দেশের উপকূলীয় এলাকায় পাঁচ বছর আগে আঘাত হানা ঘূর্ণিঝড় আইলার ক্ষত এখনো শুকায়নি। ওইসব এলাকার পরিবেশে এখনো এর ছাপ স্পষ্ট। সেসব এলাকায় সুপেয় পানি পায় না স্থানীয়রা। লবণাক্ততায় ফসল ফলে না। গৃহহীন মানুষকে এখনো পুর্নবাসন করা হয়নি। আমাদের প্রতিনিধি ও সংবাদদাতারা জানাচ্ছেন বিস্তারিত।
সাতক্ষীরা: ৫ বছর পার হলেও দক্ষিণ-পশ্চিম অঞ্চলের উপকূলের হাজার হাজার পরিবার এখনো পুনর্বাসিত হয়নি। আশ্রয়হীন জনপদে এখনো চলছে অন্ন, বস্ত্র, বাসস্থান ও খাবার পানির জন্য তীব্র হাহাকার। সাতক্ষীরার শ্যামনগর উপজেলার পদ্মপুকুর, গাবুরা ও আশাশুনির প্রতাপনগর এলাকায় মানুষের হাহাকার এতটুকু থামেনি। দুই মুঠো ভাতের জন্য রীতিমত লড়াই করতে হচ্ছে তাদের। খাবার পানির জন্য ছুটতে হচ্ছে মাইলের পর মাইল। এ অঞ্চলের ১৪টি গ্রামের মধ্যে মাত্র তিনটি গ্রামের টিউবওয়েলের পানি পান করা যাচ্ছে। ফলে উচ্চ বিত্ত থেকে শুরু করে নিম্ন বিত্ত সবাই চালাচ্ছে বেঁচে থাকার সংগ্রাম। আইলার আঘাতের পর থেকে গোটা এলাকা উদ্ভিদশূন্য হয়ে পড়ে। ফসল ও চিংড়ি উত্পাদন বন্ধ থাকায় এলাকা জুড়ে কর্মসংস্থানের সংকট দেখা দিয়েছে। কর্মহীন মানুষ অনেকেই এলাকা ছেড়ে কাজের সন্ধানে বাইরে চলে গেছে। এদিকে, বনদস্যুদের অত্যাচারে সুন্দরবন, কপোতাক্ষ ও খোলপেটুয়া নদীর উপর নির্ভরশীল এ এলাকার মানুষের জীবন-যাপন দুর্বিষহ হয়ে পড়েছে। বিকল্প কর্মসংস্থানের কোন ব্যবস্থা না থাকায় স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরতে পারছে না উপকূলীয় এ জনপদের প্রায় ৮০ হাজার মানুষ। আইলার পরপরই সরকারি-বেসরকারি উদ্যোগে কাজের বিনিময় খাদ্য প্রকল্পের কাজ হলেও এখন আর কোনো কাজ হচ্ছে না। আর এ কারণে ক্রমেই বাড়ছে দরিদ্র ও হত দরিদ্রের সংখ্যা।
অপরদিকে উপকূল রক্ষা বেড়ীবাঁধগুলোতে ভয়াবহ ফাটল দেখা দেয়ায় এবং এগুলো সংস্কার না করায় ঝুঁকির মধ্যে থাকতে হচ্ছে এ জনপদের কয়েক লাখ মানুষকে।
আইলা বিধ্বস্ত শ্যামনগরের গাবুরা ইউনিয়ন পরিষদ চেয়ারম্যান জি. এম মাসুদুল আলম জানান, লবণাক্ততার কারণে জমিতে ফসল হচ্ছে না। হাজার হাজার বিঘা জমি পতিত পড়ে রয়েছে। বেড়ীবাঁধের অবস্থা খুবই নাজুক। নদীতে বড় ধরনের জোয়ার আসলেই বেড়ীবাঁধ উপচে পানি লোকালয়ে প্রবেশ করছে। এলাকায় কাজ-কর্ম না থাকায় বহু মানুষ আইলার পরে আর এলাকায় ফেরেনি।
সাতক্ষীরা জেলা প্রশাসক নাজমুল আহসান জানান, বেড়ীবাঁধ, সুপেয় পানিসহ যে সব সমস্যা রয়েছে তা সমাধানের জন্য সরকার ও বেসরকারি সংস্থার যৌথ প্রচেষ্টা অব্যাহত রয়েছে। নদী ভাঙ্গন বা বেড়ীবাঁধ সংস্কার করার জন্য ইতিমধ্যে ঊর্ধ্বতন মহলের দৃষ্টি আকর্ষণ করা হয়েছে।
কয়রা (খুলনা) সংবাদদাতা: এলাকা ঘুরে দেখা গেছে, দক্ষিণ বেদকাশি, উত্তর বেদকাশি, কয়রা সদর ও মহারাজপুর ইউনিয়নের পাউবোর বেড়ীবাঁধের ওপর শত শত মানুষ সেই থেকে ঝুপড়ি বেঁধে বসবাস করে আসছে। মাথা গোঁজার ঠাঁই না পেয়ে শত কষ্টের মধ্য দিয়ে বেড়ীবাঁধকে আকড়ে ধরে রেখেছে তারা। তাদের সাথে কথা বলে জানা যায়, সহায়-সম্পদ বলতে যা কিছু ছিল তার সবটুকু জলোচ্ছ্বাসে ভাসিয়ে নিয়ে গেছে। তাছাড়া সে সময় নদীর প্রবল ভাঙনে শাকবাড়িয়া, কপোতাক্ষ ও কয়রা নদীর তীরবর্তী এলাকার মানুষের বসতভিটা, আবাদি জমি নদী গর্ভে বিলীন হয়ে যায়। গাছপালা শূন্য কয়রা উপজেলার পরিবেশ এখনো যেন মরুভূমি। যে কারণে প্রচণ্ড দাবদাহে মানুষের জীবনে বিপর্যয় নেমে এসেছে। লবণাক্ততার কারণে হাজার হাজার হেক্টর ফসলি জমিতে কৃষকরা আজো ঠিকমতো ফসল লাগাতে পারছে না। তবে স্থানীয় কৃষি অফিস সূত্রে জানা যায়, কিছু কিছু এলাকায় কৃষকরা আইলার পর থেকে এ বছরই অল্প কিছু জমিতে ফসল উত্পাদন করতে সক্ষম হয়েছে।
আইলার তিন বছর পর ভেঙে যাওয়া ভয়াবহ পবনা বাঁধ, হারেজখালি, পদ্মপুকুর, শিকারিবাড়ি, পাথরখালি মেরামত হলেও ৬টি ইউনিয়নের কপোতাক্ষ ও শাকবাড়িয়া নদীর পানি উন্নয়ন বোর্ডের প্রায় ৬০ কিলোমিটার বেড়ীবাঁধে পর্যাপ্ত মাটি নেই। দক্ষিণ বেদকাশি ইউনিয়নের আংটিহারা, খাসিটানা, জোড়শিং, মাটিয়াভাঙা, উত্তর বেদকাশি ইউনিয়নের গাতিরঘেরি, গাববুনি, গাজিপাড়া, কাটকাটা, কয়রা সদর ইউনিয়নের ৬ নং কয়রা, ৪ নং কয়রার পুরাতন লঞ্চঘাট সংলগ্ন এলাকা, ঘাটাখালি, হরিনখোলা, মহারাজপুর ইউনিয়নের উত্তর মঠবাড়ি, দশালিয়া, লোকা, মহেশ্বরীপুর ইউনিয়নের কালিবাড়ি, নয়ানি, শেখেরটেক এলাকার বেড়িবাঁধগুলো অধিকতর ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে উঠেছে। এ সকল বেড়িবাঁধ সংস্কার করা না হলে যেকোন মুহূর্তে ভেঙে আবারো গোটা উপজেলা লোনা পানিতে তলিয়ে যেতে পারে।
ক্ষতিগ্রস্ত বেড়িবাঁধ নির্মাণ প্রসঙ্গে পাউবোর আমাদী উপ-বিভাগীয় শাখা কর্মকর্তা মো. আব্দুল মতিন বলেন, ঝুঁকিপূর্ণ কিছু বাঁধে মাটির কাজ চলছে। তাছাড়া ভাঙন কবলিত বাঁধে ডাম্পিং ব্লক ফেলানো হচ্ছে। এছাড়া সম্প্রতি যে সকল বাঁধ ভয়াবহ ভাঙনের কবলে পড়েছে সেগুলো মেরামতের জন্য সংশ্লিষ্ট ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে অবহিত করা হয়েছে। এ বিষয়ে উপজেলা নির্বাহী অফিসার মো. শামীম হাসান বলেন, কয়রা এলাকার মানুষের পুনর্বাসনে সরকারিভাবে সহায়তা করা হচ্ছে। আইলা পূর্ব অবস্থায় ফিরে যেতে সব রকমের সাহায্য সহযোগিতা করা হবে।
উপজেলা চেয়ারম্যান আ খ ম তমিজ উদ্দীন জানান, কয়রার মানুষ এখনো তাদের পূর্বের অবস্থায় ফিরে যেতে পারেনি।
টেকনাফ (কক্সবাজার): টেকনাফ উপজেলার সাবরাং ও হ্নীলার ইউনিয়নের প্রায় ১৭ কিলোমিটার বেড়িবাঁধ গত পাঁচ বছরেও সংস্কার করা হয়নি। এ কারণে হুমকিতে রয়েছে অর্ধলক্ষাধিক মানুষ।
পানি উন্নয়ন বোর্ড (পাউবো) কর্তৃপক্ষ জানায়, বরাদ্দ না পাওয়ার কারণে বাঁধ সংস্কার করা যাচ্ছে না। ঘূর্ণিঝড় আইলার আঘাতে নাফ নদের ১৬ ফুট আয়তনের বেড়িবাঁধ ভেঙ্গে দেড় ফুটে পরিণত হয়েছে। এতে প্রতি অমাবশ্যা-পূর্ণিমায় জোয়ারের পানি ফসলি জমি ও লোকালয়ে ঢুকে পড়ছে
সরেজমিনে দেখা গেছে, উপজেলার উপকূলীয় সাবরাং ইউনিয়নে ৬৮ নম্বর ফোল্ডারের প্রায় দুই কিলোমিটার অরক্ষিত বেড়িবাঁধ সংস্কারের অভাবে পড়ে আছে। বিশেষ করে, শাহপরীর দ্বীপের পশ্চিমপাড়া এলাকার দুই কিলোমিটার বেড়িবাঁধ ও সংশ্লি¬ষ্ট এলাকার চার শতাধিক ঘরবাড়ি সাগরে বিলীন হয়ে গেছে। পার্শ্ববর্তী দক্ষিণপাড়া, ডাঙ্গরপাড়া ও উত্তরপাড়ার আরও সাত শতাধিক ঘরবাড়ি হুমকির মুখে পড়েছে। এ ছাড়া বঙ্গোপসাগর সংলগ্ন পশ্চিম-উত্তরপাড়া, বিলপাড়া, হারিয়াখালী, কচুবুনিয়া ও লাফার ঘোনা এলাকার আরও প্রায় দুই কিলোমিটার বেড়িবাঁধ জরাজীর্ণ অবস্থায় রয়েছে।
অন্যদিকে, হ্নীলা ইউনিয়নের মৌলভীবাজার, ওয়াব্রাং, গোদামপাড়া, জালিয়াপাড়া, নাটমুরাপাড়া, চৌধুরীপাড়া, রঙ্গিখালী, আলীখালী, লেদা, জাদিমুরা ও মোচনী এলাকার ৩৫টি স্থানে নাফ নদীর বেড়িবাঁধ জরাজীর্ণ হয়ে পড়েছে। তার মধ্যে জালিয়াপাড়া অংশে এক কিলোমিটার বাঁধের পুরোপুরি বিলীন, সাত কিলোমিটার জরাজীর্ণ ও মৌলভীবাজার অংশে সাত কিলোমিটার জরাজীর্ণ হয়েছে। ওই খোলা অংশ দিয়ে জোয়ারের পানি ঢুকে সংশ্লি¬¬ষ্ট এলাকার গ্রামগুলো প্লাবিত হচ্ছে প্রতিদিন। এ বেড়িবাঁধে সাতটি স্লুইসগেট থাকলেও সেগুলোর মধ্যে ছয়টি ভরাট হয়ে গেছে। ফলে পানি নিষ্কাশনে বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। অন্যদিকে, বাঁধটি সংস্কার না হওয়ায় সীমান্তরক্ষী বিজিবির জওয়ানদের টহল প্রদানে মারাত্মক ব্যাঘাত সৃষ্টি হচ্ছে।
কক্সবাজার পাউবোর নির্বাহী প্রকৌশলী একেএম শফিকুল হক বলেন, আইলায় ক্ষতিগ্রস্ত বেড়িবাঁধে কোন বরাদ্দ না পাওয়ায় বাঁধ সংস্কার করা সম্ভব হয়নি। ১০৭ কোটি টাকা বরাদ্দ চেয়ে পরিবেশ ও বন এবং পানিসমপদ মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমে বিশ্বব্যাংকে একটি আবেদন প্রক্রিয়াধীন রয়েছে। বরাদ্দ পেলেই সিসিব্লক দিয়ে স্থায়ীভাবে বেড়িবাঁধ নির্মাণ করা হবে।
