পবিত্র শবে মেরাজ আজ

আপডেট : ২৫ মে ২০১৪, ২৩:১৫
আজ পবিত্র শবে মেরাজ। অসামান্য রজনী এই লাইলাতুল মেরাজ। এ রাতে আমাদের প্রিয় নবী হযরত মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহে ওয়া সাল্লাম সত্তর হাজার নূরের পর্দা পেরিয়ে আরশে আজিমে মহান আল্লাহতায়ালার দিদার লাভ করেন এবং পাঁচ ওয়াক্ত নামাজের হুকুম নিয়ে দুনিয়াতে প্রত্যাবর্তন করেন। তিনি অবলোকন করেন সৃষ্টি জগতের সমস্ত কিছুর অপার রহস্য। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহে ওয়া সাল্লাম এর জীবনের সবচেয়ে আলোড়ন সৃষ্টিকারী ঘটনা ‘মিরাজ’। মিরাজ ইসলামের ইতিহাসে এমনকি সমস্ত নবুওয়াতের ইতিহাসেও এক অবিস্মরণীয় ঘটনা। কারণ সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ মহামানব ও রাসূল হযরত মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহে ওয়া সাল্লাম ছাড়া অন্য কোন নবী এই পরম সৌভাগ্য লাভ করতে পারেননি। এ কারণেই তিনি সর্ব শ্রেষ্ঠ নবী। এ মিরাজ রজনীতেই মানব জাতির শ্রেষ্ঠ ইবাদত পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ ফরয হয়। ধর্মীয় ভাবগাম্ভীর্য ও যথাযথ মর্যাদায় মুসলিম জাহানের সঙ্গে এদেশের ধর্মপ্রাণ মুসলমানরাও আজ কোরআনখানি, জিকির আসকার, ওয়াজ মাহফিল, দোয়া-দুরুদ পাঠ ও বিশেষ মোনাজাতের মাধ্যমে পবিত্র শবে মেরাজ পালন করবেন। মিরাজ শব্দটি আরবী, অর্থ ঊর্ধারোহণ। ঊর্ধলোকে পরিভ্রমণ।পারিভাষিক অর্থে নবুওয়াতের একাদশ সালের ২৭ রজবের বিশেষ রাতের শেষ প্রহরে হযরত মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহে ওয়া সাল্লাম জিব্রাঈলের (আ.) সাথে আল্লাহর নির্দেশে তার খাস রহমতে বায়তুল্লাহ হতে বায়তুল মুক্বাদ্দাস পর্যন্ত ‘বোরাক্বে’ ভ্রমণ, অতঃপর সেখান থেকে অলৌকিক সিঁড়ির মাধ্যমে সপ্ত আসমান পেরিয়ে আরশে আল্লাহর সান্নিধ্যে গমন ও পুনরায় বায়তুল মুক্বাদ্দাস হয়ে বোরাক্বে আরোহণ করে প্রভাতের আগেই মক্কায় নিজ গৃহে প্রত্যাবর্তনের ঘটনাকে ‘মিরাজ’ বলা হয়। বায়তুল মুকাদ্দাসে জামায়াতে ইমামতি করে ঊর্ধ্বলোকে গমন করেন। হাসান রহ.-এর বর্ণনায় আছে, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহে ওয়া সাল্লাম বলেন, ‘আমি হিজরে হাতিম; কাবার বহিরাংশে ঘুমিয়ে ছিলাম। এমতাবস্থায় জিবরিল আ. আসেন, আমাকে পায়ে খোঁচা দিয়ে জাগিয়ে তোলেন, আমি উঠে বসি কিন্তু কাউকে না দেখে পুনরায় শুয়ে পড়ি। তৃতীয় বার সে আমার বাহু ধরে, আমি তার সাথে দাঁড়িয়ে যাই। অতঃপর আমাকে মসজিদের দরজার কাছে নিয়ে আসে, সেখানে লক্ষ্য করি, অদ্ভুত আকৃতির একটি প্রাণী, যাকে গাধাও বলা যায় না আবার তা ঘোড়ার মতও না। উরুতে বিশাল দুটি পাখা, যার মাধ্যমে সে পায়ে আঘাত করে। এর নাম বোরাক। আগের যুগের নবীগণ এর উপরেই আরোহণ করতেন। আমাকে তার উপর আরোহণ করাল। জিবরিল আমিনের সাহচর্যে আমি আসমান-জমিনের বিচিত্র নিদর্শন দেখতে দেখতে বায়তুল মাকদিসে পৌঁছি। সেখানে অবতরণ করে জিবরিল দরজার আংটার সাথে বোরাক বাঁধেন, আমি লক্ষ্য করি, ইবরাহিম, মুসা ও ইসা আ.দের সাথে আরো অনেক নবীগণ একত্রিত হয়েছেন সেখানে। মুসা আ. এর আকৃতি একটি উপমাযোগ্য দেহের ন্যায়। শানুয়া বংশের পুরুষদের মত অনেকটা। কোঁকড়ানো চুল, হালকা গড়ন, লম্বা শরীর। ইসা আ. এর আকৃতি মাঝারি গড়ন, ঝুলন্ত সোজা চুল, চেহারা সৌন্দর্য তিলকে ভর্তি। মনে হচ্ছিল তিনি গোসলখানা হতে বের হয়েছেন, পানি পড়ছে মাথা হতে, প্রায় উরওয়া ইবনে মাসউদ সাকাফির মত। ইবরাহিমের আকৃতি আমার মত, আমি-ই তার সাথে সর্বাধিক সাদৃশ্যপূর্ণ। অত:পর আমার সামনে দুটি পেয়ালা : একটি মদের অপরটি দুধের পেশ করা হয়। আমাকে বলা হল : যেটা ইচ্ছে পান করেন, আমি দুধের পেয়ালা হাতে নেই এবং পান করি। আমাকে বলা হয়, সঠিক সিদ্ধান্ত নিয়েছেন, যদি আপনি মদের পেয়ালা হাতে নিতেন, পান করতেন, আপনার উম্মত গোমরাহ হয়ে যেত। অপর একটি বর্ণনায় পানির তৃতীয় আরেকটি পেয়ালার উল্লেখও পাওয়া যায়। (দ্র : ইবনে হিশাম, বোখারি, মুসলিম) অতঃপর তিনি প্রথম আসমানে আরোহণ করেন, রাসূলের জন্য দরজা খুলতে বলা হয়, দরজা খুলে দেয়া হয়। সেখানে আদম আ. এর সাক্ষাত্ লাভ করেন। তার ডান পাশে জান্নাতিদের রুহ এবং বাম পাশে জাহান্নামিদের রুহ প্রত্যক্ষ করেন। অতঃপর দ্বিতীয় আসমানে আরোহণ করেন, সেখানে ইয়াহইয়া ইবনে জাকারিয়া ও তার খালাতো ভাই ইসা ইবনে মারইয়ামের সাথে সাক্ষাত্ হয়। অতঃপর তৃতীয় আসমানে আরোহণ করেন, সেখানে ইউসূফ আ. এর সাথে সাক্ষাত্ হয়। অতঃপর চতুর্থ আসমানে আরোহণ করেন, সেখানে ইদরিস আ. এর সাথে সাক্ষাত্ হয়। অতঃপর পঞ্চম আসমানে আরোহণ করেন, সেখানে মূসা আ. এর ভাই হারুন ইবনে ইমরানের সাথে সাক্ষাত্ হয়। অতঃপর ষষ্ঠ আসমানে আরোহণ করেন, সেখানে মূসা ইবনে ইমরানের সাথে সাক্ষাত্ হয়। রাসূল তাঁর থেকে বিদায় নিলে তিনি কেঁদে ফেলেন। জিজ্ঞাসা করা হল, কি জন্য কাঁদেন? তিনি বলেন, এ জন্য কাঁদি, আমার পরে একজন যুবক প্রেরণ করা হয়েছে, তার উম্মত আমার উম্মতের চেয়ে বেশি জান্নাতে প্রবেশ করবে। অতঃপর সপ্তম আসমানে আরোহণ করেন, সেখানে ইবরাহিম আ. এর সাথে সাক্ষাত্ হয়। সকলেই তাঁকে অভিবাদন, স্বাগত, অভ্যর্থনা জ্ঞাপন করেন, তাঁর নবুয়তের স্বীকারোক্তি প্রদান করেন। অতঃপর সর্বশেষ সীমা : সিদরাতুল মুন্তাহায় পৌঁছেন, যার ফল যেন হাজার হাজার কলসি, পাতা হাতির কানের মত, যা স্বর্ণের পতঙ্গ, আলোকোজ্জ্বল, বিচিত্র রং বেষ্টিত। যে সৌন্দর্য বর্ণনা করার সাধ্য কারো নেই। অতঃপর বায়তুল মামুরে আরোহণ করেন, যেখানে প্রতি দিন সত্তর হাজার ফেরেশতা প্রবেশ করে, যাদের কেউই কিয়ামতের পূর্বে পুনরায় প্রবেশ করার সুযোগ পাবে না। অতঃপর জান্নাতে প্রবেশ করেন, যার ভেতর স্বর্ণের রশি, কস্তুরীর মাটি প্রত্যক্ষ করেন। অতঃপর আরো উপরে উঠে কলমের আওয়াজ শুনতে পান। অতঃপর আল্লাহ তা‘আলার নিকটবর্তী হন, ধনুক বা তার চেয়ে কম দূরত্বের ব্যবধানে। অতঃপর তাঁর প্রতি, যা ইচ্ছে ছিল, ওহি করেন। পঞ্চাশ ওয়াক্ত নামাজ ফরজ করা হয়। ফেরার পথে মূসা আ. এর পরামর্শে পুনরায় আল্লাহর দরবারে পুনঃ পুনঃ গিয়ে শেষাবধি পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ নিয়ে আসেন। দূরে এসে একটি ঘোষণা শুনতে পান- আমার ধার্যকৃত নিশ্চিত সিদ্ধান্ত চূড়ান্ত করেছি, আমার বান্দার জন্য সহজ করে দিয়েছি। (দ্র : যাদুল মায়াদ ২ : ৪৭ ও ৪৮, রহিকুল মাখতুম: পৃ: ১৬০, ইবনে হিশাম:১/২৪২-২৪৬) কয়েকটি সূত্রে বর্ণিত, এ সফরের প্রাক্কালে তাঁর বক্ষ মোবারক জমজমের পানি দ্বারা বিধৌত করে নূর ও প্রজ্ঞায় পূর্ণ করা হয়। মিরাজ সম্পর্কে আল্লাহ পবিত্র কুরআন শরীফে বলেন-“পরম পবিত্র ও মহিমাময় সত্তা তিনি, যিনি তাঁর স্বীয় বান্দাকে রাতের বেলায় মসজিদে হারাম থেকে মসজিদে আকসা পর্যন্ত ভ্রমণ করালেন, যার চতুর্দিকে আমার রহমত ঘিরে রেখেছেন-যেন আমি তাঁকে কুদরতের কিছু নিদর্শন দেখিয়ে দেই। তিনিই সবকিছু শোনেন ও দেখেন । (বনী ইসরাঈল-১)। এই রাত্রিতে উম্মতে মুহাম্মাদীর প্রতি ৫ ওয়াক্তের নামাজ ফরজ হয়। ফলে এটা খুবই ফজিলতের রাত্রি। অতএব, এই রাত্রিতে যতদূর সম্ভব জেগে নফল নামাজ, জিকির-আযকার, কুরআন তিলওয়াত ও দরুদ শরীফ ইত্যাদি পাঠ করা এবং নফল নিয়তে দিবা ভাগে রোজা রাখা ভাল, এগুলো ব্যতীত এই রাত্রে অন্য কোন প্রকার শরীয়ত বিরোধী রুসম-রেওয়াজে লিপ্ত হওয়া যাবে না। শবে মেরাজের ইবাদত সম্পর্কে হাদিস শরীফে উল্লেখ রয়েছে হযরত আবু হুরায়রা (রা.) ও সালমান ফারসী (রা.) থেকে বর্ণিত, নিঃসন্দেহে রজব মাসে এমন একটি মহান দিন ও রাত রয়েছে, কোন মোমিন যদি ঐদিনে রোযা রাখে ও রাতে নামাজে মশগুল থাকে, তার প্রতিদান হবে যেন সে একশ’ বছর দিনে নফল রোযা ও রাতে নফল নামাজ পড়েছে। সেই মহান রাতটি হলো রজবের সাতাশতম রাত। (গুনিয়াতুত্বালিবীন)। তবে এ রাতে আতশবাজি, আলোক সজ্জা ইত্যাদি সবই বিদ‘আতের পর্যায়ভুক্ত বলে মত দেন উলামারা।