ভারতের ১৬তম লোকসভায় ক্ষমতাসীন দল নির্ধারিত হয়ে গেছে। সেই সরকারের প্রধানমন্ত্রীর নামও ঠিক হয়ে গেছে। কিন্তু একটা জিনিস এখনো পরিস্কার হয়নি। সংসদীয় গণতন্ত্রে সরকারি দলের সাথে প্রধান বিরোধী দলের প্রশ্নটাও চলে আসে। সেই বিরোধী দলের প্রসঙ্গ সমাধান হয়নি। সত্যি বলতে ১৬তম লোকসভায় কোনো বিরোধী দল থাকবে না! কারণ বিরোধী দলের মর্যাদা পেতে গেলে যে নূন্যতম ‘পাস মার্ক’ লাগে তা কোনো দলই পায়নি। বিজয়ী দল ভারতীয় জনতা পার্টি (বিজেপি) পেয়েছে ২৮৩ আসন। দ্বিতীয় স্থানে থাকা দল কংগ্রেস পেয়েছে মাত্র ৪৪ আসন। ৫৪৩ আসনের লোকসভায় সরকারি দল হবার জন্য পাস মার্ক ২৭২ আর প্রধান বিরোধী দলের ক্ষেত্রে তা ৫৫। তাই বিরোধী ‘দল’ হতে পারছে না কেউ। হতে পারে কেবল বিরোধী ‘জোট’। কংগ্রেসের সঙ্গে ৯টি মিত্র দল মিলে ইউপিএ জোট পেয়েছে ৫৯ আসন। ইউপিএ জোটগতভাবে আবেদন করলে বিরোধী দলের সমান মর্যাদা পেতে পারে। সেক্ষেত্রে ইউপিএ জোটনেত্রী সোনিয়া গান্ধী পেতে পারেন বিরোধী দলীয় নেতার মর্যাদা।
এই জটিল পরিস্থিতিতে সবচে বড় বিপদে পড়বেন লোকসভার স্পিকার। কারণ বিরোধী দলের ফর্মুলা নিয়ে নানা মুনি নানা মত দিয়ে চলেছেন। এমনকি বিদায়ী সরকারের আইনমন্ত্রীও সঠিক ব্যাখ্যা দিতে পারছেন না। এ প্রসঙ্গে প্রচলিত আইনটিও কিছুটা বিভ্রান্তিকর বলে সংবিধান বিশেষজ্ঞদের বরাত দিয়ে ভারতীয় মিডিয়া প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে। লোকসভার সাবেক সেক্রেটারি জেনারেল বলেছেন, এত আইন ঘাটার দরকার পড়ে না। আমি মনে করি ক্ষমতাসীন জোটের বাইরে যে দল সর্বোচ্চ আসন পেয়েছে সেটিই অবশ্যই প্রধান বিরোধী দল হওয়া উচিত। আর সেই দলের সংসদীয় দলের নেতা হবেন প্রধান বিরোধী দলীয় নেতা। প্রধান বিরোধী দল হবার জন্য ‘পাস মার্ক’ সিস্টেম বাতিল করা উচিত বলে তিনি মনে করেন।
১৯৯৮ সালের আগে এজাতীয় পরিস্থিতি সৃষ্টি হবার সম্ভাবনা ছিল না। ‘লিডার অ্যান্ড চিফ হুইফ অব রিকগনাইজড পার্টিজ অ্যান্ড গ্রুপস ইন পার্লামেন্ট অ্যাক্ট’ পাস হয় ১৯৯৮ তে। এর আগে পার্লামেন্টের স্পিকারের একক ক্ষমতা ছিল বিরোধী দল নির্বাচনের এবং বিরোধী দলীয় নেতা ঠিক করার। বিরোধী দলীয় নেতার বেতনও ঠিক করতেন তিনি। যদি দ্বিতীয় স্থানে থাকা দুটি দল একই সংখ্যক আসন পেতো তবে ‘স্ট্যাটাস’ বিবেচনা করে তাদের একটিকে বিরোধী দলের মর্যাদা দিতেন স্পিকার।
কংগ্রেসের শোচনীয় পরাজয়ের পর বিরোধী দল নির্ধারণে এবার ঘাম ছুটে যাবার কারণে তর্ক শুরু হয়েছে এজাতীয় একটি আইন করার কি দরকার ছিল। আইনটি পাসের পক্ষে ব্যাখ্যায় বলা হয়েছে, ভোটারদের কাছে কোন পার্টি কতটা গ্রহণযোগ্যতা পেল তা ভোটের ফলে পরিস্কার হয়। সেই ফলাফলকে সম্মান জানাতে লোকসভায় তাদের আসন, মর্যাদা, বেতন, টেলিফোন, গাড়ি ইত্যাদি সুবিধা বণ্ঠন করতে আইনটি পাস করা হয়। দ্বিতীয় স্থানে থাকা দলটি ৫৪৩ আসনের মধ্যে ৫৫ আসনও পাবে না এমন চিন্তা সম্ভবত আইনপ্রণেতাদের মাথায় আসেনি।
তবে বিশ্লেষকরা বলছেন, আইনে অনেক ফাঁকফোকর থাকে। আপদকালীন সময়ে সেই ফোঁকরগুলো খুঁজে বের করা হয়। দলগতভাবে ইউপিএ জোটকে বিরোধী দলের মর্যাদা দেয়া সম্ভব না হলে এককভাবে কংগ্রেসকে সেটি দেয়ার মতো উপায় স্পিকার নিশ্চয় খুঁজে বের করবেন। কারণ, সফল সংসদীয় গণতন্ত্রের শর্তই হলো কার্যকর বিরোধী দল। পার্লামেন্টে বিরোধী দলনেতা ছাড়া সকল কাজকর্ম চলতে পারে না। কারণ সংসদীয় আইনে এমন অনেক স্থান আছে, যেখানে বিরোধী দলনেতার অনুমোদন প্রয়োজন। লোকসভার সাবেক সেক্রেটারি জেনারেল সুভাষ কাশ্যপ বলেছেন, কোনো একটি দল যদি লোকসভার ১০ শতাংশ আসন পায় তাহলে সেই দলের নেতা বিরোধী দলনেতার স্বীকৃতি পেতে পারেন। নির্বাচন-পরবর্তী কোনো জোটের নেতাকে এটা দেয়া যায় না? বড়জোর তাদের বিরোধী জোটের নেতা বলা যেতে পারে, কিন্তু বিরোধী দলনেতা বলা যাবে না?
তবে এই যুক্তি খণ্ডন করে কংগ্রেসের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, ৫৫ আসনের শর্ত পালন আইনে কোথাও ‘বাধ্যতামূলক’ উল্লেখ করা হয়নি। তাই দ্বিতীয় বৃহত্তম দলের নেতাকেই বিরোধী দলনেতার পদ দেয়া যেতে পারে। স্পিকার ইচ্ছা করলে তা করতে পারেন।
