অর্থনৈতিক চ্যালেঞ্জ মোকাবেলা করতে হবে নতুন ‘প্রেসিডেন্ট’কে

আপডেট : ২৩ মে ২০১৪, ১৯:৪৯
বিশ্ব গণমাধ্যমে প্রায়ই শিরোনাম হচ্ছে মিসর। আরব-বসন্তের ছোঁয়ায় হোসনি মুবারকের পতন, অতঃপর মোহাম্মদ মুরসি হলেন দেশের ইতিহাসে প্রথম নির্বাচিত প্রেসিডেন্ট। এতে ধারণা জন্মেছিল, এবার সামনে এগোবে মিসর। কিন্তু এক বছর যেতে না যেতেই সেনা সহায়তায় ছুঁড়ে ফেলে দেয়া হল তাঁকেও। এরপর বসলো অন্তর্বর্তীকালীন সরকার। এ অবস্থায় সেখানে আরেকটি প্রসিডেন্ট নির্বাচন আসন্ন। এতে কে, কীভাবে জিততে যাচ্ছেন, তা বুঝতে কারোরই বাকি নেই। কিন্তু যে বিষয়টি বিস্ময় জাগাচ্ছে, সেটি হল— সাবেক ফিল্ড মার্শাল আব্দেল ফাত্তাহ আল-সিসিকে তার সমর্থকরা এরইমধ্যে পরবর্তী জামাল আব্দেল নাসের ভাবতে শুরু করেছেন। অনুগতদের দৃঢ় বিশ্বাস, তিনি নাসেরের মতোই চমক দেখাবেন অর্থনীতিতে। কিন্তু সিসি নিশ্চয়ই জানেন, এ কাজ মোটেও সহজ নয়। নাসেরের পরের সব প্রেসিডেন্ট অর্থনীতি পুনর্গঠনের কাজে হাত দিয়েছিলেন ঠিকই; কিন্তু সফলকাম হতে পারেননি। জামাল আব্দেল নাসেরের রেখে যাওয়া কমান্ড ইকোনোমি ও রটিএই (rentier) রাষ্ট্রের কাঠামোর সঙ্গে আপোস না করেই তার ‘মুক্ত দ্বার’ নীতির অধীনে অর্থনৈতিক সংস্কার সাধনের চেষ্টা চালিয়েছিলেন প্রেসিডেন্ট আনোয়ার সাদাত। এর ফলশ্রুতিতে উত্থিত হয়েছিল প্যারালাল ইকোনোমি, যাকে মিসরীয়রা আখ্যা দিয়েছিল “ফ্যাট ক্যাটস”। এতে একটা শ্রেণির সম্পদের পরিমাণ কেবলই বাড়ছিল। কিন্তু অবস্থার পরিবর্তন হচ্ছিল না সুবিধাবঞ্চিত লোকজনের। এই প্যারালাল অর্থনীতি বহাল ছিল মুবারকের আমলেও। তিনি এর নাম ‘ট্রিকল ডাউন ইকোনোমি’ দিয়ে যৌক্তিকতা জাহির করার চেষ্টা করছিলেন। প্রেসিডেন্ট রোনাল্ড রিগানের আমলে যুক্তরাষ্ট্রে এই তত্ত্বটি বেশ জনপ্রিয় ছিল, তিনি ধনী ব্যক্তিদের উপর কর কমানোর উত্সাহ যুগিয়ে ব্যবসায়ীদেরকে প্রণোদনা দিয়ে যাচ্ছিলেন। আশা করা হচ্ছিল এতে তাদের আয় বেড়ে বাকি অর্থনীতির উপর প্রভাব পড়বে। এটি সত্য যে, এই তত্ত্ব মিসরে ব্যর্থ প্রমাণিত হয়েছিল এবং যার ফলশ্রুতিতে ঘটেছিল ২৫ জানুয়ারির বিপ্লব। স্লোগান ছিল ‘সামাজিক ন্যায়বিচার’। সমস্যা হচ্ছে, মিসরের রাজনীতিবিদ ও বুদ্ধিজীবীর দেশের সবচে’ গুরুত্বপূর্ণ ইস্যু অর্থনীতি দিয়ে কোনো আলোচনাই করছেন না। তাঁরা আলোচনা করছেন ওইসব বিষয় নিয়ে— দেশ হবে সিভিল ধর্মীয় না সামরিক। পরিচালনা করবে কে, মুসলিম ব্রাদারহুড নাকি সামরিক সমর্থনপুষ্ট সরকার। কিন্তু তারা যে বিষয়টিকে গুরুত্ব দিচ্ছেন না, তা হল, অর্থনীতিতে নাটকীয় কোনো পরিবর্তন দেখাতে না পারলে গত তিন বছরে যে ধরনের বিপ্লবগুলোর মুখোমুখি হয়েছে সেগুলোর চেয়ে বড় ধরনের বিপ্লব মোকাবেলা করা লাগতে পারে ভবিষ্যতে। আগের সরকারগুলো সংস্কার সাধনের উদ্যোগ নিলেও দীর্ঘমেয়াদী পরিকল্পনা নিয়ে কিছুই করা হয়নি। কিছুদিন আগে ন্যূনতম মজুরি বৃদ্ধির ঘোষণা দিলেও তাতে সকল পেশাকে অন্তর্ভুক্ত করা হয়নি। তাছাড়া যে পরিমাণ বৃদ্ধির ঘোষণা এসেছে তা প্রয়োজনের তুলনায় যথেষ্ট নয়। অসহনীয় মুদ্রাস্ফীতির কারণে নির্দিষ্ট আয়ের মিসরীয়দের হাহুতাশ ছাড়া কিছুই করার নেই। মিসরের হবু প্রেসিডেন্ট নিশ্চয়ই জানেন যে, মিসরের সমস্যাটা খুবই সাধারণ; কিন্তু সমাধান করাটা খুবই কঠিন। আয়ের তুলনায় রাষ্ট্রের ব্যয় অনেক বেশি। চলতি অর্থবছরে দেশের বাজেট ঘাটতির পরিমাণ ২৪০ বিলিয়ন ইজিপশিয়ান পাউন্ড (৩৪.৯ বিলিয়ন মার্কিন ডলার), যা কি-না গত অর্থবছরের জিডিপির ১৪ শতাংশের সমান। বস্তুত ৬ মিলিয়নেরও বেশি সরকারি কর্মচারীকে টানতে গিয়েই মিসরের অবস্থা কাহিল। সংখ্যাটা খুব শীঘ্রই সাত মিলিয়নে পৌঁছুবে। কারণ প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী অনেক অস্থায়ী কর্মচারীকে স্থায়ী করা হচ্ছে। ৭৫ হাজার অস্থায়ী শিক্ষককে দেয়া হয়েছে স্থায়ী চুক্তির প্রস্তাব। তাছাড়া অনেক দামি পণ্যেই সরকার ভর্তুকি দেয়। তেলের ভর্তুকির পেছনে সরকারের গত অর্থবছরে খরচ হয়েছিল ১৪০ বিলিয়ন ইজিপশিয়ান পাউন্ড (২০ বিলিয়ন মার্কিন ডলার)। বস্তুত ফ্রি মার্কেট ইকোনোমি ও কমান্ড ইকোনমি’র মধ্যিখানে আটকা পড়ে খাবি খাচ্ছে মিসর। খুঁজে পাচ্ছে না এ অবস্থা থেকে বের হবার রাস্তা। মুবারকের আমলে ইস্যুগুলোকে চিহ্নিত করে সমাধানের চেষ্টা করা হয়েছিল সত্য; কিন্তু খুব বেশি এগানো সম্ভব হয়নি দুর্নীতি ও স্বজনপ্রীতির কারণে। বিশ্বমন্দা তুঙ্গে থাকা সত্ত্বেও ২০০৮ সালে মিসরের জিডিপি প্রবৃদ্ধির হার ছিল ৭.১ শতাংশ; কিন্তু দেশের এক-তৃতীয়াংশ লোক ঠিকই বাস করছিল দারিদ্র্যসীমার নিচে। তাদের কাছে পৌঁছাচ্ছিল না প্রবৃদ্ধির সুফল। একই অবস্থা এখনো রয়ে গেছে। উপরন্তু অনেক নেমে এসেছে প্রবৃদ্ধির হার। ‘প্রেসিডেন্ট’ সিসি যদি নিজের গদির নিরাপত্তার পেছনেই অর্থ ও সময় বেশি ব্যয় করেন তাহলে ভেস্তে যেতে পারে তার দীর্ঘদিন ক্ষমতায় থাকার স্বপ্ন। মিসরের প্রয়োজন এখন অর্থনৈতিক পুনর্জাগরণ, যার সুফল সবাই পেতে পারে। এ লক্ষ্যে এগোলে তিনি জামাল আব্দেল নাসেরের মতো পেয়েও যেতে পারেন। এমন ঘটলে লোকজন হয়তো ভুলে যেতে পারে তিনি কাকে সরিয়ে এবং কীভাবে ক্ষমতায় বসেছিলেন। —দ্য ওয়াল স্ট্রীট জার্নাল অনুসরণে