বিদেশে চাহিদা বাড়ছে নকশী কাঁথার

আপডেট : ২৬ মে ২০১৪, ২৩:০২
নকশী কাঁথা। দেশীয় ঐতিহ্য। কারুশিল্পীদের অনবদ্য সৃষ্টি। এই কাঁথা নিয়ে লেখা হয়েছে কাব্য, গাঁথা ও রচনা। বংশানুক্রমে স্মারক চিহ হিসেবেও সংরক্ষণ করা হয়। শৌখিন পণ্য হিসেবে বাণিজ্যিক ভিত্তিতে সেলাই হচ্ছে। ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্পে পরিণত হয়েছে এই কাঁথাশিল্প। আর ভাগ্য বদলে দিয়েছে অনেকের। দেশের চাহিদা মিটিয়ে আন্তর্জাতিক বাজারেও প্রবেশ করেছে এই কাঁথা। বাংলাদেশ রফতানি উন্নয়ন ব্যুরোর (ইপিবি) উপ-পরিচালক জাকির হোসেন বলেন, জাপানে নকশী কাঁথার চাহিদা সবচেয়ে বেশি। এছাড়া আমেরিকা, ভারত, নেপাল, শ্রীলঙ্কা, সুইডেন, নরওয়ে, জার্মানি, ইতালিসহ বিশ্বের উন্নত দেশগুলোতে ছড়িয়ে পড়ছে এই কাঁথা। জানা গেছে, চলতি বছরের অক্টোবরে আন্তর্জাতিক টেলিকমিউনিকেশন ইউনিয়ন (আইটিইউ) কাউন্সিলর পদে নির্বাচনে অংশ নিচ্ছে বাংলাদেশ। এতে প্রচারণার অংশ হিসেবে প্রায় দেড় হাজার নকশী কাঁথা উপহার দেয়া হবে আইটিইউর ১৯৩ দেশের সদস্যদের। জুনে এসব কাঁথা উপহার হিসেবে পাঠানো হবে সুইজারল্যান্ডের জেনেভায়। তাই গাঁয়ের বধূরা এখন ঘরে বসে নেই। তারা বাণিজ্যিকভাবে নকশী কাঁথা তৈরি করছেন। পুরাতন কাপড় ও সুতোর পরিবর্তে ব্যবহার করছেন নতুন লালসালু কিংবা কালো কাপড়। এছাড়া বিদেশি সিল্কি পেটি সুতোও ব্যবহার করা হয়। জানা যায়, একসময় পরিবারের প্রয়োজনে মেয়েরা নকশী কাঁথা বানাতো। এখনো রাজশাহী, রংপুর, বগুড়া, পাবনা, দিনাজপুর, কুষ্টিয়া, ফরিদপুর, যশোর এবং ঢাকা, চট্টগ্রাম, ময়মনসিংহ কুমিল্লা ও সিলেট অঞ্চলে তৈরি করা হয় এসব কাঁথা। বিভিন্ন অঞ্চলে ফোঁড়, পাইড় ও নকশা অনুযায়ী নকশী কাঁথা ভিন্ন নামেও পরিচিত। এগুলো হলো- বরকা ফোঁড়, তেজবি ফোঁড়, বাঁশপাতা ফোঁড়, কইতা ও বিছা ফোঁড় ইত্যাদি। পাড়ের নামে তোলো পাইড়, তাস পাইড়, নয়নলতা, নারিকেল পাতা ও নৌকা বিলাসসহ আরও অনেক নামের নকশী কাঁথা রয়েছে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শান্তি ও সংঘর্ষ বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক মো. রফিকুল ইসলাম। বেড়ে উঠেছেন যশোরের চৌগাছায়। ছোটবেলা দেখেছেন মাকে নকশী কাঁথা সেলাই করতে। এ প্রসঙ্গে তিনি বলেন, আজও কাঁথার যথেষ্ট কদর রয়েছে। ব্যবহার অনুযায়ী এগুলোর নামেও ছিল ভিন্নতা। শীতের জন্য লেপকাঁথা, বালিশে ব্যবহারের জন্য বয়তন, নামাজের জন্য জায়নামাজ কাঁথা, বসার জন্য আসন কাঁথা এবং খাবারের জন্য দস্তরখানা। বিয়েতে কাঁথা উপহার হিসেবে দেয়ার প্রচলন ছিল। এ প্রচলন আজও একেবারে ফুরিয়ে যায়নি। নকশী কাঁথা নিয়ে লেখা হয়েছে কাব্য, গাঁথা ও রচনা। কবি চন্দ াবতী তাঁর রামায়ণ কাব্যে সীতার অন্যান্য গুণের সাথে কাঁথা সেলাইয়ের কথা বলেছেন এভাবে, ‘সীতার গুণের কথা কি কহিব আর, কন্থায় আঁকিল কন্যা চান সুরুজ পাহাড়। আরও যে, আঁকিল কন্যা হাসা আর হাসি। চাইরো পাড়ে আঁকে কইন্যা পুষ্প রাশি রাশি’। এছাড়া পল্লীকবি জসীমউদ্দীনের অনবদ্য কাব্যগ্রন্থ ‘নকশী কাঁথার মাঠ’। জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের শিক্ষক রাজীব মীর। নন্দনতত্ত্ব পড়িয়েছেন অনেক বছর ধরে। নকশী কাঁথা নিয়ে এই শিক্ষক বলেন, পল্লী রমণীদের শিল্পী মনের এক অপূর্ব অভিব্যক্তি যেন নকশী কাঁথা। বিভিন্ন ধরনের কাপড়ের আস্তরণের উপর সূচ আর সুতোয় একে একে ফুটে উঠে আম, মাছ, খেজুর গাছ, পাখি, পাল্কি, লাঙ্গল, নৌকা, হাতি, ফুল, লতাপাতা, ঘোড়া, চাঁদ-তারা, রাজ-রাজার জীবনকাহিনী, কল্পনার পরী, যুদ্ধ-বিগ্রহ, নর-নারীর প্রেম ভালোবাসা এবং একই সাথে গ্রামীণ জীবনের অনেক কিছু। বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয়ের ইংরেজি বিভাগের শিক্ষক মো. আরিফ হোসেন বলেন, ১৯২৯ সালে জসীমউদ্দীনের ‘নকশী কাঁথার মাঠ’ কাব্যগ্রন্থটি প্রকাশের পর বাংলা ভাষায় নকশী কাঁথা শব্দটির ব্যাপক ব্যবহার শুরু হয়। কাঁথার ব্যবহার বহুবিধ। বিছানা হিসেবে এবং অল্প শীতে গায়ে দেয়ার চাদর হিসেবে কাঁথার ব্যবহার অধিক। রংপুরের পীরগঞ্জ উপজেলার সালেহা বেগম। নকশী কাঁথা তৈরি করে দারিদ্র্যকে জয় করেছেন তিনি। বাণিজ্যিকভাবে নকশী কাঁথা সেলাই করে সংসারে স্বাচ্ছন্দ্য ফিরিয়ে এনেছেন। পাশাপাশি অনেক নারীকে কাঁথা সেলাই শিখিয়ে স্বাবলম্বী করে তুলেছেন। সালেহা বলেন, ৬ হাত বাই সাড়ে ৫ হাতের একটি উন্নতমানের নকশী কাঁথা সেলাই করতে বিভিন্ন রঙের সুতা লাগে আধা কেজি, কাপড় ২০ গজ। প্রতি কেজি সুতা ৬০০ টাকা ও প্রতি গজ কাপড় ৮০ টাকা দরে কিনতে হয়। একটি কাঁথা তৈরি করতে প্রতিজনের সময় লাগে ১০ থেকে ১২ দিন। আর মজুরি পায় ২ হাজার ৫০০ টাকা। শুনেছি একটি কাঁথা ঢাকায় ৬ হাজার টাকারও বেশি দামে বিক্রি হয়। আইরিন বেগম। মাত্র ৫ হাজার টাকা পুঁজি নিয়ে নকশী কাঁথার ব্যবসা শুরু করেন। বাড়ি চাঁপাইনবাবগঞ্জে। ২০০২ সালে ব্যবসায় নামেন তিনি। এখন তার প্রতিষ্ঠানে কাজ করছেন নানা বয়সী অন্তত ৮ থেকে ৯ হাজার নারী পুরুষ। নানা চড়াই উতরাই পেরিয়ে ১০ বছরের ব্যবধানে তিনি শ্রমিকদের পারিশ্রমিকই দেন বছরে তিন থেকে চার কোটি টাকা।