কিছু কষ্ট কিছু কথা ...

আপডেট : ২৮ মে ২০১৪, ১৯:৫৬
ঢাকাই চলচ্চিত্রের জীবন্ত কিংবদন্তি অভিনেতা খলিল। ২০১২ সালের জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কারে তিনি আজীবন সম্মাননা অর্জন করেছেন। আজ থেকে সাত মাস আগে যখন এই পুরস্কারটির ঘোষণা আসে তখন খলিলের প্রত্যাশা ছিল একটাই যেন তিনি নিজ হাতে এই পুরস্কার নিতে পারেন। শারীরিকভাবে অসুস্থ বিধায় তার নিজেকে নিয়ে এমন আশংকা ছিল। কিন্তু ঘটেছে ভিন্ন ঘটনা। লিখেছেন নূপুর বন্দোপাধ্যায় আট শ’রও বেশি ছবিতে অভিনয় করেছেন খলিল। তবে একটিমাত্র ছবিতে অভিনয়ের জন্য বহু বছর আগে একবারই পেয়েছিলেন জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার। চিত্রনায়িকা কবরী প্রযোজিত আলমগীর কুমকুম পরিচালিত ‘গুণ্ডা’ ছবিতে অভিনয়ের জন্য এই পুরস্কার পেয়েছিলেন। তারপর বহু বছর কেটে গেছে, অনেক ছবিতে তিনি নিজেকে এমনভাবে উপস্থাপন করেছেন যার হিসাব কষলে হয়তো এখন পর্যন্ত দুই ডজন পুরস্কার থাকত তার। কিন্তু জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার কীভাবে, কেমন করে, কার ভাগ্যে জুটে এটা সংশ্লিষ্ট সবার কাছেই স্পষ্ট। তাই একটা সময়ে এসে এই পুরস্কারের প্রতি আর কোনো আগ্রহই থাকেনি খলিলের। জীবনের একেবারে শেষ সময়ে এসে তিনি পেলেন ‘আজীবন সম্মাননা’। গত ১০ মে যখন তিনি মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর কাছ থেকে এই সম্মাননা গ্রহণ করছিলেন ঠিক তখনই তার বড় ছেলে মোহাম্মদ আল আমিন তারেক খান তার মোহাম্মদপুরস্থ অফিসে হার্টঅ্যাটাকের পর ইন্তেকাল করেন। জীবনের সবচেয়ে কঠিন এই মুহূর্তের মোকাবেলা করতে হবে খলিলকে, কখনও ভাবেননি। সুখ আর দুঃখ এতটা পাশাপাশি, কাছাকাছি হয় তাও সেদিন নিজের জীবন দিয়ে উপলব্ধি করলেন খলিল। ‘আমি যখন ‘সোনার কাজল’ ছবিতে নায়ক হিসেবে অভিনয় শুরু করি কতইবা হবে তখন তারেকের বয়স। সেই ছোট্ট বয়সেই সে সবসময় সত্য কথা বলত। তাই তার আসল নাম রেখেছিলাম আমি ‘আল আমিন’। আমার সব সন্তানের নামই আমি রেখেছি। প্রতিটি নামেরই বিশেষত্ব আছে। তারেক আমার বড় সন্তান। তাকে এভাবে হারাব আমি, ভাবতে পারিনি। আল্লাহ যেন তাকে বেহেস্ত নসিব করেন। সেইসাথে সবার কাছে দোয়াও চাই তার জন্য।’ খলিল শারীরিকভাবে অসুস্থ। প্রতিনিয়ত তাকে ডায়ালসিস করতে হয়। পাশাপাশি রয়েছে আনুষঙ্গিক অন্যান্য চিকিত্সাও। সবমিলিয়ে প্রতি মাসে তার অনেক টাকাই ব্যয় হয়। বিষয়টি বিবেচনায় এনে মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা খলিলের চিকিত্সার খরচের দায়িত্ব নিয়েছেন। খলিল বলেন, ‘মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর কাছে আমার কৃতজ্ঞতা জানাবার ভাষা নেই। আমার পরিবারের সদস্যরা এমন একটি ঘোষণায় আপাতত খুশি আছেন।’ ‘আপাতত খুশি’ আছেন এ কারণেই যে সরকারি কোনো পৃষ্ঠপোষকতা কিংবা সাহায্য-সহযোগিতা নিশ্চিত হাতে না আসা পর্যন্ত ‘আপাতত’ বলাটাই শ্রেয়। একসময় চলচ্চিত্রের নায়ক ছিলেন খলিল, পরবর্তীতে চলচ্চিত্রে চরিত্রাভিনেতা কিংবা খল অভিনেতা হিসেবে তাকে দেখা গেছে। প্রায় দুই বছরেরও বেশি সময় যাবত নতুন কোনো ছবিতে তাকে দেখা যাচ্ছে না। কাটছে সময় কেমন করে জানতে চাইলে খলিল বলেন, ‘এইতো ঘরে বসেই সময় কেটে যাচ্ছে আমার। কখনও এই ছেলের বাসা, কখনও ওই মেয়ের বাসা, আবার কখনও চিকিত্সার জন্য হসপিটাল। কখনও কখনও নিজের অভিনীত ছবি টেলিভিশনে প্রচার হলে তা দেখার চেষ্টা করি। ব্যস, এভাবেই কেটে যাচ্ছে সময়।’ সহকর্মীরা কেউ খোঁজখবর নেন? ‘কেন কষ্ট দিতে চাচ্ছেন এই প্রশ্নটা করে’, বললেন খলিল। ‘আপনি তো জানেনই এখানে কেউ কারো খোঁজ রাখে না। এই তো ক’দিন আগে আমার ছেলে ইন্তেকাল করেছেন। শবনম কিংবা ববিতা ছাড়া কেউ কী একটু খোঁজ নিয়েছেন আমার! নেননি। মৃত্যুর স্বাদ প্রত্যেককেই পেতে হবে। মৃত্যুর মুখোমুখি হতে হবে সবাইকেই। এভাবে আজ হয়তো আপনি আমাকে এড়িয়ে যাচ্ছেন। কিন্তু একদিন আপনাকেও এড়িয়ে যাবে সবাই। তাই আমি আপনাদের সবার কাছে বলে যাচ্ছি আমার মৃত্যুর পর আমার লাশ আমার বাড়িতেই যেন রাখা হয়। এফডিসি বা অন্য কোথাও যেন না নেওয়া হয়। আমার বাড়ির পাশে কবরস্থান আছে। এখানেই যেন আমাকে কবর দেওয়া হয়। অযথাই আমার লাশ নিয়ে টানাটানি যেন কেউই না করেন।’ খলিল অভিনীত প্রথম চলচ্চিত্র কলিম শরাফী ও জহির রায়হান পরিচালিত ‘সোনার কাজল’। এই ছবিতে তার বিপরীতে অভিনয় করেছিলেন সুমিতা দেবী ও সুলতানা জামান। নায়ক হিসেবে খলিল অভিনয় করেছেন ‘কাজল’, ‘প্রীত না জানে রীত’, ‘জংলী ফুল’, ‘বেগানা’সহ আরও বেশ কয়েকটি ছবি। চলচ্চিত্রে নায়ক হিসেবে তিনি শবনমের সাথে জুটিবদ্ধ হয়েই সবচেয়ে বেশি ছবিতে অভিনয় করেছেন। খলিল সম্পর্কে জীবন্ত কিংবদন্তি নায়িকা শবনম বলেন, ‘একজন মার্জিত শিল্পী খলিল ভাই। তার বিপরীতে নায়িকা হিসেবেও আমি অভিনয় করেছি। এখনও সেই চিরাচরিত হাসি তার মুখে লেগেই থাকে। তার মতো এমন গুণী অভিনয়শিল্পী আমাদের চলচ্চিত্রে খুব কমই আছেন।’ এস এম পারভেজ পরিচালিত ‘বেগানা’ ছবিতে প্রথম খলনায়ক হিসেবে খলিল অভিনয় করেন। এই ছবিতে দর্শক তার অভিনয়কে গ্রহণ করে নেন। যার ফলে একই ধরনের চরিত্রে অভিনয়ের আরও সুযোগ আসে। তিনিও কখনও না করেননি। ফলে এরপর একের পর এক খলনায়ক হিসেবেই ছবিতে কাজ করেন। নায়ক চরিত্রে আর অভিনয় করা হয়ে উঠেনি। ছবি পরিচালনা না করলেও দুটি ছবি প্রযোজনা করেছিলেন তিনি। একটি ‘সিপাহী’, অন্যটি ‘এই ঘর এই সংসার’। সিপাহী ছবিটি নির্দেশনা দিয়েছিলেন কাজী হায়াত্। ছবিটি বেশ ভালো ব্যবসা করেছিল। তবে তারচেয়েও বেশি ব্যবসা সফল হয়েছিল মালেক আফসারী পরিচালিত ‘এই ঘর এই সংসার’ ছবিটি। এই ছবিতে নায়ক হিসেবে ছিলেন প্রয়াত নায়ক সালমান শাহ। পারিবারিক বড় কষ্টের মাঝেও খলিল বেঁচে আছেন তার অন্য সন্তানদের মুখে হাসি ধরে রাখার জন্য। এই হাসি যেন অমলিন থাকে আজীবন। ছবি খোকন আহমেদ