অর্থ পাচার রোধে বিনিয়োগের অনুকূল পরিবেশ জরুরি

আপডেট : ২৩ মে ২০১৪, ১৯:৪৮
থমকে আছে দেশের সার্বিক বিনিয়োগ পরিস্থিতি। অস্বস্তিকর গুমোট ভাব কাটছে না যেন কোনোভাবেই। আজকাল পত্র-পত্রিকার পাতা খুললেই চোখে পড়ছে নেতিবাচক বিনিয়োগ পরিস্থিতির সূচকের ওপর বিভিন্ন প্রতিবেদন। সম্প্রতি অর্থমন্ত্রী বলেছেন, দেশে বিনিয়োগ হচ্ছে না, টাকা পাচার হয়ে যাচ্ছে। বিদেশিরা বাংলাদেশে বিনিয়োগে আকৃষ্ট হলেও এখানে পদে পদে অনেক বাধা রয়েছে। গত বছর যে ধরনের রাজনৈতিক সহিংসতা ছিল দেশজুড়ে তা এখন নেই। রাজনীতির মাঠে সহিংসতা কমে এলেও গতি ফেরেনি অর্থনীতির। ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ সরকার নতুন মেয়াদে দায়িত্ব নেয়ার পর রফতানি প্রবৃদ্ধি, রাজস্ব আহরণ, মূলধনী যন্ত্রপাতির আমদানি কমেছে। বিনিয়োগ কমে যাওয়ায় ব্যক্তি খাতে ঋণ প্রবাহও কমেছে। আস্থার অভাবে বিনিয়োগ ও উত্পাদনে স্থবিরতা বিরাজ করছে। ব্যক্তি খাতে সম্পদ ও জীবনের নিরাপত্তা নিয়ে অনিশ্চয়তা বাড়ছে। এর ফলে বিদেশে পুঁজি পাচারের প্রবণতা বাড়ছে। সম্পদ ও জীবনের নিরাপত্তার অভাব অর্থনীতিকে ঘিরে ধরেছে। নতুন কোনো সরকার ক্ষমতায়ন হলে নীতির পরিবর্তন হতে পারে, এমন আশংকায় উদ্যোক্তারা বিনিয়োগ করতে পারছেন না। এর ফলে ৫ জানুয়ারি নির্বাচনে নতুন সরকার দায়িত্ব নেয়ার পরে বিনিয়োগ বাড়েনি। গত কয়েকমাস ধরে বেসরকারি খাতে ঋণপ্রবাহ একই অবস্থানে রয়েছে। অর্থ বছরের প্রথম ছয়মাসে ১৬ দশমিক ৬০ শতাংশ রফতানি প্রবৃদ্ধি হলেও সাম্প্রতিক তিন মাসে প্রবৃদ্ধি হয়েছে মাত্র ৩ দশমিক ৩৯ শতাংশ। প্রথম ছয়মাসে সাড়ে ৫ শতাংশ প্রবৃদ্ধি হলেও পরের তিন মাসে রাজস্ব আদায় কমেছে দশমিক ১ শতাংশ হারে। এ সময়ে বিনিয়োগের কোনো উন্নতি হয়নি। ডিসেম্বর পর্যন্ত অর্থবছরের ছয় মাসে ব্যক্তিখাতে বিনিয়োগ বেড়েছে ১০ দশমিক ৬ শতাংশ। ফেব্রুয়ারিতে এর হার ১০ দশমিক ৭ শতাংশে দাঁড়িয়েছে। এ সময়ে মূলধনী যন্ত্রপাতি আমদানি কমেছে প্রায় দেড় শতাংশ। সরকারের সবচেয়ে বড় বিনিয়োগ বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচি (এডিপি) বাস্তবায়নে আগের বছরের সঙ্গে ব্যবধান বেড়েছে। বিনিয়োগের এই স্থবিরতার মূল কারণ আস্থার অভাব। দেশে বিনিয়োগে স্থবিরতার কারণ একটি বা দুটি নয়, অনেক। দেশে গ্যাস-বিদ্যুত্ সরবরাহ পরিস্থিতির কিছুটা উন্নতি হলেও গ্যাস-বিদ্যুত্ সংকট কাটেনি এখনও। অনেক উদ্যোক্তা বিনিয়োগ করেও উত্পাদনে আসতে পারছেন না গ্যাস-বিদ্যুত্ সংকটের কারণে। ব্যাংক ঋণের সুদের হার উচ্চ হওয়ায় উদ্যোক্তারা বিনিয়োগে নিরুত্সাহিত হচ্ছেন। বাংলাদেশে ব্যাংক ঋণের সুদের উচ্চহার আশেপাশের দেশগুলোর তুলনায় অনেক বেশি রয়ে গেছে আজও। ব্যাংক ঋণের সুদ পরিশোধ করতে গিয়ে অনেকের দেউলিয়া হওয়ার দশা হয়েছে। ব্যাংকগুলোর নানা ধরনের সার্ভিস চার্জও বিনিয়োগের পথে বাধা সৃষ্টি করছে। অনুন্নত যোগাযোগ অবকাঠামোর কারণেও নিরুত্সাহিত হচ্ছে বিনিয়োগ। এমন তথ্যও রয়েছে বিনিয়োগের উদ্দেশ্যে ঢাকায় আসা বিদেশি প্রতিনিধি দল তীব্র যানজটের মুখে পড়ে ত্যক্ত বিরক্ত হয়ে দেশে ফিরে গেছে। সব মিলিয়ে বলা যায়, দেশে বিনিয়োগের অনুকূল পরিবেশ এখনও গড়ে ওঠেনি। তাই মুখ ফিরিয়ে রেখেছেন উদ্যোক্তারা। এ পরিস্থিতির পরিবর্তন জরুরি। বিদেশিরা বাংলাদেশে বিনিয়োগে আকৃষ্ট হলেও এখানে পদে পদে নানা বাধা তাদেরকে হতোদ্যম করে ফেলছে। রাজনৈতিক অস্থিরতা, দুর্নীতি, অবকাঠামোর অভাব, আমলাতান্ত্রিক জটিলতাসহ নানা কারণে বিদেশিরা এক পা এগোলে দুই পা পিছিয়ে যাচ্ছে। আজকাল সবার মুখে মুখে একটি কথা বেশ শোনা যায়। তা হলো, বাংলাদেশ বিনিয়োগ কঠিন, পাচার সহজ। এখানে জায়গা জমি কিনতে গেলে, ফ্ল্যাট কিনতে চাইলে, ছোট-খাটো শিল্প প্রতিষ্ঠা করে ব্যবসা করতে চাইলে কিংবা যে কোনো খানে জমানো টাকা বিনিয়োগ করতে গেলে সামনে এসে দাঁড়াচ্ছে সরকারের নানা সংস্থা। হয় এনবিআর, না হয় দুদক নয়তো অন্য কোনো সংস্থার কাছে কড়ায় গণ্ডায় বুঝিয়ে দিতে হচ্ছে, প্রাপ্ত অর্থের কিংবা সম্পদের উত্স। সমাজের আর সব ক্ষেত্রে আইনের প্রয়োগ থাক বা না থাক এই ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা তত্পরতা দেখিয়ে ছাড়ছেন। নানাভাবে হয়রানির শিকার হওয়া উদ্যোক্তাদের বিনিয়োগ ভাবনা এরপর কর্পুরের মতো উঠে যাচ্ছে। এভাবে বিভিন্নভাবে হয়রানি, লাঞ্ছনার শিকার উদ্যোক্তারা এক সময়ে ভাবতে বাধ্য হচ্ছেন এ দেশে আর কোনো বিনিয়োগ নয়, তার চেয়ে বিদেশে অনেক ভালো। আমাদের আশেপাশে এবং পৃথিবীর নানা প্রান্তে বিভিন্ন দেশেই ভালো সুযোগ রয়েছে বিনিয়োগের। এসব কারণ দেশে শিল্প, ব্যবসা-বাণিজ্য, আবাসন, কৃষিসহ নানা খাতে বিনিয়োগযোগ্য অর্থের একটি বড় অংশ পাচার হয়ে যাচ্ছে বিদেশে। মালয়েশিয়ায় ইতিমধ্যে বাংলাদেশ থেকেই অনেকে গিয়ে বিপুল পরিমাণ অর্থ বিনিয়োগ করেছেন। মূলত চীন ও জাপানের পরেই মালয়েশিয়ার বিভিন্ন বিনিয়োগ কর্মসূচিতে বাংলাদেশিরা এগিয়ে রয়েছেন বলে সম্প্রতি একটি দৈনিকে রিপোর্ট প্রকাশিত হয়েছে। দেশে বিনিয়োগ করতে গিয়ে নানা আইনি ঝামেলার কারণে শুধু মালয়েশিয়া নয়, অন্য দেশেও পাচার হচ্ছে টাকা। সেখানে ফ্ল্যাট কিনে, ব্যাংকে নগর অর্থ জমা রেখে নির্বিঘ্নে রয়েছেন এ দেশেরই বহু মানুষ। কানাডাতেও বিপুলসংখ্যক বাংলাদেশি অর্থপাচার করে ঘর-বাড়ি, জমি ও ফ্ল্যাটের মালিক হচ্ছেন। বাংলাদেশ থেকে অর্থ পাচারকারীদের অনেকেই একই এলাকায় ফ্ল্যাট, জমি ও বাড়ি কিনেছেন, কানাডায় যা ‘বেগমপাড়া’ নামে পরিচিত। এতসব বিষয় বিশ্লেষণ করে একটি ব্যাপার পরিষ্কার হয়ে যায় সবার কাছে তা হলো দেশে বিনিয়োগ কঠিন, বিদেশে পাচার সহজ। এ বিষয়ে বিশেষজ্ঞ-বিশ্লেষক এবং ভুক্তভোগীরা বলছেন, আমাদের আইন-কানুনগুলো বিনিয়োগবান্ধব করলেই দেশে বিনিয়োগের পরিমাণ বাড়বে নয়তো বিদেশে অর্থ পাচার চলতেই থাকবে। লেখকঃ ব্যাংকার