শাহবাগ থেকে রূপসী বাংলা আর সোনারগাঁও হোটেল ছুঁয়ে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় ঘেঁষে আলো ঝলমলে কাজী নজরুল ইসলাম এভিনিউ চলে গেছে বিমানবন্দরের দিকে। রাজধানীর প্রধানতম এ সড়কটিতে আলোর রোশনাই যেন হুট করেই কমে যায় বনানী রেলক্রসিং পেরিয়ে যাবার পরে। অথচ এই রাস্তাই ঢাকার শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর থেকে রাজধানীতে প্রবেশের প্রধানতম পথ।
রাতের রাজধানীতে নিজের গাড়ি নিয়ে ঘুরে বেড়ানোর একটা আলাদা মাদকতা আছে। সুনসান রাস্তায় পরিবারের সবাইকে নিয়ে ঘুরতে বের হন অনেকেই। বন্ধুদের নিয়ে লং ড্রাইভেও ছোটেন অনেক তরুণ-তরুণী। কিন্তু যারা প্রয়োজনে ভাড়া গাড়ি বা সিএনজি অটোরিকশায় চলাফেরা করেন তাদের কাছে বিষয়টি আর আনন্দের থাকে না। যেমন আনন্দের ক্ষণ হিসাবে তা ধরা দেয় না, বিদেশ থেকে দেশে পা রাখা স্বল্প আয়ের মানুষদের কাছে। যে সব যাত্রী বিদেশ থেকে গভীর রাতে দেশে ফেরেন তাদের অনেকেই নিরাপত্তার অভাবে আটকে থাকেন বিমানবন্দর এলাকাতেই। যাদের নিজের গাড়ি রয়েছে তাদের জন্য তেমন সমস্যার কারণ না হলেও যারা ভাড়া গাড়ি নিয়ে বাড়ি ফিরতে চান ঝুঁকি তাদের।
বিমানবন্দর এলাকা যাত্রীদের জন্য খুবই নিরাপদ স্থান। সেখানে কাস্টম চেকিং সেরে লাগেজ সংগ্রহ করে বাইরে বের হয়ে যতক্ষণ ইচ্ছা কাটাতে পারেন যাত্রীরা। বিমানবন্দরের বিশেষ নিরাপত্তাকর্মীদের কঠোর নজরদারিতে থাকে পুরো বিমানবন্দর এলাকা। কিন্তু বিমানবন্দর থেকে বের হয়ে মূল রাস্তাতে পড়লেই অন্ধকারে যেন ওঁত পেতে থাকে নিরাপত্তাহীনতা।
গত কয়েকদিন ধরে রাতে বিমানবন্দর এলাকা ঘুরে দেখা গেল বিদেশ থেকে সাধারণ আয়ের মানুষ যারা আসেন তারা সবাই ভোর হওয়ার অপেক্ষা করেন। কেউই বিমানবন্দর ছেড়ে বাইরে যান না। এমনকি যাদের সকালে ফ্লাইট কিন্তু রিপোর্টিং টাইম রাত তিনটা বা চারটার দিকে তারাও রাত বারোটার আগেই চলে আসেন বিমানবন্দরে। কেউই গভীর রাতে আসার ঝুঁকি নিতে চান না।
শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের উল্টো পাশে বিভিন্ন দোকানি ও স্থানীয় লোকজন জানালেন, বিমানবন্দরের যাত্রীদের টার্গেট করে ছিনতাই করে এমন বেশ কয়েকটি গ্রুপ রয়েছে এ এলাকায়। ফলে বিমানবন্দর থেকে বের হওয়া যাত্রীদের সর্বস্ব কেড়ে নিয়ে রাস্তায় নামিয়ে দেয়ার মত ঘটনা প্রায় নিয়মিতই ঘটছে।
সিঙ্গাপুরে নির্মাণ শ্রমিক হিসাবে কর্মরত মোহাম্মদ আলম। বাড়ি কুমিল্লার মুরাদনগরে। আলম জানালেন, রাত সোয়া একটার সময় প্লেন থেকে নামছি। কিন্তু এয়ারপোর্ট থেকে বের হই নাই। মালপত্র টাকা-পয়সা নিয়ে রাত-বিরাতে বের হলেই ছিনতাই হয়। এয়ারপোর্ট থেকে প্রাইভেট কার ভাড়া করে বের হলে রাস্তায় থামায়, ছিনতাই হয়। নাইলে গাড়ি ফলো করে ফাঁকা রাস্তায় আটকায়, ছিনতাই হয়। এত কষ্ট করে টাকা জমায়ে আনি- তা নিয়ে এই রাতের বেলায় বের হওনের কাম নাই। কিন্তু বাইরে বসে থাকাও একটা ভোগান্তি।
ফরিদপুর সদরের চর রামনগরের ফরিদা লেবাননে ছয় বছর ধরে গৃহকর্মীর কাজ করেন। দেশে এক মাস ছুটি কাটিয়ে কাজে ফিরছেন। তিনি বললেন, আমার রিপোর্টিং টাইম ভোর পাঁচটায়। কিন্তু স্বামী-বাচ্চাদের নিয়ে চলে এসেছি রাত সাড়ে বারোটার মধ্যেই। এত আগে কেন? উত্তরে বললেন, একবার রাতে ফেরার সময় রাস্তায় গাড়ি থামায় সব কাইড়া নিছিল। এরপর আর রাত করি না।
ফরিদার মত অনেক আগেই চলে এসেছেন চাঁপাইনবাবগঞ্জ থেকে আসা আব্দুল মান্নান, শহিদুল ইসলাম, এরফান। তারা যাবেন কাতার। ফ্লাইট সকাল ছয়টায়। কিন্তু বিমানবন্দরে পৌঁছে গেছেন রাত এগারোটার দিকে। নিরাপত্তার কারণেই আগে চলে এসেছেন বলে জানালেন তারা।
বিমানবন্দরে ভাড়ায় চালিত গাড়ির চালক মোহাম্মদ মশিউর রহমান সুমন বললেন, দুই ধরনের ছিনতাই হয়। এক গাড়ির ড্রাইভার জড়িত থাকে। তারা জায়গা মত নিয়ে গিয়ে থামিয়ে সব কেড়ে নেয়। তাদের দলের লোকও আগে থেকেই সেখানে থাকে। আরেক ধরনের ছিনতাই হয় গাড়ি আটকিয়ে। তবে এই ছিনতাই আগের চেয়ে অনেক কমে এসেছে। রাস্তায় পুলিশের চেকপোস্ট রয়েছে, সব সময় টহল থাকে। ফলে আগের তুলনায় ছিনতাই কমেছে। কিন্তু যাত্রীরা ঝুঁকি নিতে চায় না। তাই আমরা রাতের ভাড়া খুব কমই পাই।
তবে বিমানবন্দরের সামনে কতর্ব্যরত টহল পুলিশের এক কর্মকর্তা জানালেন, এই রাস্তায় আমাদের সার্বক্ষণিক নিরাপত্তা ব্যবস্থা রয়েছে। এছাড়া একাধিক টহল পুলিশ দল ডিউটি করে যাত্রীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে। এরপরও যেসব ঘটনা ঘটছে তা বিচ্ছিন্ন ঘটনা বলে উল্লেখ করেন তিনি।
