মাধব রায়
সহকারী অধ্যাপক (পদার্থবিদ্যা)
ব্লু-বার্ড স্কুল এন্ড কলেজ, সিলেট
কাজ-অকাজ
রাতের খাবার খেতে বসেছে সবাই একসাথে। ডাইনিং টেবিলে একটা মজার গন্ধ ভেসে বেড়াচ্ছে চমত্কার সব খাবারের। চন্দ্রা জিজ্ঞেস করলো— আচ্ছা মামা, তুমি অফিসে
কী কাজ করো ?
কমলা বললেন— তোর মামা অফিসে কোনো কাজই করে না, শুধু বসে বসে ফাইল নাড়ে, আর দস্তখত দেয়।
বাহ্, তোমার কী আরামের চাকরি, তাই না মামা ? বললো আকাশ।
মামি বললেন— হ্যাঁ, তোর মামা সারাদিন চেয়ারে বসে বসে আরাম করে, আর আমরা বাসায় সারাদিন কতো পরিশ্রম করি।
নীলকান্তবাবু হাসলেন, আমাদেরটা কাজ নয়, তাই না কমলা ?
কমলাও হাসলেন।
নীলকান্তবাবু বললেন— তুমি ঠিকই বলেছো। বিজ্ঞানের ভাষায় আমারটা কাজ নয়।
কীভাবে কাজ নয় ? বললো সীমা।
পদার্থবিজ্ঞান বলে, কাজ হলো বল প্রয়োগে সরণ ঘটানো। সরণ হলে পরে বল ও সরণের গুণফল দ্বারা কাজের পরিমাপ করা হয়।
কিন্তু যদি সরণ না হয় ? বিন্দু বললো।
তাহলে কাজ হবে না। ধর একজন লোক একটা বস্তু হাতে নিয়ে বসে থাকলো। তাহলে পদার্থবিজ্ঞান বলবে কোনো কাজ হয়নি।
কিন্তু আমরা তো জানি— রেখা বললো, কোনো কিছু করাকেই কাজ বা ক্রিয়া ইংরেজিতে ভার্ব (Verb) বলে। এমন কি বসে থাকলে, খেলে, ঘুমালেও একে ক্রিয়া বলি।
সেটা হলো ইংরেজি গ্রামার বা বাংলা ব্যাকরণের ক্ষেত্রে। নীলকান্তবাবু বুঝালেন। একটা ঘটনা বলি শোন, আমাদের অফিসের ফাইলপত্র একটু স্যাঁতসেতে ভাব দেখা দিলো। ভাবলাম রোদ লাগালে ভালো। সামনের মাঠে সবগুলো ফাইল মেলে দিয়ে এর ওপর পাথর চাপা দিলাম, আর আমাদের অফিসের পিওনকে বললাম তুমি এখানে বসে থাকো। কেউ যেন ফাইলপত্র না ধরে। সে পুরো দুইঘণ্টা বসে বসে পাহারা দিলো। পিওন কিন্তু অফিসের দায়িত্ব পালন করলো, অফিসের কাজ। কিন্তু পদার্থবিদ্যা বলবে কোনো কাজ হয়নি। কারণ এখানে পিওনের কোনো সরণ হয়নি। তাই ওয়ার্ক (Work) হয়নি, অফিসিয়েল ডিউটি (Duty) হয়েছে।
তোমার পদার্থবিজ্ঞান বড় নিষ্ঠুর। অনুযোগ করলেন কমলা।
মোটেও না, পদার্থবিজ্ঞান তার নিয়মের ভিতরে খুবই দরদি, নিয়মের বাইরে গেলেই সে নিষ্ঠুর। প্রতিবাদ করলেন নীলকান্তবাবু।
কাজের একক কী মামা ?
জুল।
কমলা ভাবলেন, কী বলছেন নীলকান্তবাবু, মাছের ঝোল ?
হেসে ফেললো সবাই।
না না, মাছের ঝোল নয়। জেমস প্রেসকট জুল, একজন ইংরেজ পদার্থবিদ। তাঁর নামানুসারেই আন্তর্জাতিক পদ্ধতিতে কাজের এককের নাম জুল।
এক জুল কাজ কতটুকু মামা ? চন্দ্রা বললো।
এক নিউটন বল প্রয়োগে যদি কোনো বস্তুর এক মিটার সরণ হয়, তাহলে বলি এক জুল কাজ হয়েছে।
আর যদি দুই নিউটন বল প্রয়োগে দুই মিটার সরণ হয় তাহলে ?
তাহলে হবে চার জুল কাজ। বললেন নীলকান্তবাবু।
তাহলে ব্রিটিশ পদ্ধতিতে কাজের একক কী মামা ?
ফুট-পাউন্ড। বললেন মামা। এক পাউন্ডাল বল প্রয়োগে এক ফুট সরে গেলে যে কাজ হয়, তাকে বলি এক ফুট-পাউন্ড কাজ।
সীমা একমনে খাচ্ছিলো। তার হাতের কাছেই লবণের পটটা ছিলো, হাতে লেগে পড়ে গেলো মেঝেতে। এতে করে সে ভ্যাবাচেকা খেয়ে গেলো। কমলা কাছেই ছিলেন, বললেন— থাক কিচ্ছু হবে না। আমি উঠিয়ে দিচ্ছি। বলে তিনি লবণের পটটা উঠিয়ে দিলেন। ভাগ্যিস মুখটা ভালো করে বন্ধ করা ছিলো, তাই লবণ ছড়িয়ে পড়ে রুমটা নষ্ট করে দেয়নি। আর পটটা প্লাস্টিকের তৈরি থাকায় ভেঙ্গে যায়নি। নীলকান্তবাবু আবার ফিরে এলেন কাজের আলোচনায়। বললেন— কাজ কিন্তু দুই ধরনের।
কমলা বললেন— সে তো সবাই জানে, ভালো কাজ আর মন্দ কাজ।
অণু বললো, সীমাদি লবণের পট ফেলে দিলো, সেটি মন্দ কাজ, আর মা সেটি তুলে দিলো, এটি ভালো কাজ।
হো হো করে হাসলো সবাই, মা-ছেলের ব্যাখ্যা শুনে শুধু সীমা হাসলো না। সে ভীষণ লজ্জা পেয়েছে।
ব্যাপারটাকে হালকা করার জন্য নীলকান্তবাবু বললেন— না, না, এরকম কিছু নয়। ভালো কাজ আর মন্দ কাজ তো পরিবেশগত সমাজগত বিবেচনায়। বিজ্ঞানের বিবেচনায় দুই ধরনের কাজ হলো ধনাত্মক কাজ বা বলের দ্বারা কাজ, আর ঋণাত্মক কাজ বা বলের বিরুদ্ধে কাজ। সেটি আবার কী রকম ? বললো আকাশ।
লবণ পটটি মেঝেতে পড়ে গেলো, মানে পৃথিবী তাকে বল দ্বারা টেনে নিলো, সেটি হলো ধনাত্মক কাজ বা বল দ্বারা কাজ। আর তোর মামি সেটি উঠিয়ে দিলো, মানে পৃথিবীর আকর্ষণের বিরুদ্ধে কাজ করলো, সেটি হলো ঋণাত্মক কাজ বা বলের বিরুদ্ধে কাজ।
কমলা বললেন— এই জন্যই তো বলি তোমাদের পদার্থবিজ্ঞান বড় নিষ্ঠুর। আমি ভালো কাজ করলাম, উঠিয়ে রাখলাম, আর তুমি বলো এটি ঋণাত্মক কাজ। তোমার মেয়ে সেটি ফেলে দিলো, তুমি বলছো পজিটিভ কাজ।
নীলকান্তবাবু বললেন, এটাই তো নিয়ম। এখন তুমি যদি গাছ থেকে একটা আম পাড়ো, সেটি হবে পজিটিভ কাজ, আর আমি যদি আবার সেই আম গাছের ডালে উঠিয়ে রাখি, তখন কী হবে ?
সেটি হবে নেগেটিভ কাজ। বললো আকাশ।
ঠিক তাই। বললেন নীলকান্তবাবু।
সকলের খাওয়া আস্তে আস্তে শেষ হয়ে যাচ্ছে। কমলা বললেন একটু দাঁড়াও, আমি দই নিয়ে আসছি।
