ভারতের ১৪তম প্রধানমন্ত্রী হিসেবে আজ সোমবার শপথ গ্রহণ করতে যাচ্ছেন ভারতীয় জনতা পার্টির (বিজেপি) নেতা নরেন্দ্র মোদী। এবারের নির্বাচনে তার দল একক সংখ্যাগরিষ্ঠতা পেয়েছে। তারপরও বিজেপি এনডিএ জোটের শরিকদের নিয়েই সরকার গঠন করছে। ইতিমধ্যেই নতুন সরকারের সম্ভাব্য মন্ত্রিসভার সদস্য ও ধরন নিয়ে নানারকম তথ্য পাওয়া যাচ্ছে। বলা হচ্ছে, মোদী সরকারের মন্ত্রিসভা হবে ছোট আকারের। এই মন্ত্রিসভা হতে পারে ৫০ সদস্যের। মন্ত্রিসভা চূড়ান্ত করতে বিজেপি কয়েকদফা বৈঠক করেছে। অর্থমন্ত্রী হিসেবে নাম উঠে এসেছে অরুণ জেটলি, অরুণ শুরি ও সুব্রামানিয়ান স্বামীর নাম। অর্থমন্ত্রী না হলে পররাষ্ট্রমন্ত্রীর পদও পেতে পারেন জেটলি। বিদায়ী লোকসভার বিরোধীদলীয় নেতা সুষমা স্বরাজ হতে পারেন প্রতিরক্ষা কিংবা মানব সম্পদ উন্নয়ন মন্ত্রী। রেলমন্ত্রী হতে পারেন ভেনকাইয়া নাইড়ু আর নগর উন্নয়ন মন্ত্রী হতে পারেন নিতীন গড়করি। শাহনেওয়াজ হুসেন এবং মুক্তাদির আব্বাস নাখভিও মন্ত্রিসভায় জায়গা পেতে পারেন। এল কে আদভানিকে বড় পদ দেয়ার চিন্তা রয়েছে বিজেপির। তিনি হতে পারেন লোকসভা স্পিকার অথবা এনডিএ জোটের আহ্বায়ক। এছাড়া জোটের শরিকদের আসনের ভিত্তিতে মন্ত্রিসভায় ঠাঁই মিলবে।
এবারের নির্বাচনে ভারতের সবচেয়ে পুরোনো দল কংগ্রেসের ভরাডুবি হয়েছে। আর দুই মেয়াদ অর্থাত্ ১০ বছর পর আবার ক্ষমতায় আসছে কট্টর হিন্দুত্ববাদী দল বিজেপি। তবে দুই মেয়াদ আগের বিজেপি আর এখনকার বিজেপির মধ্যে পার্থক্য অনেক। ঐবার বিজেপি যখন ক্ষমতা গ্রহণ করেছিলো তখন প্রধানমন্ত্রী হয়েছিলেন দলটির সবচেয়ে উদারপন্থি নেতা অটল বিহারী বাজপেয়ী। কবি, আধুনিক মানসিকতার অটল বিহারী বাজপেয়ী দক্ষতার সাথেই দেশের নেতৃত্ব দিয়েছেন। বিজেপি নেতা হলেও প্রধানমন্ত্রী বাজপেয়ী সকল সম্প্রদায়ের জনগণের সম্মান ও আস্থা অর্জন করেছিলেন। কিন্তু এবার প্রধানমন্ত্রী হচ্ছেন নরেন্দ্র মোদী। যার বিরুদ্ধে গুজরাট দাঙ্গায় সংশ্লিষ্টতার অভিযোগ রয়েছে বিস্তর। যদিও বারবার তিনি এ অভিযোগ অস্বীকার করেছেন। তারপরও তিনি যখন প্রধানমন্ত্রী হতে যাচ্ছেন তখন নানামুখী শংকা কাজ করছে দেশটির জনগণের মাঝে। বাণিজ্যবান্ধব নেতা হিসেবে নরেন্দ্র মোদীর পরিচিতি থাকলেও সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির যে ঐতিহ্য ভারতে রয়েছে তা নিয়ে অনেকের উত্কণ্ঠা শোনা গেছে। এর আরেকটি বড় কারণ হলো বিজেপির অভিভাবক সংগঠন রাষ্ট্রীয় স্বয়ংসেবক সংঘ (আরএসএস)। যারা কট্টর হিন্দু জাতীয়তাবাদে বিশ্বাসী। আর মোদীর উপর তাদের প্রভাবও যথেষ্ট। এছাড়া মোদী নিজেই একজন কর্তৃত্বপরায়ণ নেতা। তবে অনেকের মতে, দায়িত্ব গ্রহণের পর একজন দায়িত্বশীল প্রধানমন্ত্রী হিসেবেই দেখা যেতে পারে মোদীকে।
সম্প্রতি টরেন্টো স্টারে প্রকাশিত এক সম্পাদকীয়তে বলা হয়েছে, মোদীকে অবশ্যই সকল ভারতীয় নাগরিকের প্রধানমন্ত্রী হওয়া উচিত। জয়ের পর এক বক্তব্যে মোদী বলেছেন, গরিবের জন্য চিন্তা করা হবে, তাদের কথা শোনা হবে। কারণ ভারতের দুর্বল ও দরিদ্র মানুষেরাই আমাদের ক্ষমতায় এনেছে। নির্বাচনে সংখ্যাগরিষ্ঠতা পেলেও মাত্র ৩১ শতাংশ ভারতীয়দের ভোট পেয়েছে বিজেপি। যদিও এই ভোটেই তারা গত প্রায় ৩০ বছর পর জোট ছাড়াই এককভাবে সরকার গঠনের সুযোগ পেয়েছে।
১২০ কোটির জনসংখ্যার দেশের তরুণ ও মধ্যবিত্ত শ্রেণী এক নতুন ভারতের স্বপ্নে বিজেপিকে ভোট দিয়েছে। তারা মনে করে, গুজরাটের উন্নয়নের মডেল নরেন্দ্র মোদী সারা ভারতবর্ষে ছড়িয়ে দেবেন। তার হাত ধরে ভারতের অর্থনীতিতে গতি ফিরবে। নিজের যোগ্যতা আর কারিশমা দিয়ে চা-বিক্রেতা থেকে প্রধানমন্ত্রী হতে যাওয়া নরেন্দ্র মোদী ভারতের তরুণদের আকাঙ্ক্ষা বুঝতে পারবেন বলেই তাদের বিশ্বাস। তবে এর বাইরে মোদীর হিন্দু জাতীয়তাবাদী পরিচিতি দেশটির প্রায় ১৮ কোটি মুসলিম ও অন্যান্য সংখ্যালঘুদের জন্য উদ্বেগ তৈরি করেছে। সম্প্রতি দ্য হিন্দুর এক সম্পাদকীয়তে বলা হয়েছে, মোদীর প্রতি আস্থার বিশাল ঘাটতি রয়েছে। এই আস্থাহীনতা কাটিয়ে ওঠার চেষ্টা করতে হবে। ভারতের সকল নাগরিকের প্রধানমন্ত্রী হতে চাইলে তিনি কোনো বৈষম্যের সৃষ্টি করবেন না। তার সময়ে কেউ বৈষম্যের শিকার হবে না। এ অবস্থায় মোদীকে তাদের কাছেই আগে যেতে হবে যারা তাকে ভোট দেয়নি।
গত কয়েক দশকের মধ্যে এবারই প্রথম ভারতের পার্লামেন্টে মুসলিম প্রতিনিধিত্ব কমেছে উল্লেখযোগ্যহারে। এ অবস্থায় মোদীকে তার হিন্দু জাতীয়তাবাদী আদর্শের পাশা-পাশি ভারতের ধর্মনিরপেক্ষ গণতন্ত্রের বহুত্ববাদের প্রতিও নজর রাখতে হবে। এবারের জয়ের পর আগামী নির্বাচনের দিকে নজর বিজেপির। আগামী নির্বাচনেও সংখ্যাগরিষ্ঠতা পেতে ইতিমধ্যেই তারা পরিকল্পনা গ্রহণের সিদ্ধান্ত নিয়েছে। এজন্য তারা মুসলিম ও অন্যান্য সম্প্রদায়ের জন্য কিছু ভালো পদক্ষেপ নিতে পারে এবং বিজেপির কট্টর হিন্দুত্ববাদ থেকে মোদী নিজেকেও কিছুটা দূরে সরিয়ে রাখতে পারেন। আশা করা হচ্ছে, মোদী কট্টর মতাদর্শ থেকে সরে তার ‘জনগণের জন্য বাঁচো’ অঙ্গীকারের প্রতি সম্মান দেখাবেন। যাতে করে সকল ভারতীয় এই বিষয়টি অনুধাবন করতে পারেন যে, ভারতের ভবিষ্যতের তারাও একজন অংশীদার।
