‘আমি গত চার বছর ধরে ছবি করতে পারিনি। যে মানুষ ছবি করার জন্য বাড়ি বিক্রি করে দিয়েছে, আজ সে শারীরিক অসুস্থতাসহ নানা সংকটের কারণে গত ৪ বছর ছবি করতে পারছে না। আমার জন্য এর চেয়ে আর কষ্টের কী হতে পারে?’ কথাগুলো বলতে বলতে জড়িয়ে আসে তার কণ্ঠ। তিনি বরেণ্য নির্মাতা শহীদুল ইসলাম খোকন। সেলফোনে তার কণ্ঠ সহজে বুঝতে পারেন না এখন অনেকে। অথচ মেধায়, শক্তিতে, নানা আইডিয়ায় চমকে দেওয়ার সবটুকু ক্ষমতা আছে এখনও তার। কিছুদিন আগে এক ফিল্মের অনুষ্ঠানে অতিথির বক্তব্যে যখন মঞ্চে উঠলেন তিনি, শুরুতেই তখন বললেন, ‘আমার শব্দ শুনে কেউ বিরক্ত হবেন না। খুব জলদি সুস্থ হয়ে যাব। ডাক্তার বলেছেন।’ এটুকু বলেই চোখ মোছেন! এফডিসির এক আড্ডায় কী করছেন জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘নতুন ছবির সব কিছু রেডি। আমি নতুন কিছু আইডিয়ায় কাজ করব বলে ভাবছি। কিন্তু প্রযোজককে তো বুঝতে হবে, আমার কথায় সামান্য জড়তা থাকলেও মেধায় আমার কোনো সমস্যা নেই।’ আবারও কষ্টে যেন গলা ধরে আসে তার। আবার বলতে থাকেন, ‘এই আমিই তো বাংলাদেশের পোস্টার কনসেপ্ট বদলেছি, হুমায়ূন ফরীদিকে নিয়ে এদেশে নতুন ভিলেন কনসেপ্ট নিয়ে এসেছি, বাংলা সিনেমায় মধ্যবিত্ত, উচ্চবিত্তদের হলে ফিরিয়েছি। শুধুমাত্র একটা কথার জড়তায় আমার সব মূল্যায়ন বিফলে ফেলে দিলে...। এভাবে আমি বাঁচতে পারছি না।’
নির্মাতা শহীদুল ইসলাম খোকন এভাবেই নিজের হাহাকারের গল্প বলতে বলতে বারবার কেঁদে ফেলেন তিনি। ডাক্তারী মতে স্ট্রোকের পর ওষুধপথ্য ঠিকমতো নিলেও খুব শিগগিরই ঠিক হয়ে যাবে বললেও দিনকে দিন কণ্ঠের জড়তা যেন বেড়েই চলেছে তার। কিছুক্ষণ কথা বন্ধ রেখে মাথায় হাত রাখলেন।
‘আমি প্রধানমন্ত্রীর কাছে যাব। তার কাছেই কষ্টের কথা বলব। তিনি আরও বলেন, ‘সেদিন জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার বিতরণী অনুষ্ঠানে প্রধানমন্ত্রী যখন বললেন তিনি শিল্পীদের খোঁজখবর রাখেন, নিয়মিত পত্রিকায় খবর দেখে তাদের সম্পর্কে জানার চেষ্টা করেন। সেদিনই কিছুটা আশা পেয়েছি। কারণ আমি সবার কাছে সাহায্য চাইবার মানুষ নই। আমি এক জীবনে অনেককে সহযোগিতা করেছি। তাই ঠিক করেছি, আমি ও আমার স্ত্রী প্রধানমন্ত্রীর সাথে সরাসরি দেখা করব। কারণ এখন উন্নত চিকিত্সার জন্য দেশের বাইরে যাওয়া প্রয়োজন। নয়তো ক্রমেই নিজের শারীরিক অবস্থা অবনতির দিকে চলে যাচ্ছে। আর পারছি না এভাবে কণ্ঠটা অসাড় করে রাখতে। মনের ভেতরে তো আমার অনেক কথা!’
নতুন ছবি নির্মাণের জন্য যেন মুখিয়ে থাকেন এখন। একই সাথে পরিচালক সমিতির সভাপতির দায়িত্ব থেকে শুরু করে যাবতীয় কাজেই নিজেকে ব্যস্ত রেখেছেন। কিন্তু তার সেই দৃপ্ত কণ্ঠস্বর কোথায়? কথায় কথায় বিভিন্ন রেফারেন্স টেনে সাথের মানুষদের হিউমার দিয়ে হাস্যোজ্জ্বল রাখা যেন আর হয় না তার। খোকন বলেন, ‘আমি কি এভাবে বাঁচার মানুষ? এই আমি ‘ঘাতক’ চলচ্চিত্রে রাজাকারকে যেভাবে দেখিয়েছি, এরপর আর কারো কেন সাহস হলো না। আহমদ ছফার ‘ওংকার’ অবলম্বনে তৈরি করলাম ‘বাংলা’ সেই ছবিও প্রশংসিত হলো। প্রতিটি ছবিতেই নিজেকে ভেঙেছি বারবার। এখনও নিশপিশ করে নতুনভাবে চলচ্চিত্রে নতুন কিছু উপস্থাপন করতে কিন্তু অসুস্থতার জন্য যেন আটকে আছি। তাই আমি যেতে চাই প্রধানমন্ত্রীর দফতরে। তার কাছেই আমি সাহায্য চাইব। আমি স্পষ্ট বাংলায় বলতে পারব না বলে, আমার স্ত্রীকে সাথে নিয়ে যাব। আমি এই রাষ্ট্রের জন্য কাজ করেছি, এই দেশকে ভালোবেসে আমার প্রতিটি অ্যাকশন-কাট বলেছি বারবার। তাই জীবনের বাকি দিনগুলো আমার ছন্দে, আমার কাজ-স্বপ্ন নিয়েই বাঁচতে চাই।’
