বজ্রপাত কি দুর্যোগ নয়

আপডেট : ২৩ মে ২০১৪, ২২:২০
১৫ মে বৃহস্পতিবার। একটি অনলাইন সংবাদপত্রে পরপর তিনটি খবরের শিরোনাম ছিল এরকম—লক্ষ্মীপুরে বজ পাতে শিশুর মৃত্যু, হবিগঞ্জে বজ পাতে যুবক নিহত, বজ পাতে ঝালকাঠিতে প্রাণ গেলো দুই কৃষকের। সরকারের ত্রাণ ও দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা অধিদপ্তরের ওয়েবসাইটে বন্যা, ঘূর্ণিঝড়, জলোচ্ছ্বাস, ভূমিকম্প এমনকি অগ্নিকাণ্ডের ঘটনায় বছরভিত্তিক ক্ষয়-ক্ষতির বিবরণ পাওয়া গেলেও বজ পাতে ক্ষয়-ক্ষতির কোনো তথ্য নেই। বেসরকারি উদ্যোগে কোনো কোনো প্রতিষ্ঠান এই হিসাব রাখে। তাদের এই পরিসংখ্যানের সূত্র অবশ্য সংবাদপত্রে প্রকাশিত খবর। তার মানে বজ পাতে মৃত্যুর সব খবর গণমাধ্যমে আসে না। অর্থাত্ বজ পাতে ফি বছর মৃত্যুর যে পরিসংখ্যান আমরা দুর্যোগ ফোরাম বা এরকম অন্য কোনো বেসরকারি সংগঠনের কাছ থেকে পাই তার বাইরে আরো অনেক মৃত্যু হয় বলে ধারণা করা যায়। দুর্যোগ ফোরাম প্রতি বছর যে দুর্যোগ প্রতিবেদন প্রকাশ করে, সেখানে দেখা যাচ্ছে, বাংলাদেশে বজ পাতে ২০১১ সালে ১৭৯ জন, ২০১২ সালে ২০১ জন এবং ২০১৩ সালে ২৮৫ জন নিহত হয়েছেন। তার মানে বজ পাতে মৃত্যুর সংখ্যা প্রতি বছরই বাড়ছে। যুক্তরাষ্ট্রের ন্যাশনাল লাইটনিং সেফটি ইন্সটিটিউটের তথ্য মতে, প্রতি বছর সারা পৃথিবীতে বজ পাতে যত মানুষের মৃত্যু হয়, তার চার ভাগের এক ভাগই হয় বাংলাদেশে। ২০১০ সালে ওই ইন্সটিটিউটের একটি প্রতিবেদনে এরকমই তথ্য দেওয়া হয়েছে। বজ পাত বেশি হয় গ্রামাঞ্চলে। কারণ শহরাঞ্চলের ভবনগুলোয় বজ নিরোধক আর্থিং থাকে। ফলে ওই আর্থিংয়ের কারণে বজ মানুষের কোনো ক্ষতি করতে পারে না। তবে গ্রামাঞ্চলে বজ পাত বেশি হবার কারণ সেখানে উঁচু ভবন নেই। আবার যেসব এলাকায় উঁচু গাছের পরিমাণ কম, সেখানে বজ পাত বেশি হয় বলে বিশেষজ্ঞরা মনে করেন। সাম্প্রতিককালে দেশে বজ পাতের প্রবণতা বাড়ছে উল্লেখ করে কোনো কোনো বিশেষজ্ঞ এর কারণ হিসাবে বড় বড় গাছ কেটে ফেলাকে দায়ী করেন। বজ পাতে নিহতদের অধিকাংশই মাঠে কাজ করতে থাকা কৃষক। ফলে একজন কৃষকের মৃত্যু মানে ওই পরিবারের উপার্জনক্ষম প্রধান ব্যক্তির মৃত্যু। তাই সরকারের সামাজিক নিরাপত্তাবেষ্টনী কর্মসূচি থেকে এই পরিবারগুলো যাতে সুবিধা পায়, সেজন্য উদ্যোগ নেওয়া দরকার বলে অনেকে মনে করেন। আবার বজ পাতে আহতদের আধুনিক চিকিত্সা দেশে নেই। বজ পাতে প্রধানত আহত ব্যক্তির শরীরের বিভিন্ন অংশ পুড়ে যায়। কিন্তু দেশের অল্প কিছুসংখ্যক হাসপাতালেই পোড়া রোগীদের চিকিত্সা হয়। তাছাড়া বজ পাতে আহত ব্যক্তিরা সারা জীবনই এক ধরনের ট্রমার মধ্যে থাকেন। কেউ কেউ স্মৃতিভ্রষ্ট হয়ে যান। সম্প্রতি ফরিদপুরে একটি বজ পাতে একসঙ্গে তিনজন কৃষক মারা যান। যে দুজন জীবিত আছেন, তাঁদের একজন রফিক সরকার এখনও স্মৃতিশক্তি পুরোপুরি ফিরে পাননি। একটু সচেতনতা বজ পাতে মৃত্যু কমিয়ে আনতে পারে। ঝড়-বৃষ্টির মৌসুমে যখন কৃষকরা খেতে কাজ করেন, তখন ঝড়ের আভাষ পাওয়া মাত্রই জমি থেকে উঠে যাবেন। কারণ বজ পাত মানুষকে এক সেকেন্ডও সময় দেয় না, যেমন সময় দেয় ঘূর্ণিঝড় বা বন্যা। খুব প্রয়োজন ছাড়া উঁচু গাছ না কাটা এবং গ্রামাঞ্চলে বেশি করে তাল এবং নারকেল গাছ লাগানো। ইটের দালান হোক আর টিনের ঘরই হোক বজ নিরোধক স্থাপন করা যায়। ঝড়-বৃষ্টি শুরু হলে কোনো গাছের নিচে আশ্রয় না নেওয়া এবং যত দ্রুত সম্ভব কোনো ঘরের ভেতরে ঢুকে যাওয়ার মতো ছোটখাটো বিষয়গুলো খেয়াল রাখলে বজ পাতে মৃত্যু কমিয়ে আনা সম্ভব। ঢাকা