সামাজিক ব্যবসা : ড. মুহাম্মদ ইউনূস
প্রথম প্রকাশ :ফেব্রুয়ারি ২০১৪
প্রচ্ছদ :মশিউর
প্রকাশক :অনন্যা
মূল্য :২৫০ টাকা
আমার সারা জীবনের পাঠ্য বিষয়ে অর্থনীতি না থাকলেও, অর্থনীতির বিষয় পড়তে আমার খুব ভালো লাগে। সেই ভালো লাগা এবং জানার আগ্রহ থেকেই ‘সামাজিক ব্যবসা’ নামক গ্রন্থখানি পড়তে শুরু করি। এই বইখানি লিখেছেন ড. মুহাস্মদ ইউনূস। তিনি একজন নোবেল বিজয়ী মানুষ। আমি তাঁর লেখা ‘ক্রিয়েটিং এ ওয়ার্ল্ড উইদাআউট প্রোভার্টি’ গ্রন্থখানিও পড়েছি। পড়ে সত্যি অভিভূত হয়েছিলাম। এই বইটিও আমাকে প্রভাবিত করেছে। কারণ, এতে বর্ণিত আছে সামাজিক ব্যবসা আসলে কী? সামাজিক ব্যবসার বিভিন্ন বিষয়, দিক এবং বইয়ের দ্বিতীয় ভাগে রয়েছে সামাজিক ব্যবসা নিয়ে ড. ইউনূসের সাথে দীর্ঘ কথোপকথনের এক অনন্য দলিল। সামাজিক ব্যবসার মূল চিন্তা নিয়ে ড. মুহাম্মদ ইউনূস বলেছেন, ‘সামাজিক ব্যবসা একটা ধারণা এবং একই সাথে একটি অভিজ্ঞতা। মানুষ এখন তার মূল্যায়ন করবে। প্রথমত, এটা হলো একটা তাত্ত্বিক কাঠামো। পুঁজিবাদী তত্ত্বে ব্যবসা মানেই হলো মুনাফা অর্জনের হাতিয়ার। কাজেই সারা পৃথিবী জানপ্রাণ দিয়ে মুনাফা অর্জনের কাজে লেগে গেছে। কে কত বেশি মুনাফা অর্জন করতে পারে তার তীব্র প্রতিযোগিতা চলছে। যে যত বেশি মুনাফা অর্জন করবে তার জন্য তত বেশি বাহবা, তার কাছে তত বেশি ক্ষমতা। কিন্তু পুঁজিবাদী শাস্ত্রে একটা বিরাট শূন্যতা আছে। তাই আমি সামাজিক ব্যবসার তত্ত্ব দিয়ে এ শূন্যতা পূরণের প্রস্তাব দিলাম। এটা শুধু আমার মত। অন্য কারও অন্য প্রস্তাব থাকলে সেটাও আসুক। কিন্তু এখনি সঠিক সময়। এখন আমাদেরকে মৌলিক সংশোধনে মনোযোগ দিতে হবে। এটা মনে রাখা দরকার যে, সামাজিক ব্যবসার এই নেতৃত্বটা একক ব্যক্তির হাতের জিনিস না। এটা সবার। সবার হাতে এর নেতৃত্ব।’ দেখা যায় যে, বিশ্বের অর্থনৈতিক মানচিত্রে দুটি ‘তত্ত্ব’ দীর্ঘদিন যাবত প্রতিষ্ঠিত। পুঁজিবাদ ও সমাজতন্ত্র। নানা কারণে ‘সমাজতন্ত্র’ এখন আর আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে নেই। কিন্তু দোর্দণ্ড প্রতাপে ‘পুঁজিবাদ’ বিরাজ করছে সারা পৃথিবী জুড়ে। সেই পুঁজিবাদও আজ নানা সংকট ও প্রশ্নের সস্মুখীন। বিশ্বের ধনবাদী দেশগুলো এখন আর সনাতন পুঁজিবাদে সন্তুষ্ট নয়। তাঁদের অনেকেই মনে করেন পুঁজিবাদের একটা সংস্কার হওয়া দরকার। এরকম বিশ্ব অর্থনৈতিক পরিস্থিতির প্রেক্ষাপটে ক্ষুদ্র ঋণের উদ্ভাবক নোবেল শান্তি পুরস্কার বিজয়ী প্রফেসর মুহাম্মদ ইউনূস বিশ্বের কাছে তুলে ধরেছেন তাঁর সাম্প্রতিক ‘সামাজিক ব্যবসা’ তত্ত্ব। এই ব্যবসায় বিনিয়োগকারী একটা সামাজিক সমাধানের লক্ষ্যে বিনিয়োগ করবেন, কিন্তু সেই ব্যবসা থেকে কোনো মুনাফা গ্রহণ করবেন না। শুধু বিনিয়োগের অর্থ তুলে নিতে পারবেন। মুনাফার অর্থ দিয়ে নতুন কোনো সামাজিক ব্যবসা শুরু করতে পারেন কিংবা বর্তমান ব্যবসায় মুনাফা বৃদ্ধির যে উন্মাদনা দেখা যায় তার বাইরে ব্যবসাকে সামাজিক কল্যাণের জন্য নিয়ে আসাই সামাজিক ব্যবসার মূলকথা। একই সঙ্গে দেশে বিরাজমান নানা সমস্যার সমাধান করা হবে অনুদান বা চ্যারিটির ভঙ্গিতে নয়, সম্পূর্ণ ব্যবসায়িক ভঙ্গিতে।
প্রফেসর মুহাম্মদ ইউনূসের নতুন এই অর্থনৈতিক তত্ত্ব আজ বিশ্বের নানা দেশে ব্যাপক আলোচনার জন্ম দিয়েছে। বাংলাদেশসহ বিভিন্ন দেশে নানা ধরনের সামাজিক ব্যবসা ইতিমধ্যে শুরুও হয়ে গেছে। বিশ্বের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি ও ব্যবসা বিদ্যার কারিকুলামে অন্তর্ভুক্ত হয়েছে সামাজিক ব্যবসা। কয়েকটি দেশের সরকার তাদের উদ্যোগে সামাজিক ব্যবসা বিষয়ক গবেষণা ইনস্টিটিউটও প্রতিষ্ঠা করেছেন। বিশ্বের সামনে আজ ড. ইউনূস তাঁর সামাজিক ব্যবসা তত্ত্বকে পাঠকের জন্য সহজ ভঙ্গি ও ভাষায় তুলে ধরেছেন। তাঁর এই গ্রন্থখানি সামাজিক ব্যবসার এক মাইলফলক।
