পুরান ঢাকায় পানি সংকট চরম আকার ধারণ করেছে। কোন কোন স্থানে পানিতে দুর্গন্ধ। ঢাকা ওয়াসা নগরীতে পানি সরবরাহ স্বাভাবিক রাখার কথা বললেও বাস্তব চিত্র সম্পূর্ণ আলাদা। রাজধানীতে প্রতিদিন ২২৫ কোটি লিটার পানির চাহিদা থাকলেও সরবরাহ করা হচ্ছে ২০০ থেকে ২০৫ কোটি লিটার পানি। ঘাটতি রয়েছে প্রায় ২০ কোটি লিটার। এই সুযোগে পানি বিক্রির রমরমা বাণিজ্য চলছে। নগরবাসীকে জিম্মি করে হাতিয়ে নেয়া হচ্ছে কোটি কোটি টাকা।
পুরান ঢাকার নবাবপুর রোড, নবেন্দ্রনাথ বসাক লেন, বংশাল রোড, রথখোলা, ভিতরবাড়ি লেন, মোগলটুলী এলাকায় দুই মাস ধরে তীব্র পানি সংকট চলছে। এক সপ্তাহ ধরে এসব এলাকায় ওয়াসার পানি সরবরাহ সম্পূর্ণ বন্ধ রয়েছে। রাজধানীর মাদারটেক ও গোড়ান এলাকায়ও পানি সংকট চলছে। কেনা পানিতে কোন মতে চালিয়ে নিতে হচ্ছে জীবন। কোন কোন ক্ষেত্রে টাকা দিয়েও পানি মিলছে না। আশপাশের ওয়াসার পাম্পগুলোতে পানি সংগ্রহের লাইন ক্রমশ দীর্ঘ হচ্ছে।
পানি সংকট ও পানিতে দুর্গন্ধ দেখা দিয়েছে সূত্রাপুর, সদরঘাট, ইসলামপুর, বংশাল, জয়কালী মন্দির এলাকা, মিটফোর্ড রোড, জুরাইন, শ্যামপুর, ধোলাইখাল, ধোলাইপাড়, পোস্তগোলা, টিপু সুলতান রোড, কলুটোলা, মৈশুন্দি, ওয়ারী, বনগ্রাম রোড, গোপীবাগ, অভয়দাস লেন, জিয়া মাঠ, মুরাদ নগর, ঠাটারীবাজার, চকবাজার, নয়াবাজার, মগবাজার, শাখারীবাজার, ফরিদাবাদ, আর্শিনগেট, আলমগঞ্জলেন, দীননাথসেন লেন, আইজিগেট, ঢালকানগর লেন, গেন্ডারিয়া, নয়া বাজার এলাকায়।
ভুক্তভোগিরা জানান, দুর্গন্ধযুক্ত পানি ব্যবহারের ফলে পেটের পীড়া ও শরীরে ছোট ছোট দানার সৃষ্টি হচ্ছে। পরবর্তীতে এসব দানা থেকে খোঁস-পাচরার সৃষ্টি হচ্ছে।
৪৯ নবেন্দ্রনাথ বসাক লেনের বাসিন্দা খন্দকার মুশতাকুর রহমান ইত্তেফাককে বলেন, কয়েক হাজার পরিবার পানির কষ্টে রয়েছে। ওয়াসার প্রতি গাড়ি পানির নির্ধারিত মূল্য ৫০০ টাকা হলেও এক শ্রেণীর অসাধু কর্মচারী-কর্মকর্তা প্রতি গাড়ি পানির জন্য আদায় করছেন ১২০০ থেকে ১৫০০ টাকা। এ ব্যাপারে অভিযোগ করেও কোন সুফল পাওয়া যাচ্ছে না। এ ব্যাপারে ওয়াসার জোনাল অফিসের সাথে যোগাযোগ করা হলে জানানো হয়, নবাবপুর রোড, নবেন্দ্রনাথ বসাক লেন ও বংশাল এলাকায় ওয়াসার পাইপ লাইনে সমস্যার সৃষ্টি হয়েছে। সত্ত্বর সংকট সমাধানের চেষ্টা চলছে। ওয়াসার পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, অকেজো টিউবওয়েল, পুরনো অধিকাংশ টিউবওয়েলের উত্পাদন ক্ষমতা হ্রাস, জেনারেটর ও বৈদ্যুতিক ডুয়েল ফেইজ ব্যবহার না করা ও লোডশেডিংসহ নানা কারণে পানি সংকট সৃষ্টি হচ্ছে।
এদিকে ভুক্তভোগী ও পানি বিশেষজ্ঞরা বলছেন ভিন্ন কথা। তারা নগরীর পানি সংকটের নেপথ্য কারণ হিসাবে যথাযথ মনিটরিংয়ের অভাবকে দায়ী করেছেন। এ ছাড়া কৃত্রিম পানি সংকট সৃষ্টি করে ওয়াসার এক শ্রেণীর অসাধু কর্মচারী- কর্মকর্তা রমরমা পানি বাণিজ্য চালিয়ে যাচ্ছে।
ওয়াসার নির্ভরযোগ্য একটি সূত্র জানায়, নগরবাসীর পানির চাহিদা মেটাতে ঢাকা ওয়াসার যথেষ্ট সামর্থ্য রয়েছে। প্রতিদিন ওয়াসা যে পরিমাণ পানি উত্তোলন করে তা দিয়ে নগরবাসীর পানির চাহিদা মেটানো সম্ভব। প্রতি বছর নানা প্রকল্পের কথা বলে শত শত কোটি টাকা হাতিয়ে নিচ্ছে একটি সংঘবদ্ধ চক্র।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে ওয়াসার ব্যবস্থাপনা পরিচালক প্রকৌশলী ড. তাকসিম এ খান ইত্তেফাককে বলেন, পানির গাড়ির এক শ্রেণীর চালক এই দুর্নীতির সাথে জড়িত থাকতে পারে। যেসব এলাকায় পানির সংকট সৃষ্টি হয় সেখানে ওয়াসার নির্ধারিত মূল্যের অধিকহারে পানি বিক্রির অভিযোগ পাওয়া গেছে। এদের বিরুদ্ধে অভিযোগ পাওয়ামাত্র ব্যবস্থা নেয়ার আশ্বাস দেন তিনি।
বিশিষ্ট পানি বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক ড. আইনুন নিশাত ইত্তেফাককে বলেন, পানির মূল উত্স নষ্ট হওয়ায় পানি সংকট দিন দিন ঘনীভূত হচ্ছে। তিনি বুড়িগঙ্গা, শীতলক্ষ্যা, বালু, তুরাগসহ রাজধানীর চারপাশের নদীগুলো রক্ষা করে পানি সংকট মোকাবেলা করার জন্য সরকারের প্রতি আহবান জানান।
ওয়াসার নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা বলেন, পানি সংকটের জন্য ঢালাওভাবে বিদ্যুতের মাত্রাতিরিক্ত লোডশেডিংকে ওয়াসা দায়ী করে। কিন্তু নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুত্ সরবরাহ নিশ্চিত করতে পাম্প হাউজগুলোতে ৪৯০টি জেনারেটর বসানো হয়েছে। প্রতি মাসে জেনারেটর চালনা বাবদ তেল খরচ দেখানো হচ্ছে ৩ থেকে ৪ কোটি টাকা। অথচ বিদ্যুত্ চলে গেলে সিংহভাগ জেনারেটরই বন্ধ রাখা হয়। প্রতি মাসে কোটি কোটি টাকার তেল চুরি হচ্ছে। এসব অনিয়ম দূর করা হলে নগরীর পানি সংকট নিরসন সম্ভব বলে তিনি দাবি করেন। তিনি বলেন, নগরীতে পানি সংকটের জন্য ওয়াসার সিবিএ নেতারাও দায়ী। তারা পানি বিক্রি ও জেনারেটরের তেল চুরিতে অধস্তন কর্মচারীদের ইন্ধন যোগাচ্ছেন।
ওয়াসার চেয়ারম্যান প্রকৌশলী মো.রহমতুল্লা ইত্তেফাককে বলেন, পানি চুরি, তেল চুরি ইত্যাদি পুরনো ব্যাপার। ওয়াসার ৩০ শতাংশ পানি সিস্টেম লস হচ্ছে বলে তিনি জানান। তবে কোথাও পানি সরবরাহ একেবারে বন্ধ থাকার কথা নয়। এসব বিষয় গুরুত্ব সহকারে খতিয়ে দেখা হচ্ছে বলে তিনি জানান।
