বাঙালির ধর্মচিন্তা গ্রন্থটি জনাব মোহাম্মদ আবদুল হাই কর্তৃক সংকলিত ও সম্পাদিত হয়ে এবারকার বইমেলা উপলক্ষে প্রকাশিত হয়েছে সূচীপত্র প্রকাশনা থেকে। এতে ১০১ পৃষ্ঠার ভূমিকা সম্বলিত ৪টি অধ্যায়ে ৫৩টি নিবন্ধ সংকলন করা হয়েছে। গুণী-জ্ঞানী ব্যক্তিদের নিবন্ধগুলোর রচনাকাল ঊনবিংশ থেকে আধুনিককাল পর্যন্ত ব্যাপ্ত।
গ্রন্থটিকে প্রাথমিকভাবে দু’ভাগে ভাগ করা যায়—প্রথমত বিশালাকার এক ভূমিকা যা একটি গ্রন্থের সমতুল্য। এই ভূমিকাতেই লেখক মানুষের উত্পত্তি, ধর্মের উত্পত্তি ও ক্রমবিকাশ সম্পর্কে পণ্ডিতদের অভিমত বিস্তারিত লিপিবদ্ধ করেছেন। বাঙালির ৪টি ধর্মমত সম্পর্কে মূল বিষয়গুলো আলোচনা করেছেন। এরপর লেখক ধর্ম ও বিজ্ঞান, ধর্ম ও দর্শন, ধর্ম ও সংস্কৃতি এবং ধর্ম ও রাজনীতি সম্পর্কে বিভিন্ন আঙ্গিকে ধর্মের সংশ্লিষ্টতা ব্যাখ্যা করেছেন। ধর্মের ভূমিকা নিয়ে প্রাচীন ও আধুনিক লেখক, ঔপন্যাসিক, সংস্কারক, কবি, সাহিত্যিক ও দার্শনিকবৃন্দের অভিমত এবং তাদের চিন্তা-চেতনার কথা আলোচনা করেছেন। সর্বোপরি, বর্তমানকার ধর্মনিরপেক্ষতা নিয়েও লেখক এখানে ব্যাখ্যা-অপব্যাখ্যা তুলে ধরার চেষ্টা করেছেন। ধর্মনিরপেক্ষতার উদ্ভব ১৭৭৯ খ্রিস্টাব্দে ফরাসি বিপ্লবের পর বলে তিনি উল্লেখ করেছেন (ভূমিকা পৃ: ৪১)। ধর্মনিরপেক্ষতা বলতে যদি কোনো রাষ্ট্র সংখ্যাগুরুর ধর্মের প্রতি আনুগত্য ও অন্যান্য ধর্মের প্রতি সহনশীলতাকে বোঝায় তাহলে এই ধর্মনিরপেক্ষতার সূচনা হয় এই ভারতবর্ষে খ্রিস্ট জন্মের প্রায় ২৫০ বছর পূর্বে সম্রাট অশোকের শাসনামলে। সম্রাট অশোক নিজে বৌদ্ধধর্ম গ্রহণ করেছিলেন সত্য, কিন্তু তিনি বৌদ্ধধর্মকে রাষ্ট্রধর্ম করেননি। বিশেষ কোনো ধর্মের প্রতি পক্ষপাতিত্ব না করে তিনি সকল ধর্মের সুখ-সুবিধা দেখার জন্য ধর্মমহামাত্র নামক রাজকর্মচারী নিয়োগ করেন। বৌদ্ধ ধর্মের প্রবল প্রতিপক্ষ আজীবকদের তিনি খলাতিক গুহাটি দান করেন। কাজেই পৃথিবীতে ধর্মনিরপেক্ষতার বীজটি বপন করেছিলেন মহামতি সম্রাট অশোক, অন্য কেউ নয়।
লেখক ধর্ম ও রাজনীতি বিষয়ে বিশদ আলোচনা করেছেন। ধর্মভিত্তিক রাজনীতি আর হীনস্বার্থ হাসিলের উদ্দেশ্যে রাজনীতিতে ধর্মের অপব্যবহারের কথাও বলা হয়েছে।
গ্রন্থের ভূমিকার শেষের দিকে এ উপমহাদেশের প্রখ্যাত লেখক ঔপন্যাসিক, কবি সাহিত্যিকদের ধর্মচিন্তার বিষয়েও গ্রন্থকার আলোকপাত করেছেন।
ড. আহমদ শরীফ তাঁর প্রবন্ধে লিখেছেন, ‘ধর্মীয় মতবিরোধে ও অসহিষ্ণুতায় এবং স্বশাস্ত্রীয় মতগত কোন্দলে আজ পর্যন্ত পৃথিবীতে যত রক্তপাত হয়েছে, মানুষে মানুষে যত দ্বেষ দ্বন্দ্ব সংঘর্ষ টিকিয়ে রেখেছে, যত প্রাণহানি ঘটেছে, এমনটি কোনো ঝড় বন্যায়, ভূমিকম্প মহামারীতে কিংবা সামাজিক যুদ্ধেও সম্ভব হয়নি।’
এখনো যেহেতু ধর্ম মানুষের ব্যক্তিগত ও সমাজ জীবনের মৌল সমস্যায় সংকটে ভূমিকা রাখে সেজন্য আগামী পৃথিবীতেও মানুষের কাছে এর প্রয়োজন থাকবে।
এই বিশাল গ্রন্থের মূল অংশটি আরম্ভ হয়েছে বিভিন্ন প্রখ্যাত লেখকদের নির্বাচিত নিবন্ধ নিয়ে। চারটি অধ্যায়ে বিভিন্ন শিরোনামে এ গ্রন্থে ৫৩টি প্রবন্ধ স্থান পেয়েছে। সংকলক ভূমিকাতে হিন্দু, বৌদ্ধ, খ্রিস্টান ও ইসলাম—এ চারটি ধর্মের মূল বিষয় নিয়ে আলোচনা করেছেন। প্রবন্ধগুলো থেকে ধর্মভিত্তিক লেখাগুলো বাছাই করলে দেখা যায়—হিন্দুধর্ম নিয়ে ৫টি, ইসলাম ধর্ম নিয়ে ৩টি, খ্রিস্ট ধর্ম নিয়ে ১টি এবং বৌদ্ধ ধর্ম নিয়ে কোনো নিবন্ধ সংকলন করা হয়নি। বিশেষ ধর্ম সম্পর্কিত নিবন্ধের তুলনায় ধর্ম নিয়ে বিভিন্ন লেখকের নিবন্ধের সংখ্যা অনেক বেশি। নিবন্ধগুলোকে সংকলক ৪টি শিরোনামে ভাগ করেছেন যেমন—ধর্মের উত্স সন্ধানী অভিমতে ১০টি নিবন্ধ, ধর্ম মানস লোক ও চেতন লোক-এ ২০টি, যুক্তিবাদীদের দৃষ্টিতে ধর্ম ১১টি এবং ধর্ম ও রাজনীতি বিষয়ে ১২টি নিবন্ধ নির্বাচন করা হয়েছে। এতে মনে হয় নির্দিষ্ট কয়েকটি ধর্মীয় আলোচনার চেয়ে সংকলক ধর্মের বিভিন্ন দিক নিয়ে আলোচনা-সমালোচনা মূলক নিবন্ধগুলোকে গুরুত্ব দিয়েছেন। তার ফলে গ্রন্থের ভূমিকা অংশে কিছু কিছু বিষয় নিয়ে যা আলোচনা হয়েছে—যেমন ধর্ম ও সংস্কৃতি, ধর্মনিরপেক্ষতা ইত্যাদি সংক্রান্ত নিবন্ধগুলো পুনরায় মূল অংশে দেখা যায়। এতে বিষয়ের পুনরাবৃত্তি লক্ষণীয় এবং গ্রন্থের কলেবর স্ফীত হয়। নিবন্ধগুলো নির্বাচনে কোনো নীতিমালা অনুসরণ করা হয়েছে কিনা সংকলক তা উল্লেখ করেননি।
এ গ্রন্থের কোনোখানে লেখক বা সংকলক পৃথিবীর তাবত্ ধর্ম সম্পর্কে কোনো কথা বলেননি। পৃথিবীর তাবত্ ধর্মের সংখ্যা ৯০টি। অনুসারীর সংখ্যা অনুযায়ী মূল ধর্মের সংখ্যা হচ্ছে ১০টি। আফ্রিকা মহাদেশে অনুসৃত ধর্মসংখ্যা ১৮টি, আমেরিকায় রেড ইন্ডিয়ানদের ধর্মসংখ্যা ১৪টি, ভারতে প্রাক বৈদিক ও অবৈদিক ধর্ম ০৮টি, প্রাচীন সভ্যতার ধর্মসংখ্যা ১৯টি এবং আদিবাসী ও অন্যান্য স্থানীয় ধর্মসংখ্যা ২১টি। এভাবে পৃথিবীতে সর্বমোট ৯০টি ধর্ম ছিল, তন্মধ্যে প্রাচীন সভ্যতার ধর্ম, আদিবাসী ও স্থানীয়দের অনেক ধর্ম প্রাচীন ভাষার ন্যায় অবলুপ্ত হয়ে গেছে। অন্যদিকে আবার শিক্ষার হার বৃদ্ধির সাথে সাথে ধর্মের ব্যবহারও ব্যাপকভাবে হ্রাস পাচ্ছে। এ বিষয়ে বিচ্ছিন্নভাবে গবেষণা হলেও সঠিকভাবে কোনো গবেষণা হয়নি বিধায় সুনির্দিষ্টভাবে কিছু বলা যাচ্ছে না। তবে যেহেতু সংকলক ও সম্পাদক গ্রন্থটি বাঙালির ধর্মচিন্তার মধ্যে সীমাবদ্ধ রেখেছেন, তাই অন্যান্য বিষয় সংযুক্ত করার প্রয়োজন নেই।
সংকলিত নিবন্ধগুলো এত বিখ্যাত লেখকদের, তা নিয়ে আলোচনা করার মতো দক্ষতা আমার মতো অজ্ঞ লোকের নেই। তাছাড়া গ্রন্থের কিছু নিবন্ধের আলোচনা করা এ পরিসরে আদৌ সম্ভবও নয়। মূল অংশের নিবন্ধগুলো সবই কালোত্তীর্ণ ও গুরুত্বপূর্ণ। বিজ্ঞ সংকলক নিপুণ মালাকারের ন্যায় অত্যন্ত দক্ষতা ও বিজ্ঞতার সাথে নিবন্ধগুলো বাছাই করে সংযোজিত করায় তাকে কৃতজ্ঞতা ও ধন্যবাদ জানাচ্ছি। প্রকাশক সূচীপত্রকে এরকম একটি দুর্লভ ও সাহসী প্রকাশনার জন্য অশেষ ধন্যবাদ জানাচ্ছি। তাদের এ সাহসী প্রচেষ্টার ফলে আমরা পাঠকেরা প্রখ্যাত ব্যক্তিদের ধর্ম সংক্রান্ত নিবন্ধগুলো একসাথে এক জায়গায় পাচ্ছি। বাংলা ভাষায় বাঙালির ধর্মচিন্তা গ্রন্থটি একটি বিরল গ্রন্থ যা একটি কোষগ্রন্থের পর্যায়ে পড়ে। এটি আমাদের নতুন চিন্তার খোরাক জোগাবে এবং বিশেষ করে ধর্মবিমুখ তরুণ প্রজন্মকে ধর্ম সাহিত্যের দিকে আকৃষ্ট করবে বলে আশা করি।
বাঙালির ধর্মচিন্তা
সংকলন ও সম্পাদনা
মোহাম্মদ আবদুল হাই
প্রচ্ছদ :নিয়াজ চৌধুরী তুলি
প্রকাশক :সূচীপত্র
মূল্য :৯৯৫ টাকা।
