নিরাপদ মাতৃত্ব দিবস আজ

এখনো ফুটপাতে সন্তান জন্ম দেন অনেকেই

আপডেট : ২৭ মে ২০১৪, ২৩:১৪
কার্জন হল থেকে সচিবালয়ের দিকে যেতে ডান পাশে ফুটপাতে রাশেদা বেগম তার তিন মাসের ছেলে রাসেলকে বুকের দুধ খাওয়াচ্ছেন। তিন মাস আগে এখানেই কোন প্রশিক্ষিত ধাত্রী ছাড়া জন্ম নেয় রাসেল। রাশেদার দুটি সন্তানই রাস্তায় জন্মে। এ জন্য তিনি কোন চিকিত্সকের দারস্থ হননি। খাননি কোন ওষুধ, এমন বাস্তবতার মধ্য দিয়ে ‘আসুন নিরাপদ মাতৃত্ব নিশ্চিত করি’ প্রতিপাদ্য করে আজ দেশ জুড়ে পালিত হচ্ছে নিরাপদ মাতৃত্ব দিবস। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার নির্দেশ মতে গর্ভবতী মায়ের গর্ভাবস্থায় অন্তত তিনবার চিকিত্সকের পরামর্শ নেয়া জরুরি হলেও রাস্তায় বসবাসরত মায়েরা বঞ্চিত এই সুবিধা থেকে। বিশেষজ্ঞরা বলেন, সরকারি ও বেসরকারিভাবে মোবাইল ক্লিনিক করে এই মায়েদের নিরাপত্তা বলয়ের মধ্যে আনা উচিত। সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ জানায়, বর্তমানে এই বিষয়ে কোন পরিকল্পনা নেই সরকারের। নাজু আক্তারের বয়স আঠার বছর। কার্জন হলের গেটে সরবত বিক্রি করেন স্বামী। সাত মাসের অন্তঃসত্ত্বা সাজু জানান প্রায়ই তার মাথাঘুরে চোখমুখ অন্ধকার হয়ে যায়। এপর্যন্ত কোন ডাক্তার দেখাননি তিনি। টিটেনাসের ইঞ্জেকশন নেয়ার কথা জানেন না। সন্তান কোথায় হবে এমন প্রশ্নের জবাবে ইতস্তত করে বলেন, ঠিক করেননি। আখি বেগমের সাত মাসের মেয়ে বুকের দুধ খায়। দুর্বল লাগে তার। এই রাস্তার ধারেই তার গর্ভধারণ করা। এখানেই প্রসূতি মায়ের বাস। শুধু এই এলাকায় নয় আজিমপুর, আগারগাঁ ও কমলাপুর এজিবি কলোনীর রাস্তার পাশে বসবাস করা মানুষের কাছ থেকে জানা যায় তারা গর্ভবতী হওয়া থেকে সন্তান প্রসব এবং প্রসূতি মা ও নবজাতকের জন্য কোন বাড়তি প্রস্তুতি নেন না। আশপাশের মানুষ তাদের সন্তান প্রসব করান। এজিবি কলোনীর জরিনা বেগম এযাবত্ ২০/২৫টি শিশুর ধাত্রীর কাজ করেছেন। কোন সমস্যা হলে কি করেন, এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, এত শিশুর জন্ম তার হাতে হয়েছে যে, এখন আর একে কোন কিছুই মনে হয় না। বরং এই মায়েদের চিকিত্সকের কাছে না পাঠানোই তার গর্ব। এদের গর্ভধারণের পুরো সময়টা রাস্তার ধারে কাটালেও কেউ কেউ সন্তান ভূমিষ্ঠ হওয়ার দু-চার দিন আগে গ্রামের বাড়ি চলে যান বলে জানান ফুলার রোডে বাসাবাড়িতে কাজ করা আজিমপুরে থাকা বিউটি। তিনি নিজেও তার সন্তান জন্ম দিতে বাড়িতে যান। এই সকল মায়েরা জানান সন্তান জন্মের পর থেকে তাদের ও শিশুর নানা রকমের সমস্যা লেগেই থাকে। এসব বিষয়ে স্যার সলিমুল্লাহ মেডিকেল কলেজ মিটফোর্ড হাসপাতালের প্রসূতি ও ধাত্রী বিদ্যা বিভাগের অধ্যাপক রাতু রুমানা বলেন, চিকিত্সা বিজ্ঞান মতে প্রসবকালীন সময় ফাইভ-সি নিশ্চিত করার নির্দেশ থাকে। তার মধ্যে মায়ের শারীরিক পরিচ্ছন্নতা, প্রসবের পরিবেশ পরিচ্ছন্ন, ব্যবহার্য জিনিসপত্র পরিচ্ছন্ন, ধাত্রীর পরিচ্ছন্নতা নিশ্চিত করতে হয়। তা না হলে যে কোন রকমের ইনফেকশন হতে পারে। তিনি বলেন আমাদের দেশে আজও ৮০ শতাংশ মা চিকিত্সা সেবার বাইরে সন্তান প্রসব করেন। রাতারাতি তাদের হাসপাতালে কিংবা চিকিত্সকের আওতায় আনা যাবে না। তবে প্রশিক্ষিত ধাত্রীর তত্ত্বাবধানে সন্তান প্রসব অবশ্যই নিশ্চিত করতে হবে। ঢাকা শিশু হাসপাতালের সহযোগী অধ্যাপক ডা. মিজানুর রহমান। তিনি বলেন, গর্ভবতী মায়ের উচ্চ রক্তচাপ, ডায়াবেটিস, হেপাটাইটিস-বি থাকলে তা গর্ভের শিশুর জন্য ক্ষতিকর। রাস্তার ধারের মায়েরা মাদকাসক্ত হওয়ার কারণে শিশুর ঝুঁকি আরও বেশি থাকে। রুবেলা ভাইরাসের সংক্রমণও সনাক্ত সম্ভব নয় যদি চিকিত্সকের শরণাপন্ন না হন। দেশে দরিদ্র মায়েদের জন্য গর্ভকালীন মাতৃত্বভাতা প্রচলন করে ডর্প। ডরেপর প্রতিষ্ঠাতা এএইচএম নোমান বলেন, রাস্তার মায়েদের পুনর্বাসন করেই স্বাস্থ্য সেবা নিশ্চিত করতে হবে। নয়ত রাস্তায় মা হওয়া আরও উত্সাহিত হবে। মাথার ওপর ছাদ না থাকা যাদের বাস্তবতা, তাদের নিরাপদ মাতৃত্ব নিয়ে সন্দিহান বাংলাদেশ মহিলা পরিষদের সভাপতি আয়শা খানম। তিনি বলেন শুধু সরকার নয় বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থাসহ সকলকে তাদের নিরাপত্তার জন্য কাজ করতে হবে। অবস্থা পরিবর্তনে মোবাইল ক্লিনিক ও সরকারের পক্ষ থেকে বস্তি ও রাস্তার মায়েদের ভিটামিন, আয়রন ট্যাবলেট বিতরণের পরামর্শ দেন একশনএইড এর কান্ট্রি ডিরেক্টর ফারাহ কবির। মহিলা ও শিশু বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের সচিব তারিক-উল ইসলাম বলেন, সরকার প্রসূতি মায়েদের মাসে ৪০০ টাকা করে সাহায্য করে। আগামী বাজেটে যা আরও বাড়ানো হবে তবে ভাসমান মায়েদের জন্য সরকারের তেমন কোন পরিকল্পনা বর্তমানে নেই বলে জানান তিনি। রাষ্ট্রপতি ও প্রধানমন্ত্রীর বাণী দিবসটি উপলক্ষে রাষ্ট্রপতি আবদুল হামিদ ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা পৃথক বাণী দিয়েছেন। রাষ্ট্রপতি তার বাণীতে বলেন, সুস্থ মা ও সুস্থ শিশু জাতি গঠনে উল্লে¬খযোগ্য ভূমিকা পালন করে। এ বাস্তবতা অনুধাবন করে সরকার ১৯৯৭ সালে প্রথমবারের মতো ‘নিরাপদ মাতৃত্ব দিবস’ পালনের সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে। এরই ধারাবাহিকতায় সরকার মাতৃমৃত্যু ও শিশুমৃত্যু হ্রাসে বিভিন্ন কর্মসূচি গ্রহণ করে তা সাফল্যজনকভাবে বাস্তবায়ন করছে। এর ফলশ্রুতিতে মাতৃমৃত্যু ও শিশুমৃত্যুর হার উল্লে¬খযোগ্যভাবে হ্রাস পেয়েছে এবং এ সাফল্য জাতীয় ও আন্তর্জাতিকভাবে প্রশংসিত হয়েছে। তিনি বলেন, এ জন্য বাংলাদেশ জাতিসংঘ এমডিজি পুরস্কার লাভ করেছে, যা জাতির জন্য এক বিরল সম্মান। প্রধানমন্ত্রী তার বাণীতে সরকার গত মেয়াদের পাঁচ বছরে দেশের স্বাস্থ্য খাত বিশেষ করে মাতৃস্বাস্থ্য ও শিশুস্বাস্থ্যের উন্নয়নে ব্যাপক কর্মসূচি বাস্তবায়ন করেছে বলে উল্লেখ করেন। তিনি বলেন, আমরা মাতৃত্বকালীন ছুটি ছয় মাসে উন্নীত করেছি। মাতৃস্বাস্থ্য সেবাসহ অন্যান্য স্বাস্থ্য সেবার পরিধি বৃদ্ধি করেছি। নতুন হাসপাতাল নির্মাণ, হাসপাতালগুলোতে শয্যা সংখ্যা বৃদ্ধি এবং চিকিত্সক ও নার্সসহ বিভিন্ন পর্যায়ে ব্যাপক জনবল নিয়োগ করা হয়েছে। কমিউনিটি ক্লিনিক ও স্বাস্থ্যকেন্দ্র নির্মাণ, মাতৃমৃত্যু হ্রাসে জরুরি প্রসূতি সেবা প্রদান, মিডওয়াইফারি কোর্স চালু, গরীব ও দুঃস্থ মায়েদের জন্য মাতৃস্বাস্থ্য ভাউচার স্কিম চালু করা, কমিউনিটি ভিত্তিক স্কিল্ডবার্থ অ্যাটেনেডন্ট প্রশিক্ষণ কর্মসূচি, পরিবার পরিকল্পনা কর্মসূচি ও টিকাদান কর্মসূচি সাফল্যজনকভাবে বাস্তবায়নের ফলে দেশে মাতৃমৃত্যু ও শিশুমৃত্যুর হার উল্লেখযোগ্য হারে হ্রাস পেয়েছে বলেও তিনি উল্লেখ করেন। দিবসটি উপলক্ষে সরকারি ও বিভিন্ন বেসরকারি সংস্থা নানা কর্মসূচি পালন করবে। স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় আয়োজিত একটি শোভাযাত্রার মধ্যদিয়ে দিনের আয়োজন শুরু হবে। শাহবাগস্থ জাতীয় জাদুঘরের সামনে থেকে শুরু হয়ে এই শোভাযাত্রা টিএসসি, দোয়েল চত্বর, হাইকোর্ট হয়ে প্রেসক্লাবে এসে শেষ হবে।