‘নিচু ক্লাশে থাকে রোদ নিচু নিচু অনুরোধ
নেই ব্যাকরণের ভয়—ভাষার মৌন বুদবুদ...’
ওপরের দুটি লাইন কবি মাসুদ পথিকের ‘একাকী’ জমিন কবিতার বইয়ের প্রথম ফ্ল্যাপে লেখা রয়েছে। পড়তেই মনের ভেতরে তৈরি হয় নতুন এক ভাবনা। এই ভাবনার নাম—কবিতা।
কবিতার ভাব আর রস যখন একজন কবিকে জারণ করে, আর কবি জারিত হন সেই রসে তখন তৈরি হয় কবিতা। ভাষা আর দৃশ্যের সঠিক বিন্যাসে কবি আঁকেন এক নতুন কাব্যকলা। চিত্রের এই যোগাযোগ যখন আবার পাঠকের সাথে ঘটে তখন কবির চিন্তার যে ব্যাপ্তি তা পাঠকের মধ্যেও বিস্তৃতি লাভ করে। এভাবেই কবি হয়ে ওঠেন সমকাল আর স্বকাল দমিয়ে নন্দিত এক স্রষ্টা। আলোচ্য মাসুদ পথিক ‘একাকী জমিন’-এর সেইরকম একজন স্রষ্টা বা ওই কলাকৈবল্যের চিত্রবর্ণনার কবির স্বীকৃতির দাবিদার। চিরসবুজ নরসিংদীর রায়পুরায় বেড়ে ওঠা কৈশোর আর যৌবনের দৃশ্য ভাগে ভাগে কবিতার বই ‘একাকী জমিন’-এ নানান রূপে নানান মাত্রায় তুলে এনেছেন। আর তাই কবির এই বইয়ের কবিতায় কখনো মনে হয়েছে—অস্তিত্ববাদী কাব্য চেতনার সংমিশ্রণ, সংমিশ্রণ বলছি এ কারণে যে, কবিতাগুলো আজকের হিসেবের গণ্ডিতে চেপে রাখা পুরাতন ও বর্তমান ভাবধারা মিলে যা হয়েছে তা-ই তুলে ধরতে চেষ্টা করেছেন কবি। ভালো-মন্দ বিচারের ভার তুলে দিয়েছেন পাঠকের পাঠ দৃষ্টিতে। একটি গ্রন্থের গুটিকয়েক কবিতার মধ্যে অস্তিত্ব ও অনস্তিত্ব বা মূর্ত-বিমূর্ত ভাব চেতনা ফুটিয়ে তোলা দুরূহ, তেমনি অনুধাবন ও বিচার করা কঠিন। তবে কবিতার মায়াজালে কবির ভাব ও ভাষা বিশ্বাসের দ্যুতি প্রকাশ করে থাকে। তাতে কবির আত্মজাত চেতনালোক পাঠকের মনন মানসের বৈকুণ্ঠলোকে ধরা দেয়। তাই শুরু থেকেই ‘একাকী জমিন’ পাঠ করার সময় বারবার মনে হয়েছে যেন এক ধুন্ধুমার কবিতার জগতে প্রবেশ করেছি। কখনো মাটিতে, কখনো শহরে, কখনো গ্রামের সবুজ প্রকৃতিতে, কখনো জলজ প্রেম, কখনো আকাশী বাতায়নে আবার কখনো নির্বিবাদী গ্রামীণ মানুষের গল্প তুলে ধরেছেন; কোথাও কোথাও এর মধ্যে সংযোগ ঘটেছে সেলুলয়েডে উঠে আসা জীবনপাঠ। তাই বোধহয় কয়েকবার পড়তে হবে পাঠকের এই বইখানি। একবার পাঠে এই বইয়ের মর্মকথা বা সুর বোঝা সম্ভব নয়।
জীবনযাপনের দিনলিপি আজকের একুশ শতকের মানুষের যেমন বদলে গেছে তেমনি বদলে গেছে মানুষের মানসিক গোলার্ধও। যে ভুবনে একদা বাস করত সবুজ বনানীর কোলাহলপূর্ণ পাখির গান আর নদীর বয়ে চলার শব্দ তা আর এখন নেই। নেই মানুষের মনের সেই ভালোবাসা ভালো লাগার ধ্যান। আশ্চর্য! এইসব সঙ্কট কী এক অদৃশ্য শক্তিতে মাসুদ পথিকের কবিতায় এসে ধরা দিয়েছে। প্রত্যেক কবি তার নিজস্ব মেধা-মনন দিয়ে যা লেখেন তাকে তার-ই সৃষ্টি হিসেবে গ্রাহ্য করি আমরা। কিন্তু সেই পাঠকগ্রাহ্য সৃষ্টি যদি সত্যিকারের মনে রাখার মতো সৃষ্টি না হয় তবে কি মনে রাখবে কেউ? আমার ধারণা কালের কৃষ্ণগহ্বরে হারাবে সেই অপাঠ্য সৃষ্টি। আর মনে রাখে পাঠক সেই লেখা বা সৃষ্টিকে যা কেবল আলাদা নয়, চিন্তাতেও জাজ্বল্য যার গতি সময়ের বিপরীতে। একসময়ে প্রতিষ্ঠান বিরোধিতার লড়াইয়ে একাত্মতা ঘোষণা করেছিলেন। লিখতেন সেই স্বপ্ন কুড়োবার সময় থেকে। ধানক্ষেতের আল ধরে হাঁটতে হাঁটতে দাদাজির মাছ ধরার নৌকায় লাফ দিয়ে উঠে সেই কিশোর মাসুদ পথিক তার কবিতায় যেন—কোনো কবিতা লেখেননি, লিখেছেন মানুষের কথা, মাটির কথা; আর তাই তো একাকী জমিন বইয়ের অধিকাংশ কবিতার মধ্যে অনুষঙ্গ হিসেবে উঠে এসেছে নানান চিত্র—ফুল, পাখি, মাছ, ঢেঁকি, ধান, ঠা ঠা রোদ, নারীর শরীর-সৌন্দর্য, ফসলের মাঠ আর মুক্তিমুখিন মানুষের কথা। এ যেন সেই কৌম সমাজের গল্প যেখানে মা-বাবা শরীরে শরীর মেলায় আর চাঁদ-তারাদের আকাশে জোসনার রূপ ঝরে পড়ে তাজা ফুলের মতোন।
মাসুদ পথিক একাকী জমিন কবিতায় লিখেছেন—‘হরিপদদের ছোটবোন মায়ারানী, বন্ধুরা কয় এইডা জাত ময়নাপাখি/ আমি একটি পথ দিয়ে আসাচলা করি, শুধু একটা পথ দিয়া চলি/ মায়া প্রথম যৌবনের ঝলক দেখিয়ে দেখিয়ে চলে যায় আঙিনার ভেতর/ ভেতর ঘরে ঢুকতে পারি না, বাহির বাহির আমি, ঘুরি ঘুরি ঘুরি/ গোপনে মায়ার গাছ থেকে থেকে জবাফুল ছিঁড়ে আনি/ আমার আঙিনায় জবাগাছ বুনি, রাতদিন জল ঢালি গোড়ায়/ কোনো বিকালে রাস্তা থেকে দেখি ঢেঁকিতে ধানভানে মায়া ও তার মা/ বুকের ওঠানামা আর দুলুনি তালে জেগে ওঠে গা আর গাঁ...।’ (একাকী জমিন, পৃষ্ঠা-১৮)
এক কিশোর-কিশোরীর প্রথম যৌবনের একটি গল্প যেন এখানে বাস্তবে দেখছিলাম, দেখছিলাম প্রিয় শালিখ তাড়ানোর দিন আর সবুজ প্রকৃতি। আবার কোথাও কোথাও মনে হলো যেন একটা সেলুলয়েডের রিলের পর রিল খুলছে আর পাঠক আমি দেখছি একটি চলচ্চিত্র। হতে পারে মাসুদ পথিক একজন তরুণ চলচ্চিত্রকার তাই এই কবিজীবন ও চলচ্চিত্র একসুতোয় বাঁধবার প্রয়াস ছিল।
আবার আর একটি কবিতায় মাসুদ বলেন—‘তারাদের মধ্যবর্তী স্থানে এক গ্রাম/ বুঝি সন্তানের মতো অভিমানে কাঁদে/ আমার ভেতর সেই সুর বাজে বারবার/ বজে র মতো সেই প্রাকৃত শব্দ লুকানো যায় না;’ (তারাদের গ্রাম, পৃষ্ঠা-৩৬)
গ্রাম কাঁদে মধ্যবর্তী এক গ্রাম। আসলেই কি গ্রাম কাঁদে? হ্যাঁ কাঁদে হয়তো আমরা সাধারণ মানুষেরা দেখতে পাই না, বুঝতে পারি না। যেমন প্রিয় কোনো প্রাণী মারা গেলে কেঁদে ফেলি তেমনই কবির প্রিয় এই তারা আর তার অদ্ভুত দ্যোতনায় যা ভেসে ওঠে তা-ই লিখে দেন কবিতায়।
মাসুদ পথিকের লেখা এই একাকী জমিন কাব্যগ্রন্থে ৫৬টি কবিতার সবক’টি কবিতার মধ্যে রয়েছে ভিন্ন ভিন্ন আলো ফেলে দেখার দৃঢ় প্রত্যয়। ভালোবাসার এই যে শর্তহীন ব্যাকুলতা কবিতার কণ্টকিত পথে এনেছে মাসুদ পথিককে তা তার নিজস্ব স্বভাব থেকেই বোঝা যায়। আর তাই হয়তো এই বইটিই এবার পেয়ে গেল গ্রামীণ পটভূমির স্বীকৃতিস্বরূপ কালি ও কলম পুরস্কার।
ফলে, আমার মনে হয়েছে অনুসন্ধিত্সু পাঠককে কাছে টানবার কোনো কোনো অনুষঙ্গ মায়াবী দ্যোতনা আর দক্ষতায় মাসুদ পথিক তুলে ধরেছেন একাকী জমিন কাব্যগ্রন্থে। কারণ, একাকী জমিন কেবল একটি কবিতার বই নয়, একটি জীবনযাপনের দিনলিপি।
একাকি জমিন
মাসুদ পথিক
প্রচ্ছদ :চারু পিন্টু
প্রকাশক :রোদেলা প্রকাশনী
প্রকাশকাল :একুশে বইমেলা ২০১৩
দাম :১৫০ টাকা
