বিএনপি চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়া বলেছেন, খুন, গুম ও অপহরণে জড়িত হয়ে র্যাব কলঙ্কিত হয়েছে। এটা মেনে নেয়া যায় না। এর দায় সরকারের। এই দায় মেনে সরকারকে র্যাব বিলুপ্ত করতে হবে। বেগম জিয়া খুন, গুম ও অপহরণের তদন্তের জন্য সাবেক বিচারপতি, আইনজীবী, সাংবাদিক, মানবাধিকার কর্মীর সমন্বয়ে তদন্ত কমিশন গঠনের দাবি জানান।
পুলিশের বাধার মুখে রাজধানীর ইঞ্জিনিয়ার্স ইনস্টিটিউশন মিলনায়তনে গতকাল বৃহস্পতিবার বিকালে সমাবেশ স্থগিত হয়ে যাওয়ার পর সন্ধ্যায় বিএনপি চেয়ারপারসনের কার্যালয়ে অনুষ্ঠিত এক জমায়েতে তিনি এসব দাবি জানান।
খালেদা জিয়া বলেন, জঙ্গিবাদ ও দেশের মানুষের সুরক্ষার জন্য আমরাই র্যাব সৃষ্টি করেছিলাম। এর ফলে দেশে শান্তি ফিরে এসেছিল। র্যাবকে আমরা কখনো রাজনৈতিকভাবে ব্যবহার করি নাই। র্যাবের সম্মানও ছিল অটুট। কিন্তু বর্তমান সরকার এই এলিট ফোর্সকে অপব্যবহার করছে। অনৈতিক ও বেআইনি কাজে তাদেরকে ব্যবহার করছে। সরকারের নির্দেশে এ ধরনের কার্যক্রমে অংশ নেয়ায় র্যাবের কিছু সদস্য উচ্ছৃঙ্খল হয়ে গেছে। তাই আমরা র্যাব সৃষ্টি করলেও তাদের বিলুপ্তির আহ্বান করেছি।
তিনি বলেন, বিরোধীদলের নেতা-কর্মীদের ওপর উত্পীড়নের পাশাপাশি এখন সাধারণ মানুষ, ব্যবসায়ী এমনকি মানবাধিকার কর্মীরা পর্যন্ত বিপন্ন হয়ে পড়েছেন। এই দুঃসহ পরিস্থিতিতে শুধু ঢাকা মহানগরীতে গত কয়েক মাসে বলপূর্বক নিখোঁজ হয়ে যাওয়া তরুণদের স্বজনদেরকে আজ আমরা আপনাদের সামনে হাজির করেছি। এর সঙ্গে বহুল আলোচিত বিএনপি নেতা ইলিয়াস আলী, চৌধুরী আলম ও ছাত্রদল নেতা দিনারের পরিবারের সদস্যদেরকেও আপনারা দেখছেন। এটা বিগত পাঁচ বছরের এবং সারা দেশের বলপূর্বক উধাও করে দেয়া নাগরিকদের এক খণ্ডিত চিত্র মাত্র। পাঁচ বছরে সারা দেশে শত শত নাগরিককে এভাবেই বলপূর্বক ধরে নিয়ে গিয়ে উধাও করে দেয়া হয়েছে।
বেগম জিয়া বলেন, ক’দিন আগে নারায়ণগঞ্জে সিটি কর্পোরেশনের একজন কাউন্সিলর ও একজন আইনজীবীসহ সাতজনকে অপহরণ করে হত্যা এবং দেখে ফেলায় আরো চারজনকে খুন করার নৃশংস ঘটনা ঘটেছে। আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন পরিবেশ আন্দোলনকর্মী সৈয়দ রিজওয়ানা হাসানের স্বামীকে অপহরণ ও রহস্যজনক মুক্তির ঘটনায় সৃষ্ট আতংকের রেশ মানুষের মন থেকে এখনো দূর হয়নি। কিন্তু এই পৈশাচিকতার অবসান ঘটছে না। এখনো অপহরণ, বিচার-বহির্ভূত হত্যা, বলপূর্বক নিখোঁজ করার ঘটনা পুরোদমে চলছে। এর মধ্যেই ফেনীতে একজন উপজেলা চেয়ারম্যানকে গুলি করে মারার পর তার মৃতদেহ পুড়িয়ে অঙ্গার করে রাস্তায় ফেলে রাখার লোমহর্ষক পৈশাচিক দৃশ্যও দেশবাসী দেখেছে। এই ঘটনার সঙ্গে আওয়ামী লীগের লোকেরা জড়িত বলে নিহতের আত্মীয়-স্বজন ও সংবাদপত্রের রিপোর্টে জানা গেছে।
তিনি বলেন, জনগণের আশীর্বাদপুষ্ট র্যাব হয়ে উঠেছে সাধারণ মানুষের কাছে মূর্তিমান আতংক, এক ঘাতক বাহিনী। দেশবাসী ও দুনিয়ার বিবেকবান মানুষ এর বিরুদ্ধে সোচ্চার হয়েছে। মানবাধিকার সংস্থাগুলো থেকে র্যাব বিলোপের দাবি উঠেছে। এই বাহিনীর সুনাম, শৃঙ্খলা ও নৈতিক মান ভেঙ্গে পড়েছে। জনগণের সমর্থন ও ভালোবাসা ছাড়া কোনো আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর পক্ষেই কাজ করা সম্ভব নয়। র্যাব সেটা হারিয়ে ফেলেছে।
খালেদা জিয়া বলেন, আমরা আর একটি হত্যাকাণ্ডও দেখতে চাই না। আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর একটি বেআইনী কার্যকলাপও যেন আর না ঘটে। বিচার-বহির্ভূত হত্যা সম্পূর্ণভাবে বন্ধ করতে হবে। সাদা পোশাকের কোনো বাহিনীর মাধ্যমে আর কোনো অভিযান চালানো যাবে না।
বেগম খালেদা জিয়া বলেন, অপহরণের মতো করে কিংবা রাতের অন্ধকারে কোনো গ্রেফতার করা আর চলবে না। কাউকে গ্রেফতার করতে হলে সাক্ষী রেখে, পুলিশ ও প্রয়োজনে ম্যাজিস্ট্রেটের উপস্থিতিতে অভিযোগ উল্লেখ করে তারপর গ্রেফতার করতে হবে। রিমান্ডের নামে নির্যাতন বন্ধ করতে হবে। আটক অবস্থায় কোনো বন্দী নিহত বা আহত হলে তা বিচারের আওতায় আনতে হবে। মানবাধিকার প্রতিষ্ঠানগুলোকে ভয়-ভীতি প্রদর্শন, হেনস্থা, তাদের সদস্যদের হয়রানিমূলক গ্রেফতার ও অপহরণের অপচেষ্টা বন্ধ করতে হবে। বেআইনীভাবে বন্ধ করে রাখা ভিন্নমতের সংবাদ প্রতিষ্ঠানগুলো অনতিবিলম্বে খুলে দিতে হবে, আটক সম্পাদক ও সাংবাদিকদের মুক্তি দিতে হবে। ইতিমধ্যে বিচার বহির্ভূত হত্যা ও বলপূর্বক নিখোঁজসহ যত গুরুতর ও বেআইনী ঘটনা ঘটেছে তা তদন্ত ও বিচারের আওতায় আনতে হবে। এগুলো কোনো রাজনৈতিক দাবি নয়। নাগরিকদের প্রাণরক্ষা ও নিরাপত্তার জন্যই এগুলো করতে হবে। এই বিষয়গুলো আইনে আছে কিন্তু তার প্রয়োগ নেই।
এর আগে পুলিশের অনুমতি না পাওয়ায় রাজধানীর ইঞ্জিনিয়ার্স ইনস্টিটিউশন মিলনায়তনে বিএনপির নাগরিক সমাবেশ স্থগিত করা হয়।
