রূপকথার নির্মাতা...

আপডেট : ২৮ মে ২০১৪, ২০:০৫
ভালো ভালো নাটক নির্মাণ করে পরিচালক ইদ্রিস হায়দার দর্শকের মন জয় করেছেন অনেক আগেই। বর্তমানে এশিয়ান টিভিতে প্রচার হচ্ছে তার মেগা ধারাবাহিক নাটক ‘সেকেন্ড ইনিংস’। এই গুণী নির্মাতার জীবনের কথামালা নিয়ে লিখেছেন খালেদ আহমেদ ও ছবি তুলেছেন তাহের মানিক মিডিয়ার প্রতি ছোটবেলা থেকেই ছিল তার দুর্বার আকর্ষণ। কৈশোরেই স্কুলের শিক্ষকরা তাকে বানিয়ে ছিলেন মঞ্চ নাটকের ডিরেক্টর। তখন থেকে চলে স্কুলের নাটকের নির্দেশনা। এরপর ধীরে ধীরে তিনি নাটকের ভেতরে আবাস গড়তে শুরু করলেন। একসময় স্কুলের পাট চুকিয়ে কলেজে ভর্তি হলেন। পড়াশোনার পাশাপাশি থিয়েটার ঠিকই থাকল। বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির পর অভিনয়টা যেন জীবনের অপরিহার্য অংশ হয়ে উঠল। থিয়েটারকে ভালোবেসে উচ্চশিক্ষার জন্য পাড়ি জমালেন সুদূর আমেরিকায়। আর পড়ার বিষয়টা ছিল ড্রামাটিক। দেশে ফিরে আবারও শুরু করলেন নাটক নির্মাণ। নাটক নির্মাণকে কতটুকু এনজয় করেন জানতে চাইলে ইদ্রিস হায়দার বলেন, ‘সৃষ্টিশীল কাজের মধ্যে এক ধরনের আনন্দ থাকে। আর সৃষ্টিশীলতার আনন্দের স্বাদ নিতেই নাটক নির্মাণের পেশাকে বেছে নিয়েছি। এই পেশার মাধ্যমে নিজের ভাবনাগুলো দর্শকদের মাঝে উপস্থাপন করা যায় সহজেই। সামনের দিনগুলোতে চেষ্টা করব ভালো কিছু দর্শকদের উপহার দিতে।’ বর্তমানে এশিয়ান টিভিতে প্রচার হচ্ছে তার মেগা ধারাবাহিক নাটক ‘সেকেন্ড ইনিংস’। ইতোমধ্যে ২০৪ পর্ব শুটিং শেষ করেছেন। সেইসাথে নতুন ধারাবাহিক নাটক ‘পালঙ্ক’-এর শুটিং চলছে। এই ধারাবাহিক প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ‘এটা খুব চ্যালেঞ্জিং সিরিয়াল। এই নাটকের একেকটি খণ্ড বলতে গেলে একেকটি চলচ্চিত্র হিসেবে দর্শকরা দেখবেন। এই নাটকের অভিনয়শিল্পী থেকে শুরু করে পুরো নির্মাণটাই চলচ্চিত্রের আদলে করা হচ্ছে। নাটকটির মাধ্যমে আমি বোঝাতে চাই গ্ল্যামারাস প্রোডাকশন না থাকার কারণেই আসলে এদেশের দর্শক ভিন্নদেশের সিরিয়াল দেখে। আমাদের দেশের গল্প ও বাঙালি সংস্কৃতি তথা মা, মাটির গন্ধ এবং শৈল্পিক চিন্তা থেকেই এটি নির্মাণ করছি। যা দর্শকদের ভালো লাগবে বলে আমার বিশ্বাস।’ তিনি আরও বলেন, ‘আমি কোনো দেশের নাম বলতে চাই না। আমি মনে করি আমরা দর্শকের চাহিদামাফিক নাটক বানাতে পারি না। ইন্টারনেটের এই যুগে দর্শকের মনের মতো নাটক নির্মাণ করতে না পারলে তারা অবশ্যই অন্য দেশের নাটক দেখবেন। এর জন্য অবশ্য শুধু পরিচালকদের এগিয়ে আসতে হবে, তা কিন্তু নয়। এখানে অভিনয়শিল্পী, প্রডিউসার, বিজ্ঞাপনদাতাদেরও দায়বদ্ধতা আছে। সবাই মিলে একসাথে কাজ করলে তবেই আমাদের দেশীয় নাটকের মান আরও বাড়ানো সম্ভব।’ নিজের নির্মিত নাটকের প্রসঙ্গ উঠতেই তিনি মৃদু হেসে বলেন, ‘আমি সাধারণত ট্র্যাডিশনাল ফ্যামিলির নাটক নির্মাণ করতে পছন্দ করি। ইতোমধ্যে আমার ৩৫টি ধারাবাহিক নাটক বিভিন্ন চ্যানেলে প্রচার হয়েছে। যার ২০টি ট্র্যাডিশনাল ফ্যামিলির নাটক। কিছু নাটক দুই শ পর্বের উপরে আছে। আমিও একসময় গড্ডালিকা প্রবাহে গা ভাসিয়ে দিয়ে পর্ব নাটক নির্মাণ করেছি। তবে ৩৩টি নাটকের কোনটার সাথে কোনটার মিল রাখিনি। একেকটি একেক রকমের গল্প। আমি যেহেতু ট্র্যাডিশনাল গল্প নিয়ে কাজ করি তাই আমি বাঙালি সংস্কৃতির বাইরে যাইনি। আমার নাটকে পুলিশকে আজ পর্যন্ত ওইভাবে খারাপ দেখানো হয়নি। আমি কোনো নাটকে সিগারেট খাওয়া দেখাইনি।’ ইদ্রিস হায়দারের উল্লেখ্যযোগ্য নাটকগুলোর মধ্যে ‘সৈয়দ বাড়ির বউ’, ‘চন্দ্রবিন্দু’, ‘আমাদের সংসার’, ‘সৈয়দ বাড়ির কন্যা’, ‘হীরক বাড়ি সোনার চুড়ি’ প্রভৃতি নাটক দর্শকদের কাছে জনপ্রিয় হয়েছে। পরিচালনা ও অভিনয়ের চেয়ে তার প্রিয় জায়গা লেখালেখি। বর্তমানে তিনি কিছু ভালো চলচ্চিত্র লেখার চেষ্টা করছেন। তার ভাষ্যে, ‘ভালো বলতে অনেক ভালো। একসময় আমাদের ভালো চলচ্চিত্র বলতে যা বোঝাতো, সেই রকম। সুস্থ ধারার চলচ্চিত্র অর্থাত্ আমাদের দেশের কথা বলবে এবং যা দর্শক দেখবে, সেই সাথে টাকা লগ্নি করে তা প্রডিউসাররা ফেরতও পাবেন।’ আসছে ঈদের জন্য এশিয়ান টিভিতে প্রচারের জন্য নির্মাণ করছেন ‘পদ্ম ফুল’ এবং বিটিভির জন্য ‘রত্নগর্ভা’ ও আরটিভির জন্য ‘গুড বাই সকিনা’। সেই সাথে ‘ভূতের বাচ্চা কই মাছ’ নামের ভিন্ন ধারার গল্প নিয়ে আরেকটি নাটক নির্মাণ করছেন। ঈদের পর ‘সোনা রঙের ফুল’ নামে নতুন আরেকটি ধারাবাহিক নাটকের শুটিং শুরু করবেন। এটা তার একটা উপন্যাস। আসছে বইমেলায় এটা প্রকাশের কথা রয়েছে। নিজের প্রডাকশন হাউস প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ‘আমার প্রডাকশন হাউজের নাম গুরুজী ফ্যামিলি। আমি চেয়ারম্যান এবং এমডি রেদওয়ানুল বারী মুনির। তাকে কাছে পেয়ে আমি আনন্দিত। তার সহযোগিতায় আমি ভালো কিছু কাজ করতে পারছি। ইচ্ছা আছে আগামীতে আরও সুন্দর সুন্দর নাটক ও চলচ্চিত্র দর্শকদের উপহার দেওয়ার।’ বর্তমানে তিনি চলচ্চিত্র নিয়ে কাজ করছেন। রবীন্দ্রনাথের ‘দৃষ্টিদান’ গল্প অবলম্বনে চলচ্চিত্র নির্মাণ করবেন। স্ক্রিপ্ট লেখার কাজ চলছে। এছাড়া ‘সেল বাজার’, ‘উচ্চস্বরী কন্যা’ নামের দুইটি চলচ্চিত্র নির্মাণ করবেন। প্রতিটি গল্পে সুন্দর মেসেজ রয়েছে বলে জানালেন তিনি। এরমধ্যে ‘উচ্চস্বরী কন্যা’ ছবিতে নাম ভূমিকায় অভিনয় করবেন তাহমিনা জামান হিমিকা। সেইসাথে অনুদানের চলচ্চিত্রের জন্য আহমেদ ইউসুফ সাবেরের মুক্তিযুদ্ধের গল্প ‘কাকডাকা ভোর’ শিগগিরই জমা দেবেন। আগামীর ভাবনার কথা জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘আমার এখন একটাই স্বপ্ন—তা হলো চলচ্চিত্র নির্মাণ। আমাদের দেশীয় চলচ্চিত্রে সম্ভাবনার আলো দেখছি, তাই আমার সংস্কৃতি জীবনের ৪৩ বছরের অভিজ্ঞতা কাজে লাগাতে চাই ভালোমানের চলচ্চিত্র নির্মাণে। আমি যখন ফিল্ম করব তখন নাটককে ভুলে নয়। নাটক নির্মাণ করে যাব কারণ আমার ইচ্ছা ভালোমানের নাটকের মাধ্যমে দর্শককে ধরে রাখা। কেননা বাঙালি সংস্কৃতিকে চলমান রাখতে ভালো নাটকের বিকল্প নেই।’