যখন দু’জনেই চাকরিজীবী

আপডেট : ২৫ মে ২০১৪, ১৯:৫১
সাবরিনা সুলতানা চুমকি চাকরি করেন একটি বেসরকারি ব্যাংকে। তার স্বামী আবিদ আজাদ বায়িং হাউজে। দু’জনেই মেধায়, যোগ্যতায় নিজ নিজ কর্মক্ষেত্রের উচ্চ আসনে আসীন। সাবরিনা সুলতানা চুমকি প্রতিদিন সকালে অফিসে যান মুখ ভার করে আবার বাসায় ফিরে আসেন বাসার কোনো না কোনো দুশ্চিন্তা মাথায় নিয়ে। আবিদ আজাদ যে বেশ স্বস্তিতে বাসা থেকে বের হন আবার ফিরে আসেন তাও নয়। ছোট-খাটো সংসার। বিয়ে হয়েছে চার-পাঁচ বছরের মতো হবে। ঘরে আছে একমাত্র ছেলে কিন্নর। তেমন ঝুট-ঝামেলা নেই। সব কিছু পরিপাটি কিন্তু কোথায় যেনো হারমোনিকার মিহি সুরের মতো একটা অমিল দু’জনার মধ্যে। অথচ বিয়ের বছর দুই এমন ছিল না। বেশ মিল ছিল মতামতে-মনে। বেশ মিল ছিল পারস্পরিক বোঝাপড়ায়। আবিদ আজাদ চাকরি পাবার পরপরই বিয়ে করেন। তখন সাবরিনা পড়াশোনা শেষ করেছেন মাত্র। তার পরের বছর দু’জনের মতামতের ভিত্তিতেই সাবরিনা জয়েন করেন চাকরিতে। কিন্তু এখন সে হারমোনিকার সুর নেই হূদয়ছোঁয়া। একটা খটকা লেগেই থাকে-‘আমি ভেবেছি তুমি করবে...আমি তো ভেবেছি তুমি সারবে কাজটা...’ এমন সব খটকাতেই যত অশান্তি...। প্রসঙ্গ গল্পটি কাল্পনিক। তবে কল্পনায় নিহিত চরিত্র বানানো নয়। এমন চিত্র হরহামেশাই দেখা যায় নতুবা শোনা যায় চারপাশের দেয়াল থেকে। খেয়াল করলে আপনারও চোখে পড়বে অথবা আপনার কানে আসবে এমন ঘটনার কথা। সে যাই হোক, মিল কিংবা অমিল। জানা যাক বা শোনা যাক যা ইচ্ছা তাই। তার দিকে আমাদের প্রগাঢ় আগ্রহ নেই। আমরা এখানে দেখতে চাই বা জানতে চাই সম্পর্কের এই মতভেদ বা মতামতের এই অমিল অথবা পারস্পরিক বোঝাপড়ার যে মতানৈক্য তা কি কেবল একটি চাকরির কারণ নাকি সঠিক পরিকল্পনা আর মনোপ্রস্তুতির অভাবে বেঁধে যায় এমন জটিলতা? সাবরিনা আর আবিদের মধ্যে যে মৃদু হিম বাতাস তার একটি কারণ মোটা দাগে অনুমান করা যায় আর তা হলো দু’জনের চাকরি। আমরা দেখতে চাই স্বামী-স্ত্রী দু’জনে চাকরি করলে কি কি সমস্যাগুলো মোটা দাগ হয়ে সামনে দাঁড়ায় এবং এর থেকে বের হয়ে সমমত ও সমভালোবাসায় পথ চলতে কি কি বিষয়গুলো আমাদের পাথেয় হয়— প্রথমে ভালোবাসা: সহ-অবস্থানে ভালোবাসার বিকল্প নেই। ভালোবাসা নেয়ার জন্য ভালোবাসা দিতে হয়। ভালোবাসা এমন কোনো বিষয় নয় যে তা অন্যদের কাছ থেকে শুধু নিতে থাকবো কিন্তু দেব না। আপনি আপনার পাশের যে মানুষটিকে ভালোবাসেন তাকে সামান্য কিছু অর্থপূর্ণ ইঙ্গিত দিয়ে বুঝিয়ে দিন সে কথা। কেউ যখন জানতে পারবে যে আপনি তাকে ভালোবাসেন তখন সেও আপনাকে ভালোবাসবে। ভালোবাসাহীনতা পথ রুক্ষ করে তোলে আর ভালোবাসা করে মসৃণ। ছাড় দিতে হবে: আবার ভালোবাসি বলেই যে সমপরিমাণ ভালোবাসা কাটায় কাটায় প্রত্যাশা করবো তা না করাই ভালো। কারণ দু’জনের প্রকাশ ভঙ্গি এক নাও হতে পারে। তুলনা না করার চেয়ে নিজ নিজ জায়গা থেকে নিজের কাজটি মনোযোগ দিয়ে করে যাওয়াই ভালো। আমার পাশের মানুষটি আমার জন্য কি করলো তা মনে জায়গা দেয়ার চেয়ে আমি আমার পাশের মানুষটির জন্য কি করতে পারলাম তা বিবেচনায় থাকলে কষ্টের বা খারাপ লাগার পরিমাণ কম হবে। সম্প্রীতি বজায় থাকবে অধিক। তুলনাকে প্রশ্রয় দেয়া কিছুতেই ঠিক নয়, ছাড় দেয়ার প্রবণতা অধিকাংশ সময়ই মঙ্গলকর। সময় একটি বিষয়: যখন দু’জনেই চাকরি করছেন তখন সময় একটি বিরাট বিষয়। মনে রাখতে হবে সারাদিন ব্যস্ত থাকার পর আমি যেমন ত্যক্তবিরক্ত আমার পাশের মানুষটিও একই রকম। তাই কারো মতামত কারো উপর না চাপানোই ভালো। বাসায় ফিরার পর পরস্পর পরস্পরকে সময় দিতে হবে। কে কাকে বেশি সময় দিলো তা নিয়ে হিসাব না কষে কে কাকে সময় একটু বেশি দিতে পারলাম তা খেয়াল করলে পরস্পরের জন্য সুখকর হবে। বাসায় এসে দু’জনেই দু’জনার কাজগুলো ভাগাভাগি করে সেরে নেয়া যেতে পারে খুব সহজেই। অর্থগত আলাপ: আমরা ছোটবেলায় পড়েছি কেতাবে ‘অর্থই অনর্থের মূল’। সে বয়ান মিথ্যে নয় এক আনাও। আমাদের জীবন সরল রেখায় চলে কিন্তু যখনই অর্থগত বিষয়টি জড়িয়ে যায় তখনই যেনো সব ছক এলোমেলো। সব উদ্দেশ্য দিগ্বিদিক। তাই স্বামী-স্ত্রী দু’জনেই যখন চাকরিতে, দু’জনেই যখন আয় করবো তখন আমাদের প্রথমেই উচিত একটি অর্থপ্রসঙ্গ ছক এঁকে নেয়া। যদি সে আয় হয় মাসিক তবে প্রতিমাসে বা বছরের শুরুতেই আমাদের সে ছক কেটে নিতে হবে, যে আমরা সংসারে কে কোন দায়িত্বটি পালন করবো। কে কোন খাতে নিজের উপার্জিত অর্থ ব্যয় করবো। এ রকম একটি পরিকল্পনা থাকলে প্রতিদিনই আমাদের ধাক্কা খেতে হবে না। হীনমন্যতায় ভুগতে হবে না। ভুল বোঝাবুঝিরও কোনো সুযোগ থাকবে না। একঘেয়েমো অন্তরায়: পারিপার্শ্বিকতায় দেখা যায়, স্বামী-স্ত্রী দু’জনে চাকরি করলে আমাদের মধ্য থেকে কেমন যেনো কোমলতাগুলো উবে গিয়ে আমরা যান্ত্রিকতায় আক্রান্ত হয়ে পড়ি বেশি। আমরা যেনো নিজ নিজ মতামত থেকে কিছুতেই সরতে চাই না। কথায় কথায় বলে উঠি, আমি কি কম রোজগার করি? না, বিষয়টি রোজগারের নয়। বিষয়টি ভালোবাসার। কেননা, রোজগারের চেয়ে ভালোবাসা অনেক বড়, সংসার অনেক গুরুত্বের। তাই একঘেয়েমো ছাড়তে হবে। যা মতামত তা দু’জনেই নিতে হবে মানবিক বা ভালোবাসার মাপকাঠি দিয়ে। অর্থের হিসাব বা রোজগারের হিসাব দিয়ে নয়। ব্যয়ের বিবরণী থাকতে হবে দু’জনের কাছেই: কোনো লুকোচুরি না করে দু’জন দু’জনের কাছে থাকতে হবে স্বচ্ছ। কে কত রোজগার করছি এবং তা কোন খাতে ব্যয় হচ্ছে তা পরস্পরকে জানিয়ে দেয়া স্বচ্ছতা। তা হলে দু’জনেরই ধারণা থাকবে কার দ্বারা কি করা সম্ভব। আর কে কি করলো আর কতটুকু করা সম্ভব। তাহলে কেউ কারো উপর অহেতুক আবদার বা বায়না ধরতে পারবে না। ভুল বোঝার কোনো অবকাশই থাকবে না। পথ চলা হবে সহজ ও সরল। কারো উপর চাপিয়ে না দেয়া ভালো: কাছের কোনো মানুষ তো আছেনই অন্য যেকোনো মানুষকে বদলে দিতে পারবেন-এমন ভাবনা আপনার সবচেয়ে বিষাক্ত চিন্তাগুলোর মধ্যে একটি যা জীবনকে শান্তি দেবে না। আপনি যতো চেষ্টাই করুন এবং যাই করুন, অন্যদের বদলানো যায় না। একইভাবে অন্যরা আপনাকে কখনো বদলাতে পারবে না। কাজেই এ ক্ষেত্রে যারা যেমন তাদেরকে তেমনভাবেই গ্রহণ করা উচিত। আচরণে বৈশিষ্ট্যে মানুষ থেকে মানুষ ভিন্ন। তাই ভিন্নতার চেয়ে মিলগুলো কি সেদিকে খেয়াল করলে পরস্পরের প্রতি আস্থা বাড়বে বিশ্বাস বাড়বে। মেনে নেয়ার প্রবণতা থাকাটা উত্তম। না থাকলে যে কোনো অস্বস্তিকর পরিবেশ সৃষ্টি হতে পারে যে কোনো সময়। যা আমাদের কারোরই কাম্য নয়। নিজেকে ‘শিকার’ বলে আশঙ্কা না করা: আপনি হয়তো আপনার পাশের মানুষটির শিকার নন। কিন্তু বিষয়টিকে এভাবে দেখছেন, এটা আসলে অনেকটা সহজাত চিন্তা। কিন্তু এভাবে চিন্তা না করাই ভালো। কেউ কারো শিকার হয় না। নিজের আচার-আচরণ দিয়ে প্রতিকূলতাকে নিজের অভিমুখি করে নিতে হয়। আপনি যদি কারো জন্য মখমল বিছিয়ে দেন তবে সেও তো আপনার জন্য মখমল না হোক চাদর বিছিয়ে দেবে। শিকার বা শিকারী ভাবার চেয়ে বিষয়টিকে ‘আমার’ ভাবতে পারলে অনেক কিছুই সহজ করে নেয়া যাবে। এ ভাবেই ভাবা উচিত। যখন আমরা দু’জনেই চাকরি করবো তখন বাস্তবিকভাবেই সময় মিলবে কম কাছে থাকার তাই যে সময়টুকু পাওয়া যাবে সে সময়টুকুকে আপন করে তার সঠিক ব্যবহার করাটা উত্তম। যোগাযোগে যেন ফোকর না থাকে: যোগাযোগ বলতে কোনো বিষয় নিয়ে ভাবতে গিয়ে যেনো কোনো ফোকর না থাকে সেদিকে খেয়াল রাখা উচিত। ধরুন, আগামীকাল কোনো এক বিয়ের নিমন্ত্রণ আছে। নিমন্ত্রণে অ্যাটেন্ড করতে হলে কিছু উপহার নিতে হবে সৌজন্যমূলক। অথচ অফিস থেকে ফেরার পথে সাবরিনা ভাবলেন আবিদ কিছু একটা নিয়ে আসবে আবার আবিদ ভাবলেন সাবরিনা নিয়ে আসবে নিশ্চয়। অথচ বাসায় এসে দেখা গেল দু’জনের কেউ কোনো গিফ্ট কিনলেন না। তবে কাল কী নিয়ে যাবেন পার্টিতে? বেধে গেল এক মহা হট্টগোল। এমন যেনো না হয়। কি করতে চাই কি ভাবতে চাই তার যেনো একটি পারস্পরিক আলাপন থাকে। যোগাযোগ যেনো থাকে প্রতিটি ক্ষেত্রে। তবেই ভালোবাসায় ছেদ ধরাতে পারবে না কোনো কিছুই। থাকতে হবে ত্যাগের মনোভাব: কথায় আছে ভোগের চেয়ে ত্যাগেই সুখ। মিথ্যে নয়। একসাথে থাকতে হলে, বিশেষভাবে দু’জনেই ব্যস্ত থাকলে ভোগের চেয়ে ত্যাগে খেয়াল যার বেশি সুখ সেথায়ই বিরাজ করে। আমি সারাদিন হাড়ভাঙ্গা খাটুনি খেটে এলাম আর অপরজন আরামে ঘুমিয়ে এলেন এমন মনোভাব যেনো কখনো না আসে। আদতে তা সত্যও না। অফিস বা কর্মস্থল ঘুমানোর বা বিশ্রামের স্থান নয়। তাই বিশ্বাস করতে হবে দু’জনেই সমান পরিশ্রম ধকল সামলিয়ে দিনশেষে ফিরেছেন বাসায়। পরস্পরের দিকে পরস্পরের রাখতে হবে খেয়াল। বুঝতে হবে মনের অবস্থা। মনে রাখতে হবে ‘ত্যাগেই সুখ বাড়ে ভোগে বাড়ে জঞ্জাল।’ শত অনুকূলে থেকেও দেখা দিবে বৈকল্য। হাওয়ায় হাওয়ায় হঠাত্ দেখা দিবে ঝড়ো হাওয়া। সামলে নিতে হবে বুদ্ধি আর বিবেচনায়। আঞ্চলিক কথায় আছে- যেখানে অর্থ সেখানেই গর্ত। এ চরম সত্য মেনে সাবধান আর সতর্ক থাকতে হবে আমাদের আপনজন থেকে আপনজন থেকেও। বুঝে নিতে হবে দ্বন্দ্ব অনিবার্য। আর তার থেকে পরিত্রাণ বা শান্তি বা পারস্পরিক ভালোবাসা বজায় রাখতে বিশ্বাসকে করতে হবে মজবুত-অটুট। বিশ্বাস আর ভালোবাসা দিয়ে জয় করে নিতে হবে প্রতিকূলতা। পাশের মানুষটিকে বলতে হবে-আমার যা পরিশ্রম তা তোমার জন্যই...। দেখবেন সুখ আপনাতেই ধরা দিবে হাতের আঙ্গুলে এসে। যন্ত্রের নগরে যেনো যান্ত্রিক না হয় আমাদের ভালোবাসা মায়া-মমতা বিচারবোধ সেই হবে প্রত্যাশা। এ নগরে যাদের দু’জনার পরিশ্রমী আয়ে চলছে স্বপ্নের সংসার।