নগরকোটের গাঢ় কুয়াশায়

আপডেট : ২৯ মে ২০১৪, ২০:৩৬
নেপালের তরাই অঞ্চল উষ্ণ হয়ে উঠতেই আমি চলে আসি নগরকোটে। কাঠমুন্ডু থেকে মাত্র তিরিশ কিলোমিটার দূরে এ হিল স্টেশনের আলটিচিউড ২,১৭৫ মিটার। এখানে সামার সিজনেও গাছপালা ঢেকে থাকে শুভ্র মসলিনের মতো মিহি কুয়াশায়। পর্যটকরা এখানে আসে মূলত সূর্যস্নাত শিশিরের বর্ণবিভা দেখতে। এখানকার গেস্টহাউসগুলো হয় ঝুলে আছে পাহাড়ের খাড়াই ঢাল থেকে, অথবা দাঁড়িয়ে আছে রীতিমতো মাঝারি মাপের পর্বতচূড়ায় নাঙ্গা আকাশের নিচে। আমি যে গেস্টহাউসের খোলামেলা ছাদে বসে আছি সেখান থেকে আলাভোলা হাওয়ায় কুয়াশা উড়ে গেলে পশ্চিমে, হিমালয়ের তুষার ধবল গিরিশৃঙ্গ দৌলাগিরি থেকে কাঞ্চনজঙ্ঘা অব্দি বিস্তৃত পর্বত ও উপত্যকার মিশ্রিত প্যানোরমা উপভোগ করা যায়। খুব ঘন হয়ে আজ কুয়াশা পড়েছে। কিন্তু এ কুয়াশা সারা চরাচর পাহাড় প্রান্তরকে সম্পূর্ণরূপে ঢেকে দেয়নি। কুয়াশা এখানে চলমান ও কুণ্ডুলায়িত। কিছুক্ষণ এক জায়গায় জলস্রোতের ঘূর্ণির মতো ঘুরপাক খেয়ে মৃদু গতিতে ঢেকে দেয় অন্য জায়গা। আমি ছাদের ওপর বসে দূর পাহাড়ের ঢালে টেরাস বা মাটি কেটে ধাপে ধাপে ফলানো যবক্ষেতের ভিউ পরিষ্কারভাবে দেখতে পাই। কিন্তু আমার আশপাশের গেস্টহাউসগুলো ঢেকে আছে ঘন অবর্তিত ধূসর কুয়াশায়। কুয়াশা ঘুরপাক খেতে খেতে বাতাস লাগা পালের মতো সরে গেলে উত্তরে—আমি কাছের একটি গেস্টহাউসের ছাদ স্পষ্ট দেখতে পাই। ওখানে চেয়ারে বসে রেলিংয়ে দু পা তুলে রিলাক্স করছে জেনেফার। সে সিগ্রেট স্মোক করতে করতে পড়ছে একটি বই, সামনে রাখা ড্রিংকসের গ্লাস। তা তার বাচ্চা দুটো গেল কোথায়? সন্ধ্যা হতে এখনো অনেক বাকি। এত তাড়াতাড়ি এ দস্যি ছেলে দুটোর ঘুমিয়ে পড়ার তো কথা না? জেনেফার বিলাত থেকে নেপালে এসেছে দু’টি বাচ্চা ছেলে নিয়ে। তাদের একটির বয়স সাড়ে পাঁচ, অন্যটির দুই। তার বয়স চল্লিশের কাছাকাছি। নারী হিসেবে সে সুদর্শনা নয় একেবারেই। অনেকদিন চুনকাম না করা ঘরের দেয়ালে লেগে থাকা দাগের মতো তার মুখে মেছতার গাঢ় ছাপ। নেপালের বোলচাল হাল হকিকত সে একেবারেই বুঝতে পারে না। সারাক্ষণ সে কোনো না কোনো কারণে কনফিউজড্ হয়ে আছে। কখনো কখনো তার মেজাজ তিরিক্ষি হয়ে ওঠে দাগা খাওয়া মানুষের মতো। আমি অনেকক্ষণ হয় ছাদে বসে বাইনোকুলারে দূরের পাহাড় স্কেন করছিলাম। একটু আগে হুড়মুড় করে সারা আকাশ জুড়ে রোদ গড়িয়ে নামলে দুঃস্বপ্ন থেকে ধড়মড়িয়ে জেগে ওঠার মতো তাবত্ কুয়াশা উপে যায় নিমিষে। আর এ বিরল মুহূর্তে আমি উপত্যকায় পশ্চিম দিগন্তে দৌলাগিরি থেকে অন্নপূর্ণা রেঞ্জের সম্পূর্ণ ছায়া একসাথে দেখতে পাই। ভাবি, এ বিষয়টি ডায়েরিতে নোট করে রাখব। প্রকৃতি আজ সত্যিই আমার প্রতি প্রসন্ন হয়েছেন। ডায়েরির পৃষ্ঠা খুলে কলম হাতে নেয়ার আগেই কাঞ্চনজঙ্ঘার ওপারে পুবালি বাতাসে ভেসে আসে এভারেস্ট তার তাবত্ শুভ্রতা নিয়ে। না, তেমন কিছু নোট নেয়া হয় না, কেবল তাকিয়ে থাকি মৌন সীমাহীন সফেদ দৃশ্যপটের দিকে। জেনেফার অন্য গেস্টহাউস থেকে আমাকে দেখতে পায়। সে ড্রিংকসের গ্লাস দেখিয়ে হাতের ইশারায় একাকী বসে না থেকে তার ছাদে চলে আসার জন্য আহ্বান জানায়। একটু সঙ্গ পেলে খারাপ হয় না। তাই ছাদ থেকে নেমে কাঠের বিজ্রের ওপর দিয়ে তার ছাদে যাওয়ার উদ্যোগ নিই। জেনেফারের সঙ্গে একটু সময় কাটাতে ইচ্ছা হয়, আবার সাথে সাথে উদ্বেগও হয়। বিলাত থেকে বেড়াতে আসা এ নারী গড়পড়তা পাশ্চাত্য পর্যটকদের বিত্তের নিরিখে দরিদ্র। লেবার ক্লাস ব্যাকগ্রাউন্ডের ভেতর সে বেড়ে উঠেছে বলে, কিছু বলতে তার ঠোঁটে আটকায় না একেবারে। ককনি উচ্চারণে সঙ্গম সংক্রান্ত খিস্তিখেউড় করে সে অবলীলায়। জেনেফার সদালাপি হলেও হালফিল হিসসিম খেয়ে যাচ্ছে একা বাচ্চা দুটোকে সামলাতে। তার সাড়ে পাঁচ বছরের ছেলেটি গেল ক’দিন ধরে পর্যটক মহলে আলোচিত হচ্ছে। সে ছাদে পানির ট্যাংকের ওপর চড়ে তার ধাতব কার্নিশে ঝুলে থেকে প্রাণের ভয়ে ককনি উচ্চারণে অশ্লীল ভাষায় গালিগালাজ শুরু করলে তাকে উদ্ধার করার জন্য মই খুঁজতে হয়। তারপর অন্যদিন বেলকনিতে বসে এক স্কটিশ সাহেব পান করছিলেন। তিনি উঠে কামরায় বাথরুম সারতে গেলে বাচ্চাটি তার হোয়াইট হর্সের বোতল থেকে সমস্ত তরল ঢেলে দেয় টবে রাখা ফুলগাছের গোড়ায়। বাচ্চা দু’টিকে সামলাতে গিয়ে পর্যটনে এসে জেনেফারের তেমন কিছু দেখা হচ্ছে না। দিন দুয়েক আগে ইন্দ্রাবতী নদীর কাছাকাছি দাঁড়িয়ে গৌরীশঙ্করের ৭,১৪৫ মিটার উঁচু চূড়া দেখার সময় আমি জেনেফারকে সঙ্গ দিই যাতে ডিফিকাল্ট বাচ্চা দুটোকে ম্যানেজ করতে তার সুবিধা হয়। তার দুই বছরের ছেলেটি এমনই হাইপার অ্যাক্টিভ যে তার চঞ্চলতাকে নিয়ন্ত্রণের জন্য জেনেফার তাকে সারাক্ষণ লিস্ বা কুকুরের মতো চেন বকলস দিয়ে বেঁধে রেখেছিল। ব্রিজ থেকে নেমে অন্য ছাদে এসে দেখি, জেনেফার এ মুহূর্তে পেপারব্যাক বইয়ের মার্জিনে বলপ্যান দিয়ে লেখালেখি করছে। তার পয়সাকড়ি বোধ করি শেষ হয়ে আসছে, তাই সে সস্তা নেপালি রক্সি খাচ্ছে। খামোখা খিলখিল করে হেসে উঠলে বুঝতে পারি—অত্যাধিক পানে তার বেহেড হতে আর বেশি দেরি নেই। জিজ্ঞেস করি, ‘খবর কিছু পেলে কি?’ ‘ইয়েস, চন্দ্রমোহন থাপা নগরকোটেই আছে। সে নাম বদলিয়েছে হয়েছে তোপ থাপা। মাঝে মাঝে সে ট্যুরিস্টদের গাইড হিসেবে কাজ করে। তবে এ তথ্য সঠিক কি না তা বোঝার উপায় নেই। সুতরাং আমাকে অপেক্ষা করতে হবে তাকে ফেস টু ফেইস ধরার জন্য।’ ‘হোয়াট ইজ দ্যা সোর্স অব দিস ইনফরমেশন? কীভাবে জানলে চন্দ্রমোহনজী নগরকোটেই আছে?’ জেনেফার পেপারব্যাকের ভেতর থেকে দুটি ছবি বের করে আমাকে দেখায়। পলোরয়েড ক্যামেরায় তোলা একটি ছবিতে এক নেপালি পুরুষ পিট বাঁকিয়ে বয়ে নিয়ে যাচ্ছে খড়ের বিপুল বোঝা। সে জেনেফারকে চন্দ্রমোহনজীর সংবাদ দেয়। জেনেফার এবার অন্য ফটোগ্রাফটি আমাকে দেখায়। তাতে পাহাড়ের ঢালে সিঁড়ির মতো ধাপে ধাপে উঠে যাওয়া টেরাসে টিনের কয়েকটি দোচালা ঘর। খড় বয়ে নিয়ে যাওয়া মানুষটির সূত্র ধরে দিন কয়েক আগে জেনেফার পায়ে হেঁটে এ পাহাড়ি গ্রাম অব্দি যায়। একে তাকে জিজ্ঞাসাবাদ করে তার ধারণা হয়েছে যে, চন্দ্রমোহনজী এ গ্রামে একটি কামরা ভাড়া নিয়েছে। বেশ রাত করে তার ঘরে ফেরা অভ্যাস, সুতরাং তাকে ধরা যায়নি। ‘তা ওই গ্রামে সন্ধ্যেবেলা হাতে সময় নিয়ে আবার ফিরে যাচ্ছ না কেন জেনেফার?’ আমার প্রশ্নে চটে গিয়ে সে জবাব দেয়, ‘স্টুপিড বাচ্চাদের নিয়ে হেঁটে তো ওখানে যাওয়া যাবে না। তাদের যেকোনো বেবিসিটারের কাছে রেখে যাব, সে রকম নেপালি আয়াও তো পাচ্ছি না, ডোন্ট নো, হাউ টু গো দেয়ার?’ ‘তা ওই দিন যে গ্রামে গেলে তখন বাচ্চাদের কার কাছে রেখে গিয়েছিলে?’ জেনেফার আমার দিকে নিরিখ করে তাকিয়ে যেন ভাবে—ব্যক্তিগত তথ্য আমার মতো বেগানা বিদেশি পুরুষের সাথে শেয়ার করা কতটা যুক্তিসঙ্গত হবে? তারপর নতমুখি হয়ে বলে, ‘গেস্টহাউস নেপালি আয়া জোগাড় করে দিয়েছিল। তার কাছে বাচ্চাদের রেখে চন্দ্রমোহনের খোঁজে গ্রামে যাই। ফিরে এসে দেখি আয়া খুব গোলামাল করছে। সে নাকি ঝিমিয়ে পড়ছিল, তখন আমার ফাইভ ইয়ার্স ওল্ড গোর্খা বাস্টার্ড কাঁচি দিয়ে তার চুল কেটে দিয়েছে। সো, ইউ আন্ডারস্ট্যান্ড, বেবিসিটার আয়া পাওয়া যাচ্ছে না। এদের দেখভাল করতে কেউ রাজি হচ্ছে না। নাও আই অ্যাম স্টাক, ড্যাম স্টাক হিয়ার।’ ‘তা বাচ্চাদের আজ কী করেছ?’ জেনেফার টেবিলের ওপর রাখা রেডিও মনিটর দেখিয়ে বলে, ‘তাদের ঘুম পাড়িয়েছি, দুধের সাথে একটু সিডেটিভ দিতে হয়েছে। কী করব? গেল দু’রাত একেবারে ঘুমাতে পারিনি ছোটটার কান্নাকাটিতে। হি ইজ অ্যা কলিগি বেবি, হি উড নট স্লিপ অ্যাটঅল। আই নিড অ্যা ব্রেক, আমার একটু নিজস্ব সময় দরকার। আমি রেডিওতে মনিটর করছি। এরা জেগে উঠলে রেডিওতে নয়েজ শোনা যাবে।’ জেনেফারের পান আজ খুব বেশি হয়ে যাচ্ছে। সে বারবার হিক্কা তুলে অস্থিরতা ছড়ালে আমি নিচ থেকে তার জন্য নিম্বুপানি নিয়ে আসি। সে তা পান করে, ‘ও লর্ড, আই ক্যান্ট টেক ইট এনি মোর’, বলে দ্বীর্ঘশ্বাস ছাড়লে আমি মন্তব্য করি, ‘ক্যান্ট ইউ জাস্ট ফরগেট দ্যা ব্লাডি চন্দ্রমোহন, অ্যান্ড গো ব্যাক হোম।’ জবাবে সে বলে, ‘আই ডোন্ট নো ইফ ইট ওয়াজ লাভ আর হোয়াট? গোর্খাম্যান চন্দ্রমোহন লন্ডনে ব্রিটিশ আর্মিতে কাজ করছিল। উইকয়েন্ডে আমার সাথে তার দেখা হতো। আমরা ওয়ার্কার ক্লাসের তীব্র হৈহোল্লোড়ে ভরা পাবে গিয়ে বিটারের পাইন্ট নিয়ে বসতাম।’ একটু পজ নিয়ে খানিকক্ষণ নীরব থেকে সে আবার বলে, ‘হি ওয়াজ ভেরি স্ট্রং, অ্যান্ড তার ডিউরেশন ছিল দীর্ঘ। আমি অনেক ইংরেজ ছেলের সাথে আগে ডেট করেছি। কিন্তু চন্দ্রমোহনজীর মতো সুইট অ্যান্ড স্ট্রং কেউ ছিল না। আমিই চাইতাম সে অনেকক্ষণ আমার অভ্যন্তরে সক্রিয় থাকুক তার পাহাড়ি বলিষ্ঠতা নিয়ে। শুধু তার ম্যানলিনেসই নয়, সে আমার জন্য খুব কেয়ারও করত। হি ওয়াজ নট অ্যাট অল লাইক এনি স্টুপিড অর্ডিনারি ইংলিশম্যান, হি ওয়াজ সো স্পেশাল। আমার জন্য তার কেয়ার ছিল সত্যিই খুব সুইট অ্যান্ড টেন্ডার।’ ‘তা তুমি তাকে বিয়ে করোনি কেন জেনেফার?’ ‘ করতে তো চেয়েছিলাম, সে বলেছিল—নেপালের মন্দিরে হিন্দুমতে আমাদের বিবাহ হবে। বাট সাডেনলি সে আমাকে কিছু না বলে আর্মি থেকে আর্লি রিটায়ারমেন্ট নিয়ে নেপাল ফিরে আসলো।’ ‘লিসেন, হি চিটেড ইউ। তাকে যে নেপালে খুঁজে পাবে এ রকম গ্যারান্টিও তো নেই।’ জেনেফার ক্ষেপে উঠে বলে, ‘বাট হোয়াই আই শুড বি টেইকিং কেয়ার অব হিজ টু ডিফিকাল্ট বেবিজ অল এলোন। তার বাচ্চাদের লালন পালন করা শুধু কি আমার দ্বায়িত্ব?’ রেডিওতে দপ দপ করে জ্বলে উঠছে লালবাতি, ভেসে আসে একটি শিশুর ক্রন্দন। ‘টু হেল উইথ এভরি থিং’ বলে জেনেফার গ্লাস নিচের ঝোপে ছুড়ে ফেলে ফিরে যায় তার কক্ষে। আমি ছাদে একা বসে তাকিয়ে থাকি দূরের পাহাড়ি প্যনোরমার দিকে। কুণ্ডুলায়িত কুয়াশায় কিছু কিছু দৃশ্যপট দ্রুত ঢেকে যেতে থাকে।