নামাজ মোমেনের মেরাজ

আপডেট : ২৯ মে ২০১৪, ২০:৩৪
মহান আল্লাহ পাক তাঁর সবচেয়ে প্রিয় দোস্তকে নিজের আরশ মোয়াল্লায় দাওয়াত করে নিয়ে গিয়েছিলেন পবিত্র মেরাজের রজনীতে। তিনি এ রাতে তাঁর হাবীবকে বহু নিদর্শন দেখিয়েছেন এবং উম্মতের জন্য শ্রেষ্ঠ নেয়ামত সালাতসহ আরও কিছু দান করেছেন। মুসলিম শরিফে বর্ণিত আছে, “মেরাজের রজনীতে আল্লাহপাক রসূল (স.)-কে তিনটি জিনিস দান করেছেন- ১. পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ ২. সূরা বাকারার শেষ দু’আয়াত এবং ৩. শিরকমুক্ত উম্মতের গুরুতর গুনাসমূহ ক্ষমার সুসংবাদ।” পাঁচওয়াক্ত নামাজ সকল মুসলামানের জন্য অবশ্যই পালনীয়। কুরআন বলে, ‘নামাজ কায়েম কর’ অর্থাত্ পড়। তাহলে প্রশ্ন, মানুষ কেন নামাজ পড়বে? এরশাদ হয়েছে, “নিশ্চয়ই নামাজ মানুষকে অশ্লীল ও খারাপ কাজ থেকে দূরে রাখে” (আল আনকাবুত : ৪৫)। অর্থাত্ মানুষ নামাজের দ্বারা হবে পূতঃপবিত্র এবং শুদ্ধ-বিশুদ্ধ তথা নির্মল-নিষ্কলঙ্ক। যখন নামাজ দ্বারা কোন সাধক এরূপ পবিত্রতা অর্জন করতে সক্ষম হবে তখনই সে কৃতকার্য। কোরআন বলে, ‘কৃতকার্য ব্যক্তি একমাত্র তারাই যারা নির্মল অন্তর বিশিষ্ট’। আরও এরশাদ হয়েছে, “অনন্তর আল্লাহর কাছে কারও নিস্তার নেই, পবিত্রতর অন্তর ছাড়া।” ইসলামে কৃতকার্য ব্যক্তি তারাই, যারা শুধু বিশুদ্ধ। একদা নবীজি (স.) সাহাবীদের বললেন, “যদি কারও বাড়ির পাশ দিয়ে একটি নদী প্রবাহিত হয়, আর যদি প্রতিদিন কোনো ব্যক্তি ঐ নদীতে গোসল করে, তবে কি তার শরীরে কোন ময়লা থাকবে? সাহাবিগণ উত্তরে বললেন-না, হে আল্লাহর রসূল (স.)। তখন নবীজি বললেন, পাঁচ ওয়াক্ত সালাতও ঠিক তেমনি গুনাসমূহ দূর করে দেয়।” নামাজের মূল উদ্দেশ্য হচ্ছে মানুষকে সত্ করা, শুদ্ধ করা। পবিত্র কুরআনে এরশাদ হয়েছে, “সেই সফলকাম, যে পবিত্রতা অর্জন করে ও তাঁর প্রভুর নামে যিকির করে এবং সালাত আদায় করে” (আল আলা : ১৪, ১৫)। আল্লাহর দরবারে কবুল হওয়ার মত যোগ্য সালাত আদায় করার জন্য আত্মশুদ্ধির শিক্ষাও গ্রহণ করা কর্তব্য। কারণ কুলষযুক্ত অন্তর নিয়ে নামাজ কেন, কোন প্রকার ইবাদতই আল্লাহপাকের নিকট গ্রহণযোগ্য হয় না। শরীয়ত মোতাবেক সালাতের জাহেরী ফরজসমূহ শারীরিক অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ পরিচালনা দ্বারা সম্পন্ন হয়। যেমন- অজু করা, দাঁড়ানো, রুকু, সিজদাহ করা। দাঁড়ানো, রুকু, সিজদাহর মাধ্যমে আল্লাহর সামনে নিজেকে সমর্পণ করা। রসূল পাক (স.) ফরমান, “সালাত হুজুরী কলব ব্যতীত সুসম্পন্ন হয় না।” কারণ সালাত হচ্ছে আল্লাহর নিকট প্রার্থনা করা। আর প্রার্থনা করার স্থান কলব বা অন্তকরণ। রসূলুল্লাহ (স.) ইরশাদ করেছেন, “তোমাদের কেউ যখন নামাজ আদায় করে, তখন সে তার প্রভুর সাথে মুখোমুখি গোপন আলাপ করে” (বুখারি : ৫০৬)। একজন তরীকতপন্থী সাধক যখন নামাজে দাঁড়ায় তখন সে দু’চোখ বন্ধ করে দুনিয়ার মায়া মহব্বতের কথা ভুলে আল্লাহপাকের রূপের সাগরে ডুব দেয়। আল্লাহকে বাতেনী চোখ দ্বারা দেখে ভাবাবেগে আল্পুত হয়ে সে সূরা তেলাওয়াত করে। এ সময় ফায়েজের অবারিত স্রোতে তার অন্তর শীতল হয়ে যায়। এভাবে পরম শান্তিতে সে রুকু, সেজদাসহ সবগুলো কাজ সম্পন্ন করে। অতঃপর মোনাজাত ও মোরাকাবা শেষ করে আল্লাহর পক্ষ থেকে ঔ ওয়াক্তের ফায়েজ ও ইবাদত কবুলের সংবাদ লাভ করে পরিতৃপ্ত হয়। বিশ্বনবী (স.) বলেন, “আস সালাতু মেরাজুল মুমেনিন” অর্থাত্ নামাজ মোমেনের জন্য আল্লাহর দর্শন। সাধারণ মানুষের নামাজ আর মোমেন বান্দার নামাজে অনেক পার্থক্য। মোমেন সেই যিনি অন্তরকে পুতঃপবিত্র করতে সক্ষম হয়েছেন। অন্তর পবিত্র করা যায় না জগতের তাবত্ কেতাব মুড়ির মত চিবিয়ে খেলেও। অন্তর পবিত্র করার একমাত্র মহৌষধ হল খাঁটি মোর্শেদের ফায়েজ বা তাওয়াজ্জোহ। একজন সাধক উক্ত ফায়েজ নিজ অন্তরে ধারণ করে কঠোর সাধনা করার মাধ্যমে নিজেকে শুদ্ধ ও পবিত্র করে তোলেন। আর তখনই নামাজে আল্লাহর দর্শন লাভ হয়। রসূলপাক (স.) ফরমান, “আল্লাহতায়ালা ও নামাজীদের মধ্যে কোন পর্দা থাকে না।” মোমেন আল্লাহর সামনে নিজেকে সপে দেন। এ সময় বিনম্রতায় কেবলই তার কান্না আসে। হাদিসে শরীফে আছে,“নামাজ পড়ার সময় নবীজি (স.)-এর সিনাহ মোবারক হতে ক্রন্দনের দরুন যাতাকলের শব্দের ন্যায় বের হত।” অন্য হাদিসে আছে, “ফুটন্ত ডেগচীর ন্যায় আওয়াজ বের হত।” হযরত আলী (রা.) বলেন, “বদরের যুদ্ধে আমি দয়াল নবীজি (স.) কে একটি বৃক্ষের নীচে সারারাত্রি নামাজ পড়তে ও ক্রন্দন করতে দেখেছি।” হযরত মুজাহেদ (রা.) বলেন, “সাহাবীদের মধ্যে যারা ফকীহ ছিলেন, তাঁরা নামাজে দাঁড়ালে আল্লাহর ভয়ে ভীত হয়ে পড়তেন।” হযরত জয়নুল আবেদীন (রা.) এর অজুর সময় চেহারা হলুদ বর্ণ হয়ে যেত এবং নামাজে সর্বাঙ্গে কম্পন এসে যেত। সুফিগণ এলহাম, কাশফ, স্বপ্ন ও ফায়েজ দ্বারা ধর্মকর্ম সম্পাদন করেন। সাধনা করে যিনি এ চারটি অবস্থা নিজের মধ্যে আয়ত্ব করতে পেরেছেন তিনি ইবাদতের হাকিকত সঙ্গে সঙ্গে বুঝে থাকেন। নফসের দুটি নালা বা মুখ। একটি জীবাত্মার দিকে আর অন্যটি পরমাত্মার দিকে। যখন কোন সাধকের নফসের নালা জীবাত্মার দিকে খোলা থাকে তখন তার কাছে নামাজ, রোজা, মোরাকাবাসহ কোন ইবাদতই স্বাদ লাগে না। যেমন জ্বরের রোগীর কাছে চিনি তিতা লাগে ঠিক তেমনি। কিন্তু সাধক যখন তরীকতের স্বাদ নিজের মধ্যে আয়ত্ম করে কলবের দ্বারা ফায়েজ ধরতে পারে অর্থাত্ তার নফসের মুখ থাকে পরমাত্মার দিকে তখন যে কোন ইবাদত করতে তার স্বাদ লাগে, ইবাদত শেষ করতে মন চায় না। আল্লাহপাকের নৈকট্যের জন্যই মোমেনের নামাজ।