মিশরে আগামীকাল প্রেসিডেন্ট নির্বাচন। চলবে মঙ্গলবার পর্যন্ত। নির্বাচনের প্রধান প্রার্থী সাবেক সেনাপ্রধান আবদুল ফাত্তাহ আল-সিসি যিনি গতবছর ব্রাদারহুড নেতা মোহাম্মদ মুরসিকে ক্ষমতাচ্যুত করায় নেতৃত্ব দিয়েছিলেন। বিশ্বের অনেক সামরিক অভ্যুত্থানে নেতৃত্বদানকারীদের মতো হয়তো ফাত্তাহ আল-সিসিও ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত হবেন। কিন্তু মিশরবাসীর পর্বতপ্রমাণ সমস্যা সমাধানে কতটুকু ভূমিকা রাখতে পারবে তিনি?
হতভাগ্য মিশরবাসী। একজন সত্যিকারের আদর্শ নেতা আজও পেল না তারা। ১৯৭০ সালে প্রেসিডেন্ট গামাল আবদেল নাসেরের মৃত্যুর পর আনোয়ার সাদাত তার স্থলাভিষিক্ত হলেন। দীর্ঘ ৯ বছরের শাসনামলে তিনি বেশ কিছু ভাল কাজ করেছেন। তার প্রবর্তিত ‘ইনফিতাহ’ অর্থনৈতিক সংস্কার নীতি অনেকের প্রশংসা কুড়ায়। পররাষ্ট্রনীতির ক্ষেত্রেও তিনি যথেষ্ট সাফল্যের পরিচয় দেন। উদারপন্থি এই রাষ্ট্রনায়ক সে সময়ে যথেষ্ট জনপ্রিয়তাও অর্জন করেন। কিন্তু জনপ্রিয়তার শিখরে এসে কঠোর কিছু পদক্ষেপ গ্রহণের কারণে একসময়ে তার জনপ্রিয়তায় ভাটা পড়তে শুরু করে। বিশেষ করে নিত্যপ্রয়োজনীয় খাদ্যদ্রব্যের উপর থেকে ভর্তুকি তুলে নেয়ায় ১৯৭৭ সালে ঘটে মিশরের কুখ্যাত ‘রুটি দাঙ্গা’। মূল বিপত্তিটা ঘটে ১৯৭৯ সালে। সে বছর শত্রুদেশ ইসরাইল সফর করেন সাদাত এবং দেশটির সঙ্গে একটা শান্তিচুক্তিতে উপনীত হন। যেটা পছন্দ করেনি মিশরসহ আরব বিশ্বের বহু মানুষ। শান্তিচুক্তি করার কিছুদিনের মধ্যেই ইসলামি জঙ্গি গোষ্ঠির হামলায় নিহত হন সাদাত।
এরপর মিশরবাসী দেশের প্রেসিডেন্ট হিসাবে পেল হোসনি মোবারককে। আশায় বুক বেঁধেছিল মিশরের মানুষ। ভেবেছিল একজন আদর্শ নেতা বুঝি পেল তারা এতদিনে। প্রথম কয়েক বছর মিশরের উন্নয়নে অনেক কাজ করলেন মোবারকও। কিন্তু একসময়ে দেশ পরিচালনায় মোবারকের আন্তরিকতা ও দক্ষতা নিয়ে প্রশ্ন উঠতে শুরু করলো। দেশের জনগণের একটা বৃহত্ অংশের কাছে তিনি ক্রমেই অপ্রিয় হয়ে উঠতে থাকলেন। কিন্তু জনগণের হূদয়ের সেই স্পন্দন বুঝলেন না মোবারক। তাদের মতামত উপেক্ষা করেই একটা দীর্ঘ সময় মিশরের মসনদে কাটিয়ে দিলেন তিনি। এরপর এল আরব বসন্তের ঢেউ। যার তোড়ে ক্ষমতাচ্যুত হলেন মোবারক। ক্ষমতায় এল মুসলিম ব্রাদারহুড। তাদের নেতা মুরসি দেশের প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হলেন। কিন্তু আবারও একই কাহিনীর পুনরাবৃত্তি। আবারও আশাহত হলো মিশরের মানুষ। ব্রাদারহুডের অতি কট্টর ইসলামি দৃষ্টিভঙ্গি এবং বিরোধীদের দমনে কঠোর কিছু পদক্ষেপ মিশরের অপেক্ষাকৃত উদারপন্থি মুসলিম সমাজ সহজে মেনে নিতে পারলো না। ব্রাদারহুডের প্রতি দেশের বৃহত্ জনগোষ্ঠির এই নেতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গির কারণে হোক কিংবা ক্ষমতায় যাবার প্রবল বাসনার কারণেই হোক, মিশরের সামরিক বাহিনী গতবছরের দেশের গণতান্ত্রিকভাবে নির্বাচিত প্রেসিডেন্ট মুরসিকে হটিয়ে দিয়ে ক্ষমতা দখল করে বসলো। এই অভ্যুত্থানের নেতৃত্ব দেন সে সময়কার সামরিক বাহিনীর প্রধান আবদুল ফাত্তাহ আল সিসি। এই ফাত্তাহকে ঘিরেই এখন মিশরবাসীর যত আশা-আকাঙ্ক্ষা।
আজ সোমবার শুরু হচ্ছে মিশরের প্রেসিডেন্ট নির্বাচন যা চলবে মঙ্গলবার পর্যন্ত। দু’বছরের মধ্যে দ্বিতীয়বারের মতো অনুষ্ঠিত এই নির্বাচনে বিপুল ভোটে জয়ের আশা করছেন সাবেক সেনাপ্রধান আবদুল ফাত্তাহ আল সিসি। নির্বাচনী প্রচারণাকালে তার প্রতি যে বিশাল জনসমর্থন লক্ষ্য করা গেছে তাতে তিনি জয়ের আশা করতেই পারেন। কিন্তু যাকে ঘিরে এত প্রচারণা, সেই ফাত্তাহই ছিলেন অধিকাংশ ক্যাম্পেইনে অনুপস্থিত। নিরাপত্তার কারণেই নাকি ফাত্তাহর এই অতিরিক্ত সতর্কতা। বিপুল জনপ্রিয়তা থাকলেও ব্রাদারহুড ও তাদের সমর্থকরা যে প্রচণ্ড ক্ষেপে আছে তার উপর, এ কথা ফাত্তাহ খুব ভাল করেই জানেন। ব্রাদারহুডের উপর সামরিক সরকারের দমন অভিযানে মারা পড়েছেন অনেকেই। আটকদেরও অনেককে দেয়া হয়েছে ফাঁসি। ফলে কট্টরপন্থি ইসলামিদের হাত থেকে নিজের জীবন রক্ষার তাগিদেই নির্বাচনী প্রচারণায় প্রত্যক্ষভাবে অংশ নিতে পারেননি ফাত্তাহ। তবে পত্রিকা, ইলেকট্রনিক মিডিয়াতে সাক্ষাত্কার প্রদানের মাধ্যমে নির্বাচনী প্রচারণার কাজটা মোটামুটি চালিয়ে গেছেন তিনি। এখন দেখার অপেক্ষা ৫৯ বছর বয়সী এই ‘ইজিপশিয়ান সুপারম্যান’ নির্বাচনে জয়ী হতে পারেন কিনা।
হয়তো সিসি নির্বাচনে জিতেই যাবেন। কারণ বিপুল জনসমর্থন ছাড়াও তার পেছনে রয়েছে রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলো। এ কারণে নির্বাচনে তিনি অতিরিক্ত সুবিধা পাবেন বলে অভিযোগ করেছেন সিসির একমাত্র প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থী বামপন্থি রাজনীতিবিদ হামদিন সাবাহি। ২০১২ সালের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে তৃতীয়স্থান দখল করেছিলেন এই সাবাহি। ডাঁকসাইটে এই রাজনীতিবিদ তার নির্বাচনী ক্যাম্পেইনগুলোতে সরাসরি অংশগ্রহণ করেছেন। তার মূল স্লোগান: দেশে গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা ও সামাজিক ন্যায়বিচার নিশ্চিত করা। তবে মুশকিল হলো, মিশরবাসীর গণতন্ত্রের অভিজ্ঞতা খুব সুখকর নয়। তাই গণতন্ত্রের জন্য অনেকের খুব একটা মাথাব্যথা আছে বলেও মনে হয় না। যেদেশে এক-চতুর্থাংশ মানুষ দারিদ্র্যসীমার নিচে বসবাস করে, তাদের কাছে গণতন্ত্র শুধু একটা গালভরা নাম ছাড়া আর কিছুই নয়।
