কবি হওয়ার প্রধান শর্তই হলো, তিনি যে ভাষার কবি সেই ভাষার প্রচলিত ছন্দ সম্পর্কে তাকে পরিষ্কার ধারণা রাখতে হবে। তিনি গদ্যে-পদ্যে যেকোনো পদ্ধতিতে কবিতার কাজ করলেও ছন্দ সম্পর্কে তার পূর্ণ ধারণা থাকতে হবে। জানতে হবে উপমা কী? অনুপ্রাস কিভাবে পঙিক্তর মধ্যে বয়ন করে অন্ত্যমিলে পৌঁছতে হয়। ভাষার সম্ভবপর মিল তার মনে এবং মস্তিষ্কে প্রতিনিয়ত গুঞ্জরিত হলেই কেবল অলঙ্কার শাস্ত্র কাউকে কবিত্বের অদৃশ্য মুকুট পরিয়ে দেয়।
উপমা হলো বিশ্বাসযোগ্য প্রতিতুলনা মাত্র। কে না জানে ‘পাখির নীড়ের মতো’ চোখ হয় না। কিন্তু কবি যখন এ উপমাটি ব্যবহার করেন তখন তা পাঠকের মন একটা মায়াময় বিশ্বাসযোগ্য উপমা বলে তর্কাতীতভাবে স্বীকৃতি দেয়।
ছন্দ হলো সমান মাত্রায় ভাষার বহমানতা। আর মিল হলো বাক্যের শেষপ্রান্তে এসে তাল রক্ষা করা। কবি কখনো গুনে কাজ করেন না। কিন্তু তার চোখ এবং মস্তিষ্কে সর্বোপরি হূদয়ে একটি গণনার সচকিত স্বভাব সতর্ক অবস্থায় থাকে।
কবিতার ভাষা সবসময় মাত্রা অঙ্কবাহিত নিয়মে চলে। এ নিয়মের ধারা ব্যাহত হলেই ছন্দপতন ঘটে। আর যে কবির ছন্দে ত্রুটি ধরা পড়ে যায় তাকে পাঠক বা সমালোচক কেউই সহ্য করে না।
কবিকে সবসময় উপমার ব্যাপারে সচেতন বা সতর্ক থাকতে হয়। তবে কেউ যদি বলেন তার প্রেয়সীর মুখ চাঁদের মতো তাহলে আমাদের উপমা প্রচলিত হাজার হাজার বছরের ধারণার মধ্যে তিনি কাজ করছেন বলে মনে হবে। কিন্তু কেউ যদি বলে, ‘আমার প্রেয়সীর মুখ নতুন চরের মতো’ (জসীম উদ্দীন) তাহলে সহস্র বছরের উপমার শৃঙ্খলা ভেঙে পড়বে এবং শুরু হবে নতুন দুঃসাহসিক কবিত্ব শক্তির বৈপ্লবিক উত্থান। যেমন : ‘পূর্ণিমার চাঁদ যেন ঝলসানো রুটি’ (সুকান্ত)।
কবিতা নিয়ে এত কথা বলার কারণ একটাই—তা হচ্ছে শাহীন রেজা ।
তিনি মূলত প্রেমের কবি। তা সত্ত্বেও শাহীনের কবিতায় যে নিগর্সচিত্র পরস্ফুিট হয় সেটা মনোমুগ্ধকর। আগ্রহ সৃষ্টি করে এমন কবি-তারুণ্য সময়ে না খুঁজলে সহজে আবিষ্কার করা যায় না। তার কবিতা আমার ভালো লাগে। প্রতিভাবান মানুষ সচরাচর অনেক দেখা যায়, কিন্তু এর মধ্যে কবিত্ব শক্তির অধিকারী মানুষ কদাচিত্ দৃষ্টিগোচর হয়। শাহীন রেজাকে আমার তেমনটি বলেই মনে হয়। তার লেখা আমাকে স্পর্শ করে।
শাহীন রেজার অনেক কবিতায় আমি মুগ্ধ হয়েছি—আনন্দিত হয়েছি—পুলকিত হয়েছি। ভালোলাগা যাকে বলে সেটা একটা অনুভবের বিষয়। আমি সারাজীবন পড়তে পড়তে এসেছি। আয়ু ঝরিয়ে ঝরিয়ে গড়িয়ে পড়েছি এই দেশে। এই মাটিকে আমি মাতৃতুল্য গড়িয়সী মনে করি। আমার কবিতায় এই মায়ের গন্ধ আছে—শাহীন রেজার কবিতাতেও সেই মাকে আমি শনাক্ত করেছি। একজন তরুণ কবির জন্য এটা কম কথা নয়। শাহীন রেজার কবিতা আমার মনে হঠাত্ হঠাত্ বিদ্যুতের ঝলকানি এনে দিয়েছে। কবিদের কাজ এ রকমই হয়। কখনো নেশা ধরিয়ে দেয়—কখনো আশা জাগিয়ে তোলে আবার কখনো ভাষার বিবৃতিতে বিষণ্ন হয়। শাহীন এক্ষেত্রে সফল তা বলাই চলে। আমার একান্তজন হিসেবে বলছি না। কবিতায় তার চাষবাস যে নিরলস তা আমি দীর্ঘদিন ধরে দূর থেকে প্রত্যক্ষ করেছি। তিনি সর্বদা কবিতা সৃষ্টির প্রেরণায় উদ্বুদ্ধ ছিলেন। তার কবিতা সহজ-সাবলীল গতিসম্পন্ন। তিনি শব্দে-গন্ধে পাঠককে মোহাবিষ্ট করে রাখতে পারেন।
তার একটি কবিতায় আছে এ রকমই একটি পঙিক্ত—‘দাঁড়াও মধ্যরাত/ কুয়াশার ছায়াপথে বাতাসেরা/ অবিরাম নদীর চেরাগ’
মধ্যরাতকে থামিয়ে দেবার ক্ষমতা সে তো একজন কবিই রাখেন। নদীর চেরাগ আবিষ্কার করার ক্ষমতা তাও তো একজন কবিরই দক্ষতা।
শাহীন আমাকে নিয়ে এবং আমার স্ত্রীকে নিয়ে কবিতা রচনা করেছেন। তার ‘সত্যনগর’ কবিতাটি—যেটি আমাকে নিয়ে লেখা তা যে একটি অতিউত্কৃষ্ট কবিতা—তা বলতে আমার কোনো দ্বিধা নেই। করতলে প্রভাত আঁকার যে অদম্য স্পৃহা তিনি এই কবিতাটিতে ব্যক্ত করেছেন তা তার আপন কবি স্বভাবেরই বহিঃপ্রকাশ বলে আমি মনে করি।
আমি বাংলা ভাষার একজন নিগূঢ় পাঠক। শাহীনের কবিত্ব শক্তি আমার মতো একজন প্রবীণ প্রায়ান্ধ কবিকে যে ছুঁয়ে গেছে এটাকেই আমি অনেক বড় একটি বিষয় বলে মনে করি। এবং এর কৃতিত্ব যে শাহীন রেজার তা স্বীকার করতেও আমার কোনো কুণ্ঠা নেই। আমি বিশ্বাস করি, শাহীন রেজা তার কবিতা দিয়ে আমার মতো বিদগ্ধ পাঠককে যেভাবে মুগ্ধ করেছেন সেভাবে বাংলা ভাষার অগণিত পাঠককেও মুগ্ধ করবেন।
আমি চিরকাল বলে এসেছি—কবিতা কষ্টের কলা। একে আয়ত্তে আনতে কষ্টমালা পরে কষ্টের সমুদ্রে ঝাঁপ দিতে হয়। শাহীন রেজার মধ্যে আমি সে প্রচেষ্টা ও প্রস্তুতি লক্ষ করেছি। যদি একাগ্রভাবে তিনি সেই কষ্টকলায় প্রবিষ্ট হতে পারেন তবে তার সাফল্য অবশ্যম্ভাবী।
শাহীন সত্যনিষ্ঠ এবং একান্ত অর্থেই বিধাতা আশ্রয়ী। তাই তার কবিতা পঠনের পাশাপাশি কখনো কখনো আত্মস্থের বিষয় হয়েও দাঁড়ায়। একজন কবির জন্যে এটি একটি অনেক বৃহত্ বিষয়।
শাহীন রেজা একটি কবিতায় উল্লেখ করেছেন, ‘আমকে ফিরিয়ে দাও আমার বিবেক’। বিবেক ছাড়া কোনো মানুষই অগ্রসর হতে পারেন না, একজন কবি তো ননই। বিবেকের জন্য শাহীন রেজার এই আর্তিকে আমি তার কবি স্বভাবেরই একটি অংশ বলে শনাক্ত করব। এটি কবিতারই একটি অঙ্কবাহিত হিসাব মাত্র ।
আমার ৬০তম জন্মদিনে শাহীন নজরুল ইন্সটিটিউটে একটি বড় ধরনের আয়োজন করেছিলেন। সেখানে উপস্থিত ছিলেন তত্কালীন সরকারের দুজন মন্ত্রীসহ অসংখ্য কবি এবং কবিতানুরাগীগণ। অনেক রাত অব্দি চলা সেই অনুষ্ঠানে নিবেদিত কবিতা পাঠ করেছিলেন প্রায় শতাধিক কবি। এ পড়ন্ত বয়সে অনেক স্মৃতি হারিয়ে গেলেও সেদিনের সেই সুখস্মৃতিটা এখনো আমার মানসপটে উজ্জ্বল হয়ে আছে। শাহীনের এ কর্মটিকে আমি আমার প্রতি তার ভালোবাসার একান্ত কর্ম হিসেবে স্বীকৃতি দিতে নারাজ। আমি মনে করি, শাহীন কবিতাকে ভালোবাসেন আর ভালোবাসেন বলেই আমার মতো একজন কবির জন্মদিন পালনের মধ্য দিয়ে কবিতার প্রতি তার হূদয় নির্দেশিত দায়িত্ব পালন করেছেন মাত্র।
কবি শাহীন রেজা ইতোমধ্যেই জীবনের ৫১টি বসন্ত পার করে এসেছেন। একজন কবির জন্য এ অনেক দীর্ঘ সময়। আমার দৃষ্টিতে তিনি তরুণ হলেও কবিতার কর্ষভূমিতে তার বিচরণ মোটামুটি দীর্ঘ।
যদিও একজন কবিকে পুরোপুরিভাবে শনাক্ত করার জন্য এ সময় যথার্থ নয়। আমি প্রার্থনা করি তার কাব্যাকাশ আলোয় আলোকিত হয়ে উঠুক এবং জীবনের বাকিটা সময় যেন তিনি পুরোপুরিভাবে কবিতা এবাদতে মশগুল থাকতে পারেন।
