একটা যৌনপল্লি আছে। সেখানে আগুন লেগেছে। আমাকে সেখানে যেতে হচ্ছে রিপোর্টিংয়ের জন্যে। একজন নতুন রিপোর্টারকে এত বড় দায়িত্ব দেওয়ার কথা না। তবু দিয়েছে, কারণ অফিস জানে আমার গ্রামের বাড়ি সেই এলাকায়ই। গোলাপনগর থেকে আমাদের বাড়িটা বেশি হলে পনের কিলো হবে।
—তাই বলে এত দূরে তুমি একা একা যাবে?
—এই বোকা, রিপোর্টাররা কি কোথাও একা যায়? সঙ্গে ক্যামেরাম্যানরা থাকে না? ড্রাইভার থাকে, আরো কত লোকজন থাকে।
—সেটা তো আমি জানি। কিন্তু কাছের লোক তো কেউ থাকে না।
নাবিল যা বলতে চাচ্ছে, সায়মার কাছে তা স্পষ্ট। সে তাকে আর ভণিতা করার সময় দেয় না—তুমি কি আমার সঙ্গে যেতে চাও? যদি যেতে চাও, যেতে পারো। তোমাকে নেওয়া যাবে। কারণ আমাদের গাড়িটা বেশ বড়। সবসময় এত বড় গাড়ি পাওয়া যায় না। স্যারের কাছ থেকে অনুমতি নিতে হলে আমি নেব।
তোমার যদি বিশেষ কোনো কাজ না থাকে, এখনই চলে আসো।
সায়মারা যখন গোলাপনগর গিয়ে পৌঁছায়, তখন সেখানকার যৌনপল্লি লোকে লোকারণ্য। পুড়ে ছাই হয়ে যাওয়া যৌনপল্লি দেখতে এসেছে তারা। রাস্তায় সারিবদ্ধভাবে রাখা হয়েছে আঠারটি লাশ। মোট নিহতের সংখ্যা পঁচিশ। সাতটি লাশ ইতোমধ্যে হস্তান্তর করা হয়ে গেছে। পুরো পরিস্থিতি নিয়ে সায়মা তাত্ক্ষণিকভাবে একটা লাইভ রিপোর্টিং করে। এরমধ্যে একে একে হস্তান্তর করা হয়ে যায় আরো সতেরটি লাশ। সন্ধ্যার পর সায়মারা যখন ঢাকার উদ্দেশে রওনা হবে, তখন একটি মাত্র লাশ বাকি আছে। তারা জানতে পেরেছে এটা একটা মহিলার লাশ। পুরো শরীর পুড়ে নিশ্চিহ্ন হয়ে গেছে। শুধু মাথা আর মুখটা অক্ষত আছে।
সায়মার চ্যানেল কর্তৃপক্ষ বীভত্স ছবি দেখানোর বিপক্ষে। সায়মা যখন জানল মহিলার মুখমণ্ডলটা অক্ষত আছে, সে ভাবল তাকে নিয়ে একটা রিপোর্টিং হতে পারে। সে লাশের মাথার কাছে মাইক্রোফোন নিয়ে দাঁড়িয়ে একজনকে বলে লাশের মুখের কাপড়টা সরাতে। কাপড় সরাতেই আকাশ বাতাস কাঁপিয়ে চিত্কার করে ওঠে সায়মা। তার হাত থেকে মাইক্রোফোন পড়ে যায়। আর সে শক্ত পিচে লুটিয়ে পড়ে জ্ঞান হারায়। তার কপাল কেটে রক্ত ঝরতে থাকে। তাকে নিয়ে যাওয়া হয় স্থানীয় হাসপাতালে। পেছনে কেউ কেউ বলতে থাকে—এইটা আবার কেমুন সাংবাদিক? লাশ দেইখ্যা ডরে চিক্কুইর মারে!
স্থানীয় হাসপাতালে সায়মার রক্ত ঝরা বন্ধ হয়। কিন্তু জ্ঞান ফেরে না। তাকে অ্যাম্বুলেন্সে করে ঢাকায় নিয়ে আসা হয়। পরদিন কিছুক্ষণের জন্যে একবার জ্ঞান ফিরলেও আবার সে অচেতন হয়ে পড়ে। এর একদিন পর যখন তার পুরোপুরি জ্ঞান ফেরে, তখন নাবিল তার পাশে বেডে বসা। সে শোয়া থেকে উঠেই বলতে থাকে—নাবিল, আমাকে গোলাপনগর নিয়ে চলো। আমি গোলাপনগর যাব। নাবিল তাকে জোর করে শুইয়ে দেয়—তোমাকে যেতে হবে না। এই নিউজ কাভার করার জন্যে চ্যানেল থেকে অন্য রিপোর্টার পাঠানো হয়েছে। তুমি রেস্ট নাও।
—তুমি আমাকে রেস্ট নিতে বলছ? জানো ওই মহিলা কে? আমার আপু।
সায়মার কথা শুনে নাবিলের মনে হয় কেউ বুঝি তাকে যৌনপল্লির আগুনের চেয়েও ভয়াবহ কোনো আগুনে ছুড়ে ফেলে দিয়েছে। সে বিপর্যস্ত গলায় বলে—কী বলছ তুমি?
—কী বলছি শুনতে পাওনি? ওইটা আমার আপুর লাশ।
নাবিল এবার যন্ত্রের মতো সায়মার হাত চেপে ধরে—প্লিজ, তুমি এই কথাটা আর একবারও উচ্চারণ করো না। যদি জানাজানি হয়ে যায় তোমার বোন যৌনকর্মী ছিল, দুনিয়া উল্টে গেলেও আমার পরিবার তোমার সঙ্গে আমার বিয়ে দেবে না।
কোনো অনুরোধেই যখন সায়মার মুখ বন্ধ হচ্ছিল না, তখন হঠাত্ করেই তার পা চেপে ধরে নাবিল। সায়মা তাকে কথা দেয়, তাদের সম্পর্কের খাতিরে সে বোনের পরিচয় প্রকাশ করবে না। তবে একটা শর্ত দেয়, তাকে গোলাপনগর নিয়ে যেতে হবে। বোনকে সমাধিস্থ করার আগে সে এক নজর দেখতে চায়। নাবিল কোনো উপায় না দেখে শর্তে রাজি হয় এবং সায়মাকে নিয়ে গোলাপনগর যায়। গিয়ে দেখে সায়মার বোনের লাশ বেওয়ারিশ লাশ হিসেবে দাফন করার সবরকম প্রস্তুতি সম্পন্ন করে ফেলা হয়েছে। সায়মাকে দেখে এগিয়ে আসে তার ছোটবেলার পরিচিত এক মহিলা—বইনের ওপর রাগ রাইখো না মা। তোমার বইন ইচ্ছা কইরা এই লাইনে আসে নাই। তার কপাল মন্দ। ফান্দে পা দিছিল। এছাড়া...
নাবিল মহিলার কাছ থেকে সায়মাকে টেনে নিয়ে আসে। তার কথায় নরম হয়ে সায়মা ‘আপু আপু’ বলে কেঁদে উঠলে মহাসর্বনাশ হয়ে যাবে। এদিকে বোনের লাশ কবরে নামানোর ঠিক আগের মুহূর্তে শেষবারের মতো মাইকে বলা হলো—লাশটি বেওয়ারিশ লাশ হিসেবে দাফন করা হচ্ছে। তবু এখনো যদি কেউ এই লাশের দাবি করেন, করতে পারেন। আছেন কোনো দাবিদার?
নাবিল দুহাত দিয়ে চেপে ধরে রাখে সায়মার মুখ। মাইকে তখনও ঘোষণা করা হচ্ছে—আছেন কোনো দাবিদার? এবার এক ঝটকায় মুখ থেকে নাবিলের হাত সরিয়ে দেয় সায়মা। আর গলা ফাটিয়ে বলতে থাকে—আমি আছি। আমি তার ছোটবোন।
এক মাস পর। নাবিলের নাম্বার থেকে সায়মার ফোনে একটা এসএমএস আসে—‘আজ আমার বিয়ে। মা-বাবার পছন্দের পাত্রীকে বিয়ে করছি। দোয়া করো।’
