রাহুল-প্রিয়াঙ্কায় বিভক্ত কংগ্রেস!

আপডেট : ২৫ মে ২০১৪, ২১:৫৯
লোকসভা নির্বাচনে শোচনীয় হারের ধাক্কা এখনো সামলে উঠতে পারেনি কংগ্রেস। এমন ভয়াবহ রকমের খারাপ ফল কংগ্রেসে তৃণমূল পর্যায়ের কর্মীদের তো বটেই, শীর্ষ কর্তাদেরও ভাবিয়ে তুলেছে। এই বিশাল ধাক্কা কাটিয়ে আবার ঘুরে দাঁড়নো সম্ভব হবে কি না সেই অংক কষতে শুরু করেছে দল। এমনকি দলের শীর্ষ নেতারা খারাপ ফলের জন্য দুষছেন একে-অন্যকে। দায় চাপাচ্ছেন নেতৃত্বের ঘাড়ে। তবে কংগ্রেসের নেতাদের অনেকে সরাসরি আঙুল তুলছেন দলের সহ-সভাপতি রাহুল গান্ধীর দিকে। তারা মনে করেন, রাহুল এখনো ভারতবাসীর কাছে আস্থার পাত্র হয়ে উঠতে পারেননি। একারণে এই শোচনীয় ফল ভোগ করতে হয়েছে দলকে। রাহুলের সমালোচকরা বলছেন, বিজেপি যেমন নরেন্দ্র মোদীকে সামনে এনে বাজিমাত করেছে তেমনি প্রিয়াঙ্কা গান্ধীকে সামনে আনলে বিজেপির মতো জয় পাওয়া সম্ভব না হলেও এমন শোচনীয় পরাজয়ের লজ্জা পেতে হতো না। নেতৃত্ব নিয়ে কংগ্রেসের নেতা-কর্মীরা বিচ্ছিন্নভাবে বক্তব্য-বিবৃতি দিয়ে চলেছেন। যেভাবে বিভিন্ন নেতা বিবৃতি দিচ্ছেন এবং হাইকম্যান্ডকে না জানিয়েই রাজ্য নেতারা সিদ্ধান্ত নিতে শুরু করেছেন, তাতে দলের অন্দরেই এই প্রশ্ন উঠছে— কংগ্রেসে গান্ধী পরিবারের প্রভাব কমতে শুরু করেছে কি না। কংগ্রেসের ডামাডোল ও ‘টিম রাহুল’-এর বিরুদ্ধে সমালোচনাও থামেনি। সম্প্রতি সাবেক কেন্দ্রীয় মন্ত্রী শশী থারুর বলেন, দলের নেতাদের নিজের মত জানানোর সুযোগ দিতে হবে। এতদিন এই সুযোগ দেয়া হয়নি। এমনকি আমাকেও অনেক সময় বলতে দেয়া হয়নি। প্রিয়াঙ্কা গান্ধীকে দলে আরও গুরুদায়িত্ব দেয়ার দাবি উঠেছে বেশ কিছুদিন ধরেই। সেই প্রসঙ্গে থারুর বলেন, ‘প্রিয়াঙ্কা যে ভূমিকায় অভিনয় করতেই চান না তার জন্য আমরা তাঁকে অস্কার দিয়ে দিচ্ছি।’ পাঞ্জাব ও আসামেও কংগ্রেসের বিরোধ তুঙ্গে উঠেছে। আসামে তরুণ গগৈ ইস্তফা দিতে চেয়েছিলেন। কিন্তু তার ইস্তফা সোনিয়া গান্ধী খারিজ করার পরেও গগৈ-বিরোধীরা তত্পরতা কমায়নি। আপাতত তাদের সঙ্গে সন্ধি করতে চেয়েছেন গগৈ। তিনি ঠিক করেছেন, আগামী মাসেই মন্ত্রিসভার সম্প্রসারণ হবে। তখন বিরোধী শিবির থেকে কয়েকজনকে মন্ত্রী করা হবে। পাঞ্জাবে আবার অমরিন্দর সিং বনাম প্রদেশ কংগ্রেস সভাপতি প্রতাপ সিং বাজওয়া বিরোধ তুঙ্গে উঠেছে। নির্বাচনের পর অমরিন্দরের বেশ কিছু সহযোগী নেতা ও বিধায়ক খারাপ ফলের জন্য প্রতাপ সিং-এর ইস্তফা দাবি করেছিল। প্রতাপ সিং উল্টে তাঁদের বিরুদ্ধে শৃঙ্খলাভঙ্গের অভিযোগ এনেছেন। প্রতাপ সিং আবার তার কড়া সমালোচনা করেছেন। জোট শরিক এনসিপি শুক্রবার কংগ্রেসের শীর্ষ নেতৃত্বের ঘাড়েই হারের দায় চাপিয়ে দিয়েছে। সাবেক মন্ত্রী প্রফুল্ল প্যাটেল বলেছেন, হারের সব দায় কংগ্রেসের। কারণ, তারাই একতরফা সব সিদ্ধান্ত নিয়েছে। শরিক নেতাদের সঙ্গে কথা বলেনি। কংগ্রেস নেতৃত্বের উচিত ছিল শরদ পাওয়ারকে আরও বেশি দায়িত্ব দেয়া এবং প্রিয়াঙ্কাকে আরো বেশি কাজে লাগানো। সামনের দিনগুলোতে প্রিয়াঙ্কাকে সামনে রেখে এগোনোর পক্ষে মত দেন তিনি। কংগ্রেস মুখপাত্র শাকিল আহমেদ অবশ্য রাহুল গান্ধীকে বাঁচানোর চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন। তিনি বলেছেন, ‘রাহুলকে আমরাই পদত্যাগ করতে দিইনি। রাহুল সবদিক থেকে যোগ্য নেতা। এরপর তাঁর আর কী করার আছে।’ এই অবস্থায় মিলিন্দ দেওরার উপরেই রাহুল-অনুগামীদের রাগ গিয়ে পড়েছে। কারণ, দেওরাই প্রথম রাহুলের নেতৃত্ব নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন। যুব কংগ্রেসের সভাপতি রাজীব সাতভ বলেছেন, ‘মিলিন্দ এসব কথা আগে বলেননি কেন?’ লোকসভা নির্বাচনে কংগ্রেসের ভরাডুবি রাহুল গান্ধীর নেতৃত্বকে কঠিন পরীক্ষার মুখে ফেলে দিয়েছে। দলের ভেতর থেকে দাবি উঠছে— বোন প্রিয়াঙ্কাকে ফ্রন্ট লাইনে আনার। ঠিক তখনই রাহুলের ঘনিষ্ঠজনেরা এর বিরোধিতা শুরু করেন। যদিও দলের ভরাডুবির দায় রাহুল গান্ধী স্বীকার করে নিয়েছেন, তারপরেও তার এক অনুসারী দাবি করেছেন, রাহুল জানুয়ারিতে প্রচারণায় অংশ না নিলে দলের আরো ভরাডুবি হতে পারতো। আমরা সেই পরিস্থিতি রুখতে সক্ষম হয়েছি, কংগ্রেস ও ইউপিএর ভাবমূর্তি কিছুটা হলেও ধরে রাখতে সক্ষম হয়েছি।’ লোকসভা নির্বাচনের প্রচারণায় অগ্রভাগেই ছিলেন রাহুল গান্ধী। জানুয়ারি থেকেই প্রচারণায় নেতৃত্ব দেন তিনি। প্রিয়াঙ্কা গান্ধী গোটা ভারতে প্রচারণায় থাকেননি। তিনি তার দাদা রাহুল গান্ধীর আমেথি এবং মা সোনিয়া গান্ধীর রায়বেরেলি আসনে শুধু তাদের জন্য প্রচারণা চালান। তিনি যে কয়দিন জনসভা করেছেন, গণমাধ্যমের নজর সে কয়দিন তার দিকেই তাক করা ছিল। নরেন্দ্র মোদীর প্রতি তার শালীন ভাষায় আক্রমণাত্মক ঢংয়ের মধ্যে কংগ্রেস এক সম্ভাবনাময় নেতৃত্বের ছায়া দেখতে পায়। মোদীর উপর থেকে তিনি প্রচারণার আলো প্রায় সবটুকু কেড়ে নিতে সক্ষম হয়েছিলেন ওই কয়েকটা দিন। এমনকি বিশ্লেষকদের মধ্যেও অনেকে বলতে থাকেন, কংগ্রেসের হাল ধরার মতো ব্যক্তিত্বে পরিণত হয়েছেন প্রিয়াঙ্কা। কিন্তু শশী থারুরের মতো প্রভাবশালী কংগ্রেস নেতাদের একাংশ প্রিয়াঙ্কার নেতৃত্ববিরোধী। তারা প্রিয়াঙ্কাকে আক্রমণ করে কথা বলতেও ছাড়ছেন না। তবে সাবেক খাদ্যমন্ত্রী থমাস বলেন, নির্বাচনের আগে রাহুলের পাশাপাশি প্রিয়াঙ্কাকেও রাখার জন্য সোনিয়া গান্ধীকে পরামর্শ দিয়েছিলাম। প্রিয়াঙ্কার দিকে দেখলে আমাদের মহান নেত্রী ইন্দিরা গান্ধীর কথা মনে পড়ে যায়। তার মধ্যে সেই ছায়া বর্তমান। কিন্তু সঠিক সিদ্ধান্ত কেউ নিতে সাহস পেলেন না।’ লোকসভা নির্বাচনে সোনিয়া রায়বেরেলি এবং রাহুল আমেথি থেকে নির্বাচিত হয়েছেন। তবে প্রিয়াঙ্কা কোনো আসন থেকে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেননি। ৪২ বছর বয়সী প্রিয়াঙ্কা মূলত রায়বেরেলি এবং আমেথিতে মা ও ভাইয়ের বিভিন্ন কোম্পানি দেখাশোনা করেন। প্রিয়াঙ্কার পক্ষের নেতারা রাহুলের কেবল সমালোচনা করছেন তা শুধু নয়, তারা কংগ্রেস সহ-সভাপতির উপদেষ্টাদেরও সমালোচনা করে চলেছেন। গত বৃহস্পতিবার দলটির নেতা মিলিন্দ দেওরা এবং প্রিয়া দত্ত দলের সমালোচনা করে বলেন, নেতা এবং তৃণমূল পর্যায়ের কর্মীদের মধ্যে যোগাযোগ নেই। রাহুল গান্ধীর উপদেষ্টাদের প্রতি ইঙ্গিত করে দেওরা একটি টুইটও করেন। সেখানে তিনি লেখেন, মাঠ পর্যায়ের কার্যক্রম এবং নির্বাচনের সাফল্যই বাস্তবতা প্রমাণ করে। এই দুটি বিষয়কে ভিত্তি করেই কংগ্রেসে নেতৃত্ব নির্ধারণ করা উচিত। তিনি পরোক্ষভাবে রাহুলের নেতৃত্বের দুর্বলতার কথা বোঝাতে চেয়েছেন বলে মনে করেন বিশ্লেষকরা।