‘হাসিমুখ’, ‘একা পাখি’, ‘ক্যাফেটেরিয়া’, ‘বন্ধ জানালা’র মতো গান রয়েছে যাদের তাদের নতুন করে পরিচয় করিয়ে দেওয়ার প্রয়োজন পড়ে না। তারা ১৯৯৬ সালে বাংলাদেশে যাত্রা শুরু করা তারুণ্যনির্ভর ব্যান্ড শিরোনামহীন। শুরু থেকেই নগর থেকে শহরবন্দী সাতরঙা অনুভূতিগুলো ভাবনায় নিয়ে নিজস্ব স্বকীয়তায় গান পরিবেশন করে আসছে দলটি। গান নিয়ে নিত্য নতুন উপস্থাপনা, গানের হূদয় ছুঁয়ে যাওয়া কথা ও সুরের মূর্ছনায় শিরোনামহীন এখন দেশের অন্যতম জনপ্রিয় ব্যান্ডদল। সম্প্রতি বাজারে এসেছে তাদের সেল্ফ টাইটেল অ্যালবাম ‘শিরোনামহীন শিরোনামহীন’। দলের সদস্যদের সাথে কথা হলো এই অ্যালবামসহ সাম্প্রতিক নানা বিষয় নিয়ে। সঙ্গে ছিলেন
লিমন আহমেদ
পথচলার শুরু থেকেই পশ্চিমা বাদ্যযন্ত্র এবং দেশীয় বাদ্যযন্ত্রের সফল ব্যবহার অন্য ব্যান্ডগুলো থেকে আলাদা করেছে শিরোনামহীনকে। তাদের গানে যেমন পাওয়া গেছে দোতরা, সরোদ, বাঁশির মুগ্ধতা; তেমনি মুগ্ধ করেছে তাদের আয়োজনে ড্রাম, গিটার, বেজ গিটার, ইলেক্ট্রিক গিটারের মতো আধুনিক বাদ্যের ব্যঞ্জনাও। সে মুগ্ধতা ধরেই শ্রোতাদের ভালোবাসার গালিচায় মুড়িয়ে আছে দলটি। ‘শিরোনামহীন’ জন্মের গল্প জানতে চাইলে এর প্রতিষ্ঠাতা সদস্য জিয়াউর রহমান বলেন, ‘১৯৯৬ সালে বুয়েটে পড়ার সময়ই শিরোনামহীনের জন্ম। প্রথম দিকে আমরা ছিলাম ক্যাম্পাসভিত্তিক গানের দল। ক্যাম্পাস ও আশপাশে স্টেজ প্রোগ্রাম হলে সেখানে অংশ নিয়েছি নিয়মিত। টিএসসি, মধুর ক্যান্টিনসহ যেখানেই আড্ডা দিতাম সেখানে অন্যদের মতোই গান করতাম। টেবিল চাপড়ানো এই গানগুলো বাজারে আসে না। তাই জানতাম আমাদের গানও অ্যালবাম আকারে কখনও সাধারণ মানুষের কাছে যাবে না। কিন্তু পদাতিক নাট্যচক্র আয়োজিত পহেলা বৈশাখের অনুষ্ঠানে গান করার পর শ্রোতাদের বিপুল সাড়া পেয়ে প্রথমবারের মতো ইচ্ছে হলো গান নিয়ে কিছু করার। সেখানে অনেকেই অ্যালবাম করার জন্য আমাদের উত্সাহ দিয়েছিল। এরপরই আমরা অ্যালবামের প্রস্তুতি নিই। প্রথম অ্যালবামে চেয়েছিলাম গানের মধ্যে আড্ডার আমেজটা যেন থাকে। আর সেটাই শ্রোতাদের মনে দাগ কেটেছিল।’ তারপর আর পিছু ফিরে তাকাতে হয়নি। গল্প কেবল উত্থানেরই। ২০০৮ সালে বামবার সদস্যপদ লাভ করা শিরোনামহীনের সঙ্গে ২০০০ সালে যুক্ত হন ভোকাল তানজীর তুহিন। একে একে আসেন লিড গিটারিস্ট তুষার এবং কিবোর্ড বাদক রাজীব। তবে যে লাইনআপ নিয়ে প্রথম অ্যালবাম বের করেছিল ‘শিরোনামহীন’ সর্বশেষ পঞ্চম অ্যালবামে এসে তার অনেকখানিই বদলে গেছে। পেশাগত কারণে দলে সক্রিয় নেই তুষার ও রাজীব। নতুন সদস্য হিসেবে আসেন কাজী আহমেদ শাফিন। তিনি বাজান ড্রামস। এরপর লিড গিটারিস্ট হিসেবে ২০০৯ সালে দিয়াত খান ও ২০১০ সালের জুনে সর্বশেষ কিবোর্ডে যোগ দেন রাসেল কবির। আর বেইজে বরাবরের মতো জিয়াই থাকছেন। গানের বাইরে শিরোনামহীনের সদস্যদের আছে ভিন্ন পরিচয়। কেউ ইলেক্ট্রিক্যাল ইঞ্জিনিয়ার, কেউ আর্কিটেক্ট, কেউ এমবিএ করেছেন। নতুন সদস্যদের সাথে শিরোনামহীনের সম্পর্কটা কেমন জমছে জানতে চাইলে তুহিন বলেন, ‘অনেকদিন ধরে আমরা একসঙ্গে আছি। একটি পরিবারের সদস্যদের মতোই হয়ে গেছে আমাদের সম্পর্ক। সংসারের সময় চুরি করে, প্রতিদিনের অন্য কাজ সেরে একসঙ্গে হই গান করার জন্য। আসলে ব্যান্ড মানেই দলবদ্ধ একটা ব্যাপার। এখানে সবাইকে মিলে এক হতে হয়, আবার একের জন্য সবাইকে মিলতে হয়।’ ২০০৪ সালে রিলিজ হওয়া শিরোনামহীনের প্রথম অ্যালবাম ‘জাহাজী’তে সে চেষ্টা ছিল। ২০০৬ সালে ‘ইচ্ছেঘুড়ি’, ২০০৯ সালে ‘বন্ধ জানালা’ এবং ২০১০ সালে ‘শিরোনামহীন রবীন্দ্রনাথ’-এ তার ধারবাহিকতা লক্ষ করা গেছে। নতুনত্বের আমেজ মিলেছে বৈশাখ উপলক্ষে লেজারভিশনের ব্যানারে বাজারে আসা ‘শিরোনামহীন শিরোনামহীন’ শিরোনামে তাদের সর্বশেষ পঞ্চম অ্যালবামে। এখানে নতুনত্ব হলো আগের চারটি অ্যালবামেই তাদের সঙ্গে ছিলেন অতিথি যন্ত্রশিল্পী। তবে এবার নিজেদের গান নিজেরাই বাজিয়েছেন জিয়া-তুহিনরা। সেল্ফ টাইটেলের এই অ্যালবামের সব ধরনের আয়োজনও করেছেন নিজেরাই। অ্যালবামে ঠাঁই পেয়েছে দলটির বিখ্যাত গান ‘হাসিমুখ’-এর সিক্যুয়েল ‘আবার হাসিমুখ’। পাশাপাশি রয়েছে ‘পরী’, ‘মিছিল’, ‘চিঠি’, ‘শনশন’, ‘বৃষ্টিকাব্য’ নামের কিছু মিষ্টি মধুর গান। বর্তমানে এ অ্যালবামের গানগুলো শ্রোতাদের কাছে খুব সহজে পৌঁছে দিতেই দলটির সব ব্যস্ততা। এর জন্য দলের অ্যাপ্লিকেশন (অ্যাপ) তৈরি করেছেন তারা। গত ১৩ মে, বুধবার থেকে এ সুবিধা ভোগ করছেন শিরোনামহীনের ভক্তরা। এই অ্যাপে গানের পাশাপাশি থাকছে দলের সব তথ্য, সদস্যদের পরিচয়, গানের গল্পসহ নানাকিছু। অ্যাপটি play.google.com-এর সার্চবারে ‘শিরোনামহীন’ লিখলেই পাওয়া যাবে। বর্তমানে ঢাকা ও ঢাকার বাইরে বেশকিছু স্টেজ শো নিয়ে ব্যস্ত সময় কাটছে তাদের। প্রায় প্রতিদিনই থাকছে প্র্যাকটিস-মহড়া। শেষ বেলায় শিরোনামহীনের সদস্যরা একসাথে জানালেন আক্ষেপের কথা। বললেন, ‘এখন আর সিডি কিনে কেউ অ্যালবাম শুনছে না। একটা সময় সিডি ইতিহাসই হয়ে যাবে। এখন মোবাইলের দোকানে গিয়ে নানা সাইটে ক্লিক করে ডাউনলোড করে ফ্রি গান শুনছে এবং অন্যদের মোবাইলে গানগুলো খুব সহজেই ট্র্যান্সফার করছে। ওই ক্লিকটাই সর্বনাশ করছে।’ এই সর্বনাশের হাত থেকে ব্যান্ড তথা সমগ্র মিউজিক ইন্ড্রাস্টিকে বাঁচাতে গানের সিডি কিনে গান শুনতে শ্রোতাদের অনুরোধ করেছে শিরোনামহীন।
