সুশাসনের অভাবে দুর্নীতি প্রাতিষ্ঠানিক রূপ নিয়েছে

আপডেট : ২৫ মে ২০১৪, ২৩:১৩
অনিয়ম আর দুর্নীতিতে ডুবে আছে স্থানীয় সরকারের প্রতিষ্ঠানগুলো। কেন্দ্রীয় সরকারের নিয়ন্ত্রণ ও সুশাসনের অভাবে স্থানীয় সরকার খাতে দুর্নীতির প্রাতিষ্ঠানিকীকরণ হয়েছে। এখন প্রকল্প ও বিশেষ বরাদ্দ পেতে প্রকল্পভেদে ১ থেকে ১০ শতাংশ ঘুষ দিতে হয়। আবার উন্নয়নমূলক কাজের ক্ষেত্রে স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানে কার্যাদেশ মূল্যের ১০ থেকে ২০ শতাংশ পর্যন্ত ঘুষ দিতে হয়। এছাড়া কার্যাদেশ বিক্রি এবং লজিস্টিক ক্রয়ের কাজ পেতে রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দ ও জনপ্রতিনিধিদেরকে দিতে হয় ১০ থেকে ১৫ শতাংশ কমিশন। ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের (টিআইবি) ‘স্থানীয় সরকার খাত :সুশাসনের চ্যালেঞ্জ ও উত্তরণের উপায়’ শীর্ষক এক গবেষণা প্রতিবেদনে এ তথ্য জানানো হয়েছে। রবিবার রাজধানীর ব্র্যাক সেন্টার ইনে প্রতিবেদনটি প্রকাশ উপলক্ষে আয়োজিত গোলটেবিল আলোচনায় প্রধান অতিথি ছিলেন স্থানীয় সরকার প্রতিমন্ত্রী মশিউর রহমান রাঙ্গা। টিআইবি’র ট্রাস্টি বোর্ডের সদস্য এম হাফিজউদ্দিন খানের সভাপতিত্বে আলোচক হিসাবে বক্তব্য রাখেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের লোকপ্রশাসন বিভাগের অধ্যাপক ড. সালাহউদ্দিন এম আমিনুজ্জামান, স্থানীয় সরকার বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক জারিনা রহমান খান এবং ড. তোফায়েল আহমেদ। অনুষ্ঠান সঞ্চালনা করেন টিআইবি’র নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান। টিআইবি’র ফারহানা রহমান ও মো. রবিউল ইসলামের উপস্থাপিত গবেষণা প্রতিবেদনে বলা হয়, উপজেলা পরিষদ এবং জেলা পরিষদের আইনে সংসদ সদস্যদের পরিষদের উপদেষ্টা করে তাদের পরামর্শ গ্রহণের বিধানের মাধ্যমে প্রতিনিধিদেরকে কেন্দ্রীয় রাজনৈতিক নিয়ন্ত্রণের অধীনে রাখা হয়েছে। যে কারণে স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠান ও সংস্থায় জনবল নিয়োগের ক্ষেত্রে সরকারের নিয়ন্ত্রণ, রাজনৈতিক প্রভাব, স্বজনপ্রীতি, সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের প্রধানের ক্ষমতার প্রভাব, ঘুষ ইত্যাদি অনিয়ম ও দুর্নীতির ঘটনা ঘটছে। স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানের বাজেট কেন্দ্রীয় সরকারের বরাদ্দের ওপর নির্ভরশীল থাকায় প্রতিষ্ঠানের উন্নয়ন কর্মকাণ্ড ব্যাহত হচ্ছে। এজন্য বিভিন্ন প্রকল্প ও বিশেষ বরাদ্দ পাওয়ার জন্য প্রতিষ্ঠানগুলোকে স্থানীয় সরকার বিভাগের উচ্চ পর্যায়ের কর্মকর্তাকে ঘুষ দিতে হয়। গবেষণায় দেখা যায়, স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠান ও সংস্থার নিরীক্ষার ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট নিরীক্ষা কর্মকর্তাদের ঘুষ আদায় ও উপঢৌকন দেয়াসহ নানা ধরনের অনিয়ম ও দুর্নীতির ঘটনা ঘটছে। এ অবস্থায় স্থানীয় সরকার খাতের সুশাসন নিশ্চিত করতে সংসদ সদস্যদের সংশ্লিষ্টতা পরিহারসহ ১৮টি সুপারিশ করেছে টিআইবি। প্রধান অতিথির বক্তব্যে মশিউর রহমান রাঙ্গা বলেন, স্থানীয় সরকারের দুর্নীতি রাতারাতি বন্ধ করা সম্ভব নয়। নির্দিষ্ট করে কোন প্রতিষ্ঠান বা ব্যক্তির বিরুদ্ধে লিখিত অভিযোগ করা হলে তার বিরুদ্ধে যথাযথ ব্যবস্থা নেয়া হবে। তিনি বলেন, বর্তমান সরকার ক্ষমতা বিকেন্দ্রীকরণের মাধ্যমে একটি জনমুখী স্থানীয় সরকার ব্যবস্থা গড়ে তোলার লক্ষ্যে কাজ করছে। এম হাফিজউদ্দিন খান বলেন, জনগণের সেবা নিশ্চিত করার জন্য স্থানীয় সরকার একটি গুরুত্বপূর্ণ খাত। তাই এ খাতে দুর্নীতি ও অনিয়ম বন্ধে সরকারকে কার্যকর ভূমিকা পালন করতে হবে। আলোচনায় অংশ নিয়ে তোফায়েল আহমেদ বলেন, একটি প্রকল্পে মোট বরাদ্দের ৫০ শতাংশ চলে যায় ঘুষে। অনিয়ম আর দুর্নীতির কারণে স্থানীয় সরকার খাতের অনেক প্রকল্প আলোর মুখ দেখে না। এছাড়া স্থানীয় সরকারের বাজেটে আগে শিক্ষা ও কৃষিতে জোর দেয়া হতো। কিন্তু এখন ত্রাণ ও সামাজিক নিরাপত্তা বেষ্টনির জন্য বরাদ্দ দেয়া হচ্ছে। এ খাতে দুর্নীতির সুযোগ বাড়ছে। তবে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের লোকপ্রশাসন বিভাগের অধ্যাপক ড. সালেহউদ্দিন এম আমিনুজ্জামান বলেন, আমরা প্রায়ই স্থানীয় সরকার ব্যবস্থা নিয়ে নেতিবাচক কথা বলি। এর ফলে প্রতিষ্ঠানগুলো আরো দুর্বল হয়ে পড়ে। তিনি বলেন, উপজেলা ও ইউনিয়ন পরিষদের হিসাব রক্ষকের শূন্য পদে নিয়োগ দেয়া গেলে স্থানীয় সরকারের কাজে গুণগত পরিবর্তন আসতে পারে। জারিনা রহমান খান বলেন, স্থানীয় সরকারের যে দুর্নীতির চিত্র টিআইবি’র গবেষণা প্রতিবেদনে উঠে এসেছে তা ঠালাওভাবে সকল উপজেলা ও ইউনিয়ন পরিষদের জন্য প্রযোজ্য নয়। অনেক উপজেলায় ভালো কাজও হচ্ছে। তার মতে, স্থানীয় সরকারের কাজে নাগরিকদের সম্পৃক্ত করা গেলে দুর্নীতি ও অনিয়ম অনেকাংশে কমানো সম্ভব। মুক্ত আলোচনায় ডেমোক্রেসি ওয়াচের নির্বাহী পরিচালক তালেয়া রহমান বলেন, টিআইবি’র প্রতিবেদনে স্থানীয় সরকারের স্বাস্থ্য ও শিক্ষা খাতের চিত্র তুলে ধরার দরকার ছিল। সাবেক সচিব আব্দুল লতিফ মন্ডল বলেন, স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানগুলো নিজেরা আর্থিকভাবে শক্তিশালী হলে সরকারের প্রভাব ও দুর্নীতি অনেকাংশে কমানো সম্ভব। ড. ইফতেখারুজ্জামান বলেন, অনেক প্রকল্প পরিকল্পনা অনুমোদন হওয়ার পরও ক্ষমতাধররা তাদের নির্বাচনী এলাকায় কাজের জন্য চাপ প্রয়োগ করে থাকে, ফলে অনুমোদিত প্রকল্প পরিকল্পনায় পরিবর্তন করতে হয় এবং প্রকল্পের পরিধি বৃদ্ধি পায়। টিআইবি’র গবেষণা প্রতিবেদনে জাতীয় খানা জরিপ ২০১২ এর তথ্য উল্লেখ করে বলা হয়, বিভিন্ন স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠান থেকে সনদ (জন্ম ও মৃত্যু নিবন্ধন, নাগরিকত্ব, প্রত্যয়নপত্র ইত্যাদি) সংগ্রহের ক্ষেত্রে ৩৫ দশমিক ৭ শতাংশ খানা বিভিন্ন ধরনের অনিয়মের শিকার হয়। একইভাবে সামাজিক নিরাপত্তামূলক কর্মসূচিতে অন্তর্ভুক্ত খানাগুলোর ৩৫ দশমিক ৮ শতাংশ বিভিন্ন ধরনের দুর্নীতির শিকার হয়। এছাড়া টিআর ও কাবিখার বরাদ্দ এবং বিলের টাকা ছাড় করতে পিআইও’কে নিয়ম-বহির্ভূত অর্থ দিতে হয়। পণ্য ক্রয় প্রক্রিয়ায় উন্মুক্ত দরপত্র এবং কোটেশন পদ্ধতিতে কাজ পেতে প্রভাবশালী রাজনৈতিক নেতা-কর্মীদের পাশাপাশি মেয়র/চেয়ারম্যান এবং কর্মকর্তা-কর্মচারীদেরকে প্রাপ্ত কাজের মূল্যের ১০ থেকে ১৫ শতাংশ ঘুষ দিতে হয়। একইভাবে কাজের বিল প্রাপ্তির ক্ষেত্রেও কর্মকর্তা-কর্মচারীদের ঘুষ দিতে হয়। স্থানীয় সরকার খাতের বহুমুখী চ্যালেঞ্জ মোকাবেলা এবং এ খাতে সুশাসন নিশ্চিত করার লক্ষ্যে টিআইবি ১৮ দফা সুপারিশ করেছে। এর মধ্যে, সংশ্লিষ্ট আইন সংশোধন করে সংসদ সদস্যদের সম্পৃক্ততা বন্ধ, প্রশাসন এবং স্থানীয় সরকার জনপ্রতিনিধিদের মধ্যে ক্ষমতা ও দায়িত্বের সুষম বণ্টন, যেসব স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানে নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়নি সেসব প্রতিষ্ঠানে দ্রুত নির্বাচন, কর্মকর্তা-কর্মচারীদের ভাল কাজের জন্য প্রণোদনা এবং দুর্নীতির জন্য তদন্ত সাপেক্ষে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ উল্লেখযোগ্য।