রেলওয়ের বর্তমান অবস্থার কোনো উন্নতি বা অগ্রগতি নেই। রেলওয়ের যাত্রীসেবার মান, নিরাপত্তা, নিরাপদ যাতায়াত, নির্ধারিত সময়ে গন্তব্যে পৌঁছা, যাত্রীবাহী কোচের মান—সব মিলিয়ে রেলওয়ে এখন প্রশ্নের সম্মুখীন। দেশের বিভিন্ন রুটে চলাচলকারী আন্তঃনগর ও মেইলট্রেনসহ বিভিন্ন ট্রেনের যাত্রীসেবার মান একেবারে নিম্ন পর্যায়ে এসে পৌঁছেছে। মনে হয় যাত্রীদের সেবার ব্যাপারে দেখার কেউ নেই। অথচ রেলওয়েতে কর্মরত রয়েছেন হাজার হাজার কর্মকর্তা এবং কর্মচারী। এসব কর্মকর্তা এবং কর্মচারীর কাজ কী? মাসের শেষে বেতন নেওয়া নাকি যাত্রীদের যথাযথ সেবা প্রদান করা, নির্বিঘ্নে, নিরাপদে, রেল চলাচল করার ব্যাপারে দায়িত্ববান হওয়া?
কিছুদিন আগে আমার গ্রামের বাড়ি কুমিল্লায় যাওয়ার জন্য মহানগর প্রভাতীর টিকেট নেই অনলাইনে। চট্টগ্রাম থেকে মহানগর প্রভাতী সকাল সাতটায় ছাড়ার কথা থাকলেও নির্ধারিত সময়ের একঘণ্টা পরে ট্রেন ছাড়ে। ট্রেনে উঠে দেখি আমাদের আসন টয়লেটের সামনে পড়েছে। এ ব্যাপারে টিকেটচেকারদের জিজ্ঞেস করা হলে তাঁরা এ ব্যাপারে কোনো সদুত্তর দিতে পারেননি। খোঁজ নিয়ে জানতে পারি অনলাইনে যাঁরা রেলের টিকেট নিয়েছেন তাঁদের প্রত্যেকের আসন টয়লেটের সামনে পড়েছে। অনলাইনে টিকেট নিলে এক অবস্থা আর লাইনে অথবা কালোবাজারিদের কাছ থেকে টিকেট নিলে অন্য অবস্থা। এ ব্যাপারে রেল কর্তৃপক্ষের বক্তব্য কী তা জানতে চাই।
টয়লেটের সামনের আসনে বসে কোনো রকম যাত্রা শুরু হলেও অনির্ধারিত যাত্রাবিরতির কারণে কুমিল্লায় পৌছুতে পৌছুতে দুপুর ১টা বেজে যায়। সেদিনের মহানগর প্রভাতীতে ভ্রমণের সময় পুরো ট্রেনের পেছন থেকে সামনে পর্যন্ত সামগ্রিক অবস্থা পর্যবেক্ষণ করি। পথে পথে ট্রেন থামিয়ে যাত্রী ওঠানামা করানোতে পুরো বগি যাত্রীতে পরিপূর্ণ হয়ে যায়। দেখা যায় অধিকাংশ যাত্রীর টিকেট নেই। টিকেটচেকাররা যাত্রীদের কাছ থেকে টাকা নিচ্ছেন। কিন্তু কোনো স্লিপ বা টিকেট দিচ্ছেন না। অধিকাংশ বগির ফ্যান, লাইট জ্বলছিল না। গরমে যাত্রীরা হাঁসফাঁস করছিলেন। কোনো টয়লেটে পানি ছিল না। পানি ছাড়া টয়েলেটগুলো ব্যবহার করাতে ট্রেনের পরিবেশ দুর্গন্ধে ভারী হয়ে যায়। অথচ প্রায় বগিতে দেখা গেছে বগির ছাদ থেকে পানি পড়ছে। এই পানিতে পুরো ট্রেন কর্দমাক্ত হয়ে ওঠে। মহানগর প্রভাতীতে করে সেদিন চট্টগ্রাম থেকে কুমিল্লা পর্যন্ত ভ্রমণ করে যে অভিজ্ঞতা অর্জন করেছি তা আজীবন মনে থাকবে। রেলে যাত্রীরা প্রতিদিন কী যে দুর্ভোগ পোহান তা এ থেকেই অনুমান করা যায়।
দেশ স্বাধীন হয়েছে ৪৩ বছর পার হতে চললো। এই ৪৩ বছরেও আমাদের দেশের রেলপথ বাড়েনি, বাড়েনি রেলের গতি, বাড়েনি বগি, ইঞ্জিনের সংখ্যা, বাড়েনি সেবার মানসহ আরো অনেক কিছু। রেলওয়ের উন্নয়নের লক্ষ্যে রেলকে যোগাযোগ মন্ত্রণালয় থেকে পৃথক মন্ত্রণালয় সৃষ্টি করা হয়েছে। পৃথক মন্ত্রী, সচিব নিয়োগ করা হয়েছে। তারপরও রেলের উন্নতি হচ্ছে না। আমরা উন্নত বিশ্বের সঙ্গে আমাদের রেলের তুলনা করছি না। আমাদের পার্শ্ববর্তী রাষ্ট্র ভারতের রেল সার্ভিসের তুলনাই হয় না। সেখানে সাধারণ মানের ট্রেন থেকে শুরু করে অনেক উন্নত মানের ট্রেন চলাচল করছে। সেখানকার যাত্রীদের প্রধান বাহন হচ্ছে ট্রেন। অথচ আমাদের দেশে ঢাকা-চট্টগ্রাম রুটে চলাচলকারী আন্তঃনগর ট্রেন ‘সুবর্ণ এক্সপ্রেস’ ছাড়া আর কোনো মানসম্মত ট্রেন নেই। এই ট্রেনের যাত্রীরাও মাঝে-মধ্যে অনেক ঝামেলার মধ্যে পড়ে যান। আমাদের দেশে সড়কপথের যতটুকু অগ্রগতি হয়েছে সে তুলনায় রেলের তেমন কোনো অগ্রগতি হয়নি। ঢাকা-চট্টগ্রাম রুটের ডাবল লাইনের কাজ এখনও পর্যন্ত শেষ করা যায়নি। পর্যটন নগরী কক্সবাজার পর্যন্ত রেল সার্ভিস চালু করা সম্ভব হয়নি। রেলকে আরো উন্নত করার লক্ষ্যে, যাত্রীদের সেবার মান বাড়ানোর লক্ষ্যে, রেলকে আরো গতিশীল এবং নিরাপদ চলাচলের লক্ষ্যে সরকারকে আরো তত্পর হতে হবে। রেলওয়ের কর্মকর্তা এবং কর্মচারীদের দায়িত্বশীল হওয়ার ব্যাপারে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে আরো কঠোর হতে হবে। বাংলাদেশ রেলওয়ে তার নিজস্ব বৈশিষ্ট্য বজায় রেখে সামনের দিকে এগিয়ে যাবে এবং রেলকে অত্যাধুনিক সাজে সজ্জিত করার লক্ষ্যে কার্যকর উদ্যোগ নেওয়া হবে বলে আশা রাখি।
চট্ট্রগ্রাম
