আমাদের প্রিয় নবী হযরত মুহাম্মদ (স.) স্বশরীরে আল্লাহ তালার সাথে যে স্বাক্ষাত ঘটেছিল তাকে মেরাজের ঘটনা হিসেবে অবহিত করা হয়। মিরাজের ঘটনা সমগ্র মানবজাতির জন্য বিস্ময়কর ঘটনা। মেরাজের ঘটনা নিয়ে নানাজন নানামত প্রকাশ করলেও এটা সত্য যে নবীজির জীবনে মিরাজের ঘটনা ঘটেছিল। মিরাজের ঘটনা যে বিশ্বাস করলনা সে তার ঈমানকে দূর্বল করল। স্বয়ং আল্লাহতালা মেরাজের ঘটনার ওপর বিশ্বস রাখার কথা বলেছে। পবিত্র শবে মেরাজের ওপর আমরা দৈনিক ইত্তেফাকের পক্ষ থেকে বিশিষ্ট ইসলামী চিন্তাবিদ আলেমদের অভিমত গ্রহন করি। মেরাজ সম্পর্কে তাদের অভিমত এখানে উপস্থাপন করছি—আলহাজ্ব মাওলানা শাহ মুহাম্মদ কুতুব উদ্দিন (পীর সাহেব ও সভাপতি বায়তুশ শরফ আঞ্জুমানে ইত্তেহাদ বাংলাদেশ) মেরাজ মহানবী (স.) এর একটি শ্রেষ্ঠ মুজিযা। এটি মানব ইতিহাসে একটি চাঞ্চল্যকর বিস্ময় ও যুগান্তকারী ঘটনা। ইসলামের ইতিহাসে এ ঘটনা ধর্মীয়, রাজনৈতিক ও আধ্যাত্মিক দৃষ্টিকোণ থেকে অত্যন্ত তাত্পর্য মণ্ডিত ও অর্থবহ। বিশ্বের বিশিষ্ট চিন্তাবিদ, গবেষক, দার্শনিক ও বিজ্ঞানীগণ এঘটনায় হতবাক ও নির্বাক। এটা কি আশ্চর্য, অদ্ভুত, অকল্পনীয় ব্যাপার। যা ইতিপূর্বে এরূপ কখনো সংঘটিত হয়নি। এই বিস্ময়কর ঘটনা ঈমানদারের ঈমানাকে করেছে আরো শানিত ও মজবুত। পক্ষান্তরে দূর্বলচিত্ত ও নড়বড়ে। অবিশ্বাসীদের অবিশ্বাসকে ঠেলে দিয়েছে গহীন অন্ধকারে। মেরাজুন্নবী (স.) এর দুটো সমন্বিত নাম হচ্ছে মেরাজুন্নবী (স.) প্রথমটি সূরা বনী ইসরাঈলের প্রথম আয়াত দ্বারা প্রমাণিত। দ্বিতীয়টি মুতাওয়াতির ও মশহুর হাদিস দ্বারা প্রমাণিত। হাফেজ ইবনু কাসীর (রা.) তাঁর তাফসীর গ্রন্থে পঁচিশজন সাহাবীর নাম উল্লেখ করেছেন। যাঁদের থেকে মিরাজ সংক্রান্ত হাদিস বর্ণিত রয়েছে। ইসলামী পরিভাষায় রসূলে করিম (স.) মসজিদে আকসা থেকে সপ্তাকাশে ভ্রমণ করে মহান আল্লাহর সান্নিধ্যে উপনীত হওয়ার ঘটনা প্রবাহকে মিরাজ বলে। উম্মতের অধিকাংশ আলেম, চিন্তাবিদ ও সাধারণ মুসলমান এই আক্বীদা পোষণ করেন যে, মেরাজ রাসূলের দৈহিক ও জাগ্রত অবস্থায় অনুষ্ঠিত হয়েছে। মেরাজুন্নবী (স.) যে রসূলুল্লাহ (স.) স্বশরীরে হয়েছে এর সব চেয়ে বড় প্রমাণ হলো এঘটনা নিয়ে জনসমাজে বিতর্ক সৃষ্টি হওয়া। ঘটনাটি যদি নিছক আত্মিক বা স্বপ্ন যোগে হতো তাহলে ইসালামের পক্ষ বিপক্ষ কোন মহলই এনিয়ে বিতর্ক করতেন না। সবাই বিনা বাক্যে নির্দিধায় মেনে নিতেন। নি:সন্দেহে মেরাজ মানব ইতিহাসে এক বিস্ময়কার ও যুগান্তকারী ঘটনা।
অধ্যক্ষ্য আলহাজ্ব মাওলানা জালালউদ্দীন আল কাদেরী, (খতিব : জমিয়াতুল ফালাহ্ জাতীয় মসজিদ, চট্টগ্রাম,
গর্ভনর : ইসলামিক ফাউন্ডেশন, বাংলাদেশ)। পবিত্র শব-ই মেরাজ গোটা মুসলিম জাহানের জন্য গৌরব বা অহংকারের বিষয়, কারণ আমাদের প্রিয় নবী হযরত মুহাম্মদ (স.) কে একমাত্র মেরাজ প্রদান করেন। পৃথিবীর আর অন্য কোন নবীকে আল্লাহতালা মেরাজ প্রদান করেননি। এই মেরাজের অন্যতম বৈশিষ্ট্য হলো নবী করিম (স.) স্বশরীরে জাগ্রত অবস্থায় মেরাজ করেছে। স্বপ্নে বা আত্মিকভাবে এই মেরাজ সংঘটিত হয়নি। মহান আল্লাহ পাক নবী করিম (স.) কয়েক স্তরের মেরাজ দান করেছেন। এটা হচ্ছে : মেরাজে বসরী ঃ খানয়ে কাবা বায়তুল্লাহ শরীফ হতে মসজিদে আকসা বায়তুল মোকাদ্দাস পর্যন্ত প্রথম স্তরের বসরী মেরাজ। এই বায়তুল মোকাদ্দাস মসজিদে লক্ষ লক্ষ নবীগণ নবী করিম (স.) এর ইমামতিতে নামাজ আদায় করেন। এতে নবী করিম (স.) এর শ্রেষ্ঠত্বের প্রমাণ হয়। কারণ পৃথিবীর সমস্ত নবীর ঈমাম হচ্ছেন রাসূলে করিম (স.)। পৃথিবীর মধ্যে শ্রেষ্ঠ সমপ্রদায় হচ্ছে নবীগণ। ঐ নবীগণের ঈমাম হয়ে নামাজ আদায় করে আল্লাহ তাঁকে শ্রেষ্ঠত্বের আসনে অধিষ্ঠিত করেছেন। এরপর মেরাজে মরকী (ফেরেস্তা জগতের মেরাজ) বায়তুল মোকাদ্দাস হতে প্রথম,দ্বিতীয়, তৃত্বীয়, চতুর্থ, পঞ্চম, ষষ্ঠ এবং সপ্তম আকাশ হয়ে ছিদরাতুল মুনতাহা অর্থাত্ হযরত জিবরাইল (আ.) এর অবস্থান স্থল পর্যন্ত নবী করিম (স.) কে নবীগণ সংবর্ধনা প্রদান করনে। প্রথম আসমানে হযরত আদম (আ.) দ্বিতীয় আসমানে হযরত ইয়াহিযা (আ.) হযরত ঈসা (আ.) তৃতীয় আসমানে হযরত ইউসূফ (আ.), পঞ্চম আসমানে হযরত হারুন (আ.) ষষ্ঠ আসমানে হযরত মুছা (আ.), সপ্তম আসমানে হযরত ইব্রাহিম (আ.) এর সাক্ষাত্ হয়। তারপর সেখানে থেকে নবী করিম (স.) ছিদরাতুল মুনতাহায় গমন করেন। এরপর হযরত জিব্রাইল (আ.) বলেন, আমার যাওয়ার ক্ষমতা নেই। যেখানে হযরত জিব্রাইল (আ.) এর যাওয়ার ক্ষমতা নেই সেখানে নবী করিম (স.) যাওয়ার ক্ষমতা রাখলেন। এখান থেকেই প্রমান হয় নবী করিম (স.) এর শ্রেষ্ঠত্বের।
মাওলানা কাযী মুহাম্মদ মঈনউদ্দীন আশরাফী, (প্রধান মুহাদ্দিস ছোবাহানীয়া কামিল মাদ্রাসা, চট্টগ্রাম)।
পবিত্র মেরাজুন্নবী (স.) নবুয়তের দ্বাদশ বছরের মাঝামাঝি রজব মাসের ২৭তম রাতে মক্কা শরীফে উম্মেহানীর (রা.) বাসগৃহ থেকে অনুষ্ঠিত হয়। এই মেরাজুন্নবী (স.) এর সবচেয়ে রহস্যপূর্ণ মোজেজা এর মাধ্যমে সব নবীদের ওপর তাঁর শ্রেষ্ঠত্ব সন্দেহাতীত ভাবে প্রমাণিত। আরশের ওপর আহরোহন ও মহান আল্লাহর সাক্ষাত্ লাভে ধন্য হবার মাধ্যমে তাঁর মহান মর্যদা প্রমাণিত। এই মেরাজ তিনভাগে বর্ণিত। (এক) মসজিদে হারাম থেকে মসজিদে আকসা। (দুই) সেখান থেকে সিদরাতুল মুনতাহা। (৩) সেখান থেকে আরশ পর্যন্ত বা আল্লাহতালা যতটুকু নিয়ে গেছেন ততটুকু পর্যন্ত। প্রথামাংশ : ইসরা,দ্বিতীয়াংশ—মেরাজ, তৃত্বীয়াংশ—ইরাজ। পবিত্র কুরাআন এর সূরা বনী ইসলাইল ও সূরা আনন্জমে এটি বর্ণিত আছে। তথাপি বিশুদ্ধ হাদিস দ্বারা এটি প্রমাণিত। ইসলামের দ্বিতীয় রুকন নামাজ এইরাতে ফরজ হয়। প্রথমে আল্লাহতায়ালা দৈনিক পঞ্চাশ ওয়াক্ত নামাজ নির্ধারণ করে দিলেও হযরত মুসা (আ.) এর সহযোগিতায় মহান আল্লাহর ইচ্ছায় তা পাঁচ ওয়াক্ত স্থির করা হয়। নবীগণ ইন্তেকালের পরও যে মানব কল্যাণ করতে পারেন তা এখান থেকেই প্রমাণ পাওয়া য়ায়। রাতের অল্প সময়ের মধ্যে এধরণের অলৌকিক ঘটনা সম্পন্ন হওয়া মহান আল্লাহর অপরিসীম কুদরতের নিদর্শন। মেরাজের রাতে রসূলুল্লাহ (স.) কে আল্লাহর কুদরতের নিদর্শনগুলো দেখেছেন। তাঁকে সাক্ষাত্ দানে দন্য করা, রহস্যপূর্ণ জ্ঞানদান করা তাঁর অন্তরের প্রশান্তি, উম্মতদের মুক্তির নিশ্চয়তা, জান্নাত জাহান্নাম পরিদর্শন করানোর লক্ষ্যে প্রিয় নবী (স.) উর্দ্ধজগত সমূহে ভ্রমণ করিয়েছেন স্বশরীরে জাগ্রত অবস্থায়। পবিত্র কুরআনে মেরাজের ঘটনাকে মানুষের জন্য পরীক্ষা হিসেবে বর্ণনা করেছে। কারণ দূর্বল ঈমানের অধিকারী অনেকে এই ঘটনাকে বিশ্বাস করতে না পেরে ধর্মত্যাগ করেছে। মেরাজের ঘটনার ওপর আস্থা বিশ্বাস স্থাপন করাই হচ্ছে মজবুত ঈমানদারের পরিচয়।
