দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় একটি দেশই আছে যেটি কোনো দেশের উপনিবেশ ছিল না। অর্থাত্ দেশটি থেকে কোনো সম্পদ চুরি কিংবা পাচার হয়নি। বিদেশিরা সেদেশে ঘাঁটি গাড়তে পারেনি। কিন্তু তারপরও দেশটিতে শান্তি খুব একটা নেই। দেশটির পর্যটন কেন্দ্র বিশ্বখ্যাত। দেশটির অর্থনীতি এই পর্যটন কেন্দ্রের ওপর অনেকটা নির্ভরশীল।
দেশটির নাম থাইল্যান্ড। থাইল্যান্ডের সী-বিচে যখন মানুষ উল্লাসে হুড়োহুড়ি করে; তখন দেশটিতে সরকার এবং রাজনীতিতে ঘটে যায় আমুল পরিবর্তন। রাজনীতিকদের কাছ থেকে ক্ষমতা যায় সেনাবাহিনীর হাতে। তবে বিশ্বের গণতন্ত্রমনা মানুষের কাছে এটা হয়তো বিস্ময়কর। কিন্তু থাইল্যান্ডের সাধারণ মানুষের কাছে কোনোভাবেই তা বিস্ময়কর নয়। কারণ দেশটিতে সেনাবাহিনীর ক্ষমতা দখলের সুদীর্ঘ ইতিহাস রয়েছে। আর সেই ইতিহাসই কেবল জনগণকে স্মরণ করিয়ে দেয়। গত বৃহস্পতিবার সেই ইতিহাসেরই পুনরাবৃত্তি ঘটলো বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা। আর এই ইতিহাস কিন্তু এমনি এমনি ঘটে না। দেশটির লাল-হলুদের দ্বন্দ্বে ইতিহাসের এই কালোছায়া বারবার ফিরে আসে।
গত মঙ্গলবার থাইল্যান্ডে মার্শাল ল জারি করে সেনাবাহিনী। কিন্তু মার্শাল ল জারির বিষয়ে কিছু জানতেন না অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান। সেনাবাহিনী জানায়, দেশে শান্তি-শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনতে সামরিক আইন জারি করা হয়েছে। তখন দাবি করা হয়, এটা কোনো সামরিক অভ্যুত্থান নয়। বিশ্লেষকরা সামরিক আইন জারিকে সেনাবাহিনীর অর্ধেক অভ্যুত্থান বলে মন্তব্য করেন। ওই সময়ই ধারণা করা হয়, এটা অভ্যুত্থানের একটা পূর্ব সংকেত। সেই আশঙ্কাই সত্যি হয়। দুদিন যেতেই গত বৃহস্পতিবার অভ্যুত্থানের ঘোষণা দেয় সেনাবাহিনী। দেশের সংবিধান স্থগিত ও জনসমাবেশ নিষিদ্ধ ঘোষণা করা হয়। আটক করা হয় অনেক রাজনীতিককে। সেনাপ্রধান জেনারেল প্রাইউথ চান-ওচা নিজেকে নতুন প্রধানমন্ত্রী হিসেবে ঘোষণা দেন। থাইল্যান্ডের জাতীয় শান্তি ও শৃঙ্খলা তত্ত্বাবধান কাউন্সিলের (এনপিওএমসি) প্রধান তিনি। সরকার প্রধানের এই পদে স্থায়ীভাবে কাউকে না পাওয়া পর্যন্ত তিনি দায়িত্ব পালন করবেন বলে জানিয়েছেন। অন্তর্বর্তী এই সময়ে সেনাপ্রধানের নিয়োগকৃত কর্মকর্তারা প্রধানমন্ত্রীর অধীনে থাকা প্রশাসনিক কাজ সম্পাদন করবেন। প্রতিটি মন্ত্রণালয় পরিচালনার জন্য আলাদা আলাদা সচিব নিয়োগ দেয়া হয়েছে। সেনাপ্রধান তার ছয় জন প্রতিনিধি নিয়োগ দিয়েছেন। তারা কেন্দ্রীয় সরকারের দেখভাল করবেন। আর প্রদেশের প্রশাসনিক কাজ নিয়ন্ত্রণ করবেন প্রদেশের সেনাবাহিনীর ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা।
‘শান্তি প্রতিষ্ঠা ও সংকট নিরসন’ করতে সেনাবাহিনী ১৫৫ জন রাজনীতিকের দেশত্যাগের ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করে। আটক করা হয় প্রায় দেড়শত রাজনীতিককে। এর মধ্যে আছে ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী ইংলাক সিনাওয়াত্রাও। সেনাবাহিনীর হাতে আটক হওয়া থাইল্যান্ডের ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী ইংলাক সিনাওয়াত্রা ও তার সরকারের নেতাদের এক সপ্তাহ পর্যন্ত আটকে রাখার সম্ভাবনা রয়েছে। তবে তা নির্ভর করছে দেশের বর্তমান রাজনৈতিক এই হাঙ্গামার মধ্যে তারা নিজেদের কীভাবে সম্পৃক্ত করবেন তার ওপর। সেনাবাহিনী জানিয়েছে, ইংলাক সিনাওয়াত্রাসহ আটক অন্য নেতাদের ভয়ের কোনো কারণ নেই। অভ্যুত্থানের ঘোষণার পর সেনারা ব্যাংকক ও এর আশপাশে শিবিরে অবস্থান করা ইংলাকপন্থী ও বিরোধী বিক্ষোভকারীদের ছত্রভঙ্গ করে দেয়। বন্ধ করে দেয়া হয় দেশটির স্বাধীন সব টিভি ও রেডিও স্টেশন। নিষিদ্ধ করা হয় রাজনৈতিক সমাবেশ। টেলিভিশন ও রেডিও চ্যানেলগুলোতে সেনাবাহিনীর বিবৃতি বারবার শোনানো হয়। পাশাপাশি সেনাবাহিনীর ক্ষমতা দখলের পক্ষে সংগীত প্রচার করা হয়। দেশটিতে বিবিসি, সিএনএনসহ কয়েকটি বিশ্ববিখ্যাত চ্যানেলের সম্প্রচার বন্ধ রাখা হয়েছে। তবে সংবাদপত্র, ইন্টারনেট, ল্যান্ডফোন ও মোবাইল ফোনের ওপরে কোনো নিষেধাজ্ঞা নেই। সেনাবাহিনী ক্ষমতা দখলের ১৬ ঘণ্টার মধ্যে দুটি বিধান জারি ও ১৯টি বিবৃতি দিয়েছে।
গত বছরের নভেম্বর পার্লামেন্টে নিঃশর্ত ক্ষমতা সংক্রান্ত একটি আইন পাস করাকে কেন্দ্র করে থাইল্যান্ডে বিক্ষোভ দেখা যায়। বিরোধীদের অভিযোগ এই আইনের মাধ্যমে প্রধানমন্ত্রী ইংলাক তার ভাই দুর্নীতির অভিযোগে অভিযুক্ত বিদেশে অবস্থান করা থাকসিন সিনাওয়াত্রাকে দেশে ফিরিয়ে আনতে চান। এরপর থেকে সাবেক উপ-প্রধানমন্ত্রী সুদেপ থাগসুবানের নেতৃত্বে সংগঠিত হয় বিরোধীরা। তারা হলুদ শার্ট পরে আন্দোলন শুরু করে ইংলাক সরকারের বিরুদ্ধে। শুরু হয় আন্দোলন, সংঘর্ষ। এতে ৩০ জন মানুষের প্রাণ যায়। কিন্তু সরকার এবং বিরোধীরা কেউ কাউকে ছাড় দিতে অপারগতা প্রকাশ করেন। বিরোধীরা হলুদ শার্ট আন্দোলন জোরদার করে এবং সরকারি বিভিন্ন ভবন দখল করে নেয়। এরপর ইংলাকও গ্রাম সফর শুরু করেন। কৃষক তথা গরীব মানুষের কাছে ইংলাকের পুয়া থাই পার্টি অধিক জনপ্রিয়। তিনি কৃষকদের মধ্যে বিরোধীদের বিরুদ্ধে আন্দোলনের হাওয়া ছড়িয়ে দেন। বিরোধী দল মূলত থাইল্যান্ডের ধনী এবং মধ্যবিত্তের দল হিসেবে পরিচিত। আন্দোলন চলে সমানে সমানে। গত ছয় মাস ধরে আন্দোলন চললেও পরিস্থিতি সামাল দিতে সক্ষম হন ইংলাক। কিন্তু গত ৭ মে এক রায়ে দেশটির সাংবিধানিক আদালত ক্ষমতা অপব্যবহারের অভিযোগে ইংলাককে ক্ষমতাচ্যুত করে। তার স্থলে অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধানমন্ত্রী নিয়োগ দেয়া হয় নিউয়াত্তামরং বুনংপাইসানকে। কিন্তু এরপরও বিরোধীরা মানতে নারাজ। এরপর বিরোধী দল এবং সেনাবাহিনী রাজনৈতিক সঙ্কট নিরসনের উপায় হিসাবে অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধানমন্ত্রীকে পদত্যাগের আহবান জানায়। কিন্তু সেই সম্ভাবনা নাকচ করার পরদিন সেনাবাহিনীর পক্ষ থেকে সামরিক আইন জারি এবং অতঃপর ক্ষমতা গ্রহণ।
১৯১৪ সালের মার্শাল ল-ই এখন থাইল্যান্ডের আইন। হিউম্যান রাইট ওয়াচ জানায়, কোনো বিচারিক কার্যক্রম ছাড়াই এই ল’তে যেকোনো কার্যক্রম নিষিদ্ধ, গণমাধ্যমের ওপর নিষেধাজ্ঞা, সভা-সমাবেশ এবং অ্যাসেম্বলির কার্যক্রম স্থগিত করা, যে কাউকে এবং যে কোনো সময় সেনাবাহিনী তল্লাশি ও বিনা পরোয়ানায় আটক করতে পারে। নির্দিষ্ট কোনো এলাকার নিয়ন্ত্রণ নিতেও পারে সেনাবাহিনী। কোনো অভিযোগ ছাড়াই যে কোনো ব্যক্তিকে সাত দিন পর্যন্ত আটক করার ক্ষমতা মার্শাল ল’তে দেয়া হয়েছে। এই আইন দেশে কর্তৃপরায়ন সরকার প্রতিষ্ঠার জন্য অনেক যুতসই।
থাইল্যান্ডে এ পর্যন্ত ১১ বার পুরোপুরি সেনা অভ্যুত্থান এবং সাত বার অভ্যুত্থানের চেষ্টা করা হয়। গত বৃহস্পতিবার নিয়ে ১২ বার ঘটলো। ১৯৩২ সালে সেনাবাহিনীর এক রক্তপাতহীন অভ্যুত্থানের মাধ্যমে দেশটির দেড়শ বছরের রাজতন্ত্রের অবসান ঘটে। ওই বছরই দেশটিতে প্রথম সংসদীয় নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। কিন্তু ছয় বছর পর আবারো সেনা অভ্যুত্থান ঘটে। এরপর ১৯৪৭ সালে আবারো সেনা অভ্যুত্থান ঘটে; যা চলে ১৯৭৩ সাল পর্যন্ত। এরপর ১৯৯২ সাল পর্যন্ত থাইল্যান্ডের ক্ষমতায় সামরিক এবং বেসামরিকের মধ্যে ঘটে আশ্চর্যজনক পালাবদল। এ যেন একটা নিয়মে পরিণত হয়। এরপর ১৯৯৭ সাল পর্যন্ত বেসামরিক সরকার। ১৯৯৭ সালে প্রথম গণতান্ত্রিক সংবিধান প্রণীত হয়। ২০০১ সালে ক্ষমতায় আসে থাকসিন সিনাওয়াত্রার দল। পূর্ণ চার বছর মেয়াদ ক্ষমতায় থাকেন থাকসিন। ২০০৫ সালে আবারো ক্ষমতায় থাকসিন। ২০০৬ সালে আবার সেই সেনা অভ্যুত্থান। ২০০৭ সালে থাকসিনের দলের আন্দোলনে ক্ষমতা ছাড়তে বাধ্য হয় সেনাবাহিনী। এরপর ২০১০ সাল পর্যন্ত আবারো বেসামরিক সরকার। ২০১০ সালের নির্বাচনে আবারো ক্ষমতায় আসে থাকসিনের দল। তবে এবার আসেন তার বোন ইংলাক সিনাওয়াত্রা। কিন্তু মেয়াদ পূর্ণ করা সম্ভব হয়নি। তাইতো ১২তম অভ্যুত্থান ঘটালো সেনাবাহিনী।
থাইল্যান্ডে সামরিক বাহিনীর ক্ষমতা দখলের একদিন পর ওয়াশিংটন বলেছে, তারা যুক্তরাষ্ট্রের পুরনো মিত্র দেশটিতে মোট এক কোটি ৫ লাখ মার্কিন ডলারের সামরিক সহায়তার মধ্যে ৩৫ লাখ মার্কিন ডলার মূল্যমানের সহায়তা বন্ধ করেছে। থাইল্যান্ডে কয়েক বছর ধরে রাজনৈতিক গোলযোগ চলে আসলেও ওয়াশিংটন থাই সামরিক বাহিনীকে ক্ষমতার বাইরে থাকতে বলেছিল এবং ক্ষমতা গ্রহণের ব্যাপারে হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করেছিল। মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী জন কেরি বৃহস্পতিবার হতাশা ব্যক্ত করে বলেছেন, এই অভ্যুত্থানের কোনো যৌক্তিকতা নেই। দেশে এমন কোনো পরিস্থিতি তৈরি হয়নি যে, সেনাবাহিনীকে ক্ষমতা নিতে হবে। সরকারি কার্যক্রম তো ঠিকমতোই কাজ করছিল। তাহলে কেন এই অভ্যুত্থান?— প্রশ্ন কেরির। এদিকে থাইল্যান্ডের বৃহত্তম বিনিয়োগকারী দেশ জাপানও এই অভ্যুত্থানকে দুঃখজনক বলে মন্তব্য করেছে। ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র সৈয়দ আকবর উদ্দিনও উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। তিনি জানান, সামরিক মহড়ার জন্য থাইল্যান্ডে অবস্থানরত কিছু ভারতীয় সৈন্যকে দেশে ফেরার পরামর্শ দেয়া হয়েছে। উদ্বেগ প্রকাশ করেছে ইন্দোনেশিয়া, ফিলিপাইনস ও অস্ট্রেলিয়াও।
সেনাবাহিনী ক্ষমতা নিলেও থাইল্যান্ডে আসলে কি কোনো সমাধান সহসা আসবে— এমন মনে করছেন না কোনো বিশ্লেষক। কারণ সরকার এবং বিরোধীরা কেউই গণতন্ত্রমনা নয়। সবাই চায় ক্ষমতা। ফলে দেশটিতে সেনাবাহিনীর ক্ষমতা দীর্ঘায়িত হবে বলেই মনে করা হচ্ছে। কারণ এখন সেনাপ্রধান তার ক্ষমতা অবস্থানে নির্দিষ্ট কোনো মেয়াদ উল্লেখ করেননি। তবে জনগণ যদি আবার অভ্যুত্থানের বিরোধিতায় মাঠে নামে তাহলে কতদিন পর্যন্ত সেনাবাহিনী ক্ষমতায় টিকতে পারবে সেটি ভাবার বিষয়। ইতোমধ্যে সেনাবাহিনী ক্ষমতা দখলের পরদিন ব্যাংককের রাস্তায় বিক্ষোভ হয়েছে। তাছাড়া সামাজিক যোগাযোগের মাধ্যমগুলোতেও সমালোচনার ঝড় উঠেছে। তাদের শ্লোগান, ‘আমরা গণতন্ত্র চাই। সেনাশাসন চাই না। তবে আবার ভিন্নমতও আছে। এই যেমন ব্যাংককের একজন বাসিন্দা বিরক্ত হয়ে সেনাবাহিনীর ক্ষমতা গ্রহণকে সঠিক সিদ্ধান্ত বলে জানান। তিনি বলেন, আমি সেনাবাহিনীর এই সিদ্ধান্তকে ভালোভাবেই নিচ্ছি। কারণ এর মাধ্যমে দেশে শৃঙ্খলা ফিরে আসবে। পাল্টাপাল্টি বিক্ষোভে জনজীবন অতিষ্ঠ হয়ে উঠেছিল। লাল ও হলুদ শার্টধারীরা এখন ঘরে ফিরে গেলেই শান্তি।
