সাড়ে ৪৫ হাজার কোটি টাকা দেবে জাপান

আপডেট : ২৬ মে ২০১৪, ২৩:০৬
জাপান বাংলাদেশকে চলতি বছর থেকে সাড়ে ৪৫ হাজার কোটি টাকার সহায়তা দেয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে। বিভিন্ন উন্নয়ন প্রকল্পের যথাযথ ও সুষ্ঠু বাস্তবায়নের জন্য এই সহায়তা দেয়া হচ্ছে। গতকাল সোমবার জাপান সফররত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ও জাপানের প্রধানমন্ত্রী শিনজো আবের মধ্যকার দ্বিপাক্ষিক বৈঠকে এই সিদ্ধান্ত হয়। টোকিওতে জাপানের প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে স্থানীয় সময় বিকালে দুই প্রধানমন্ত্রীর শীর্ষ বৈঠকের পর শেখ হাসিনা ও শিনজো আবের যৌথ সাংবাদিক সম্মেলনে এ কথা বলা হয়। ঢাকায় প্রাপ্ত খবরে জানা যায়, শীর্ষ বৈঠকে সিদ্ধান্ত অনুযায়ী বাংলাদেশ জাপানি মুদ্রায় ৬শ’ বিলিয়ন জাপানি ইয়েন বা প্রায় ছয় বিলিয়ন মার্কিন ডলার সহায়তা পাবে। বাংলাদেশি মুদ্রায় এর পরিমাণ হবে ৪৫ হাজার ৬৭২ কোটি টাকা। আগামী চার বছরে বাংলাদেশ সরকারের গৃহিত কয়েকটি বড় অবকাঠামো প্রকল্পে এই অর্থ ব্যয় হবে। প্রকল্পগুলো হচ্ছে গঙ্গা ব্যারেজ নির্মাণ, যমুনা নদীর নীচ দিয়ে বহুমুখী টানেল নির্মাণ, নতুন একটি পরমাণু বিদ্যুত্ কেন্দ্র নির্মাণ, বঙ্গবন্ধু সেতুর পাশে নতুন একটি রেল সেতু নির্মাণ, রাজধানীর চারপাশে নদীগুলোর পুনরুজ্জীবন, ইস্টার্ন বাইপাস নির্মাণ, কালনায় সেতুসহ মাওয়া থেকে যশোর পর্যন্ত সড়ক নির্মাণ প্রভৃতি। দুই প্রধানমন্ত্রী বৈঠকে দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক আরো গভীর করার লক্ষ্যে সার্বিক অংশীদারিত্ব প্রতিষ্ঠায় বাংলাদেশ ও জাপানের মধ্যে ঐকমত্য হয়। শীর্ষ বৈঠক শেষে সাংবাদিক সম্মেলনে শেখ হাসিনা বলেন, জাপানের প্রধানমন্ত্রী বে অব বেঙ্গল ইন্ডাস্ট্রিয়াল গ্রোথ বেল্ট (বিআইজি-বি) ধারণার বিকাশে তার আগ্রহ প্রকাশ করেন। তিনি বলেন, এই প্রতিশ্রুতির জন্য আমি জাপানের প্রধানমন্ত্রী আবে ও তার সরকারের প্রতি গভীর কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করছি। পাঁচটি গুরুত্বপূর্ণ প্রকল্প বাস্তবায়নে ৩৫তম ওডিএ ঋণ প্যাকেজ অনুমোদনের জন্য বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী জাপান সরকারকে ধন্যবাদ জানান। তিনি বলেন, এটি বাংলাদেশের আর্থ-সামাজিক উন্নয়নে গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব ফেলবে। শেখ হাসিনা বলেন, শিনজো আবের সঙ্গে আনুষ্ঠানিক আলোচনায় তারা অর্থনৈতিক সহযোগিতাসহ দ্বিপক্ষীয় প্রায় সকল বিষয় নিয়ে কথা বলেছেন। আলোচনা গঠনমূলক হওয়ায় তিনি সন্তোষ প্রকাশ করেন। তিনি জাপানি প্রধানমন্ত্রী আবে ও মাদাম আবেকে শিগগিরই বাংলাদেশ সফরের আমন্ত্রণ জানান। তিনি বলেন, ‘বাংলাদেশের জনগণ, আমার সরকার এবং আমি ঢাকায় তাদের স্বাগত জানাতে অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করবো।’ জাপানের প্রধানমন্ত্রী শিনজো আবে সাংবাদিক সম্মেলনে বলেন, ঢাকা ও টোকিওর সম্পর্ক এখন থেকে সুদৃঢ় অংশীদারিত্বমূলক সম্পর্কে রুপান্তরিত হবে। বাংলাদেশ ও এর জনগণের উন্নয়নে জাপান পাশে থাকবে। ঢাকায় একটি আন্তর্জাতিক শান্তিকেন্দ্র প্রতিষ্ঠায় আমরা সহায়তা দেব। বাংলাদেশে পরমাণু বিদ্যুতের শান্তিপূর্ণ ব্যবহারে দুই দেশের বিশেষজ্ঞরা এক সঙ্গে কাজ করবে। সম্রাটকে বাংলাদেশ সফরের আমন্ত্রণ প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা টোকিওর ইম্পেরিয়াল প্রাসাদে জাপানের সম্রাট আকিহিতোর সঙ্গে সাক্ষাত্ করে তাকে সুবিধাজনক সময়ে বাংলাদেশ সফরের আমন্ত্রণ জানিয়েছেন। জাপানের স্থানীয় সময় বিকালে প্রধানমন্ত্রী তার সঙ্গে সাক্ষাত্ করে এ আমন্ত্রণ জানান। প্রধানমন্ত্রী জাপানের সম্রাট ও সম্রাজ্ঞীকে তাদের পূর্ববর্তী সফরের পর এ দেশের অগ্রগতি দেখতে সফরের আমন্ত্রণ জানান। ইম্পেরিয়াল প্রাসাদে প্রধানমন্ত্রীর আগমনে সম্রাট আকিহিতো তাকে অভিনন্দন জানান। প্রধানমন্ত্রী জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ১৯৭৩ সালের জাপান সফর এবং জাপানের সম্রাট ও সম্রাজ্ঞীর ১৯৭৫ সালে বাংলাদেশে সৌহার্দপূর্ণ সফরের কথা স্মরণ করেন, তখন আকিহিতো ক্রাউন প্রিন্স ছিলেন। প্রধানমন্ত্রী তার আগের সফরের সময়ে সম্রাটের সঙ্গে সাক্ষাত্ করার কথাও এ সময় স্মরণ করেন। সম্রাট বাংলাদেশের অগ্রগতি সম্পর্কে খোঁজ-খবর নেন। প্রধানমন্ত্রী বিভিন্ন ক্ষেত্রে সাফল্যের কথা উল্লেখ করেন, বিশেষ করে আর্থসামাজিক ও দারিদ্র বিমোচন ক্ষেত্রে সাফল্যের কথা তুলে ধরেন। সম্রাট আকিহিতো দারিদ্র্য মোকাবেলায় শেখ হাসিনা সরকারের গৃহীত নানা কৌশলের প্রতি সমর্থন ও আগ্রহ প্রকাশ করেন। প্রধানমন্ত্রী বাংলাদেশের খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণতা অর্জন ও কৃষি যান্ত্রিকীকরণের জন্য গৃহীত বিভিন্ন কৌশলের কথা সবিস্তারে বর্ণনা করেন। স্বাধীনতার পর থেকে বাংলাদেশের উন্নয়নে জাপানের সহায়তার কথা স্মরণ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, বাংলাদেশে আরো জাপানি বিনিয়োগ প্রয়োজন। এর আগে প্রধানমন্ত্রী ইম্পেরিয়াল প্রাসাদে পৌঁছলে প্রাসাদের হাউসহোল্ড নোবুতাকি ওদানো তাকে গ্র্যান্ড মাস্টার অভ্যর্থনা প্রদান করেন। ‘কেবল নিরবচ্ছিন্ন গণতন্ত্রই উন্নয়ন নিশ্চিত করতে পারে’ প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা আবারও নিরবচ্ছিন্ন গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ার ওপর জোর দিয়ে বলেছেন, কেবল এটাই কোন দেশের উন্নয়ন নিশ্চিত করতে পারে। তিনি বলেন, ‘আমি মনে করি কেবল নিরবচ্ছিন্ন গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়াই কোন দেশের উন্নয়ন নিশ্চিত করতে পারে’। প্রধানমন্ত্রী গতকাল সকালে আকাসাকা প্রাসাদে জাপান-বাংলাদেশ পার্লামেন্টারি লীগের সদস্যদের সঙ্গে এক বৈঠকে এ কথা বলেন। তিনি আশা প্রকাশ করেন, দু’দেশের আইনপ্রণেতারা বাংলাদেশ ও জাপানের মধ্যে দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক আরো সুসংহত করার জন্য গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করবেন। জাপান পার্লামেন্টের হাউস অব রিপ্রেজেনটেটিভ সদস্য তাকিও কাওয়ামুরা জাপান-বাংলাদেশ পার্লামেন্ট লীগের সদস্যদের নেতৃত্ব দেন। বৈঠক শেষে প্রধানমন্ত্রীর বিশেষ সহকারী মাহবুবুল হক শাকিল সাংবাদিকদের এ কথা জানান। এই বৈঠকে প্রধানমন্ত্রী বাংলাদেশ-জাপান বন্ধুত্ব জোরদারের অঙ্গীকারের জন্য জাপান-বাংলাদেশ সংসদীয় লীগের সদস্যদের ধন্যবাদ জানান। ১৯৭১ সালে মহান মুক্তিযুদ্ধে জাপানের জনগণের সমর্থনের কথা কৃতজ্ঞতার সঙ্গে স্মরণ করে শেখ হাসিনা বলেন, বাংলাদেশকে প্রথম স্বীকৃতি প্রদানকারী কয়েকটি দেশের মধ্যে জাপান অন্যতম। তারা স্বাধীনতার কয়েক সপ্তাহের মধ্যেই ১৯৭২ সালের ফেব্রুয়ারিতে আমাদের স্বীকৃতি দেয়। জাপান-বাংলাদেশ পার্লামেন্টারি ফ্রেন্ডশীপ লীগের সদস্যরা বলেন, ১৯৭১ সালের স্বাধীনতার পর থেকেই বাংলাদেশ ও জাপানের মধ্যে পারস্পরিক বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক বিদ্যমান। আর্থসামাজিক ও অবকাঠামোগত খাতে বাংলাদেশের সামপ্রতিক উন্নয়নের প্রশংসা করে প্রতিনিধি দলের প্রধান বলেন, এটি জাপানসহ গোটা বিশ্বের মনোযোগ আকৃষ্ট করেছে। অন্যান্যের মধ্যে পররাষ্ট্রমন্ত্রী এএইচ মাহমুদ আলী, পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী এম শাহরিয়ার আলম, এম আবদুল লতিফ এমপি, এ্যাম্বাসেডর-এট-লার্জ এম জিয়াউদ্দিন, পররাষ্ট্র সচিব শহীদুল হক, প্রধানমন্ত্রীর বিশেষ সহকারী মাহবুবুল হক শাকিল ও উপ-প্রেস সচিব বিজন লাল দেব এ সময় উপস্থিত ছিলেন। সামগ্রিক উন্নয়নে জাপানের সহায়তা প্রত্যাশা প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা জ্ঞানভিত্তিক সমাজ গঠন, মানবসম্পদ উন্নয়ন এবং ব্যাপক অবকাঠামোগত কর্মকাণ্ডে জাপানের সহায়তা কামনা করেছেন। জাপানকে বাংলাদেশের বিশ্বস্ত ও সময়ের পরীক্ষিত বন্ধু হিসেবে অভিহিত করে প্রধানমন্ত্রী দু’দেশের মধ্যকার অংশীদারিত্ব সুসংহত করতে তার আন্তরিক ইচ্ছার কথা ব্যক্ত করেন। সফররত বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীর সৌজন্যে জাপানের প্রধানমন্ত্রী শিনজো এ্যাবে আয়োজিত এক নৈশভোজে শেখ হাসিনা এ কথা বলেন। জাপানি প্রধানমন্ত্রীর বাসভবনে এই নৈশ ভোজের আয়োজন করা হয়।