রাজধানীর মতিঝিলে প্রকাশ্য দিবালোকে সন্ত্রাসীদের গুলিতে নিহত হয়েছেন পানি উন্নয়ন বোর্ডের ঠিকাদার হাজী মোহাম্মদ সুলতান আহমেদ (৪২)। ঘটনার পর হত্যাকারীরা ফাঁকা গুলি ছুঁড়তে ছুঁড়তে বীরদর্পে হেঁটে ঘটনাস্থল ত্যাগ করে। গতকাল বৃহস্পতিবার সকাল পৌনে ১১টার দিকে আরামবাগ পুলিশ বক্সের কাছে এ ঘটনা ঘটে।
এছাড়া গতকাল সকালে কাফরুল সেনপাড়া পর্বতা এলাকা থেকে উদ্ধার করা হয় ৯৮ নম্বর ওয়ার্ড যুবলীগ কর্মী ও চা বিক্রেতা মিজানুর রহমানের (২৬) গলাকাটা লাশ। উভয় ঘটনায় জড়িত অভিযোগে পুলিশ কাউকেই গ্রেফতার করতে পারেনি। নিহত ঠিকাদার সুলতান আহমেদের ব্যক্তিগত গাড়ির চালক আমিন হোসেন জানান, পৌনে ১১টার দিকে তিনি সুলতান আহমেদকে নিয়ে সবুজবাগের বাসা থেকে বের হয়ে ১০/৩ আরামবাগস্থ (কালভার্ট রোড) মকবুল প্লাজায় পৌঁছেন। এ প্লাজার তৃতীয় তলায় তার ব্যবসা প্রতিষ্ঠান (এসএএসআই এন্টারপ্রাইজ) রয়েছে। সুলতান আহমেদ গাড়ি থেকে নেমে প্লাজার দিকে এগিয়ে যান। কিছুক্ষণ পর তিনি কয়েক রাউন্ড গুলির শব্দ শুনতে পান। দ্রুত এগিয়ে গিয়ে দেখেন তার স্যার গুলিবিদ্ধ অবস্থায় পড়ে আছেন। উপস্থিত লোকজনের সহায়তায় দ্রুত তাকে উদ্ধার করে ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের জরুরি বিভাগে নিয়ে যান। সকাল সাড়ে ১১টার দিকে কর্তব্যরত চিকিত্সক তাকে মৃত বলে ঘোষণা করেন।
নিহতের ব্যক্তিগত সহকারী কামরুল হাসান শাম্মী জানান, ঘটনার সময় তিনি সুলতান আহমেদের সঙ্গেই ছিলেন। কিছু বুঝে ওঠার আগেই দুই যুবক খুব কাছ থেকে তাকে লক্ষ্য করে পরপর কয়েক রাউন্ড গুলি করে দ্রুত পালিয়ে যায়। শাম্মী ও চালক আমিন ‘ধর ধর’ বলে চিত্কার দিলে তারা কয়েক রাউন্ড ফাঁকা গুলি ছোঁড়ে। হঠাত্ গুলির শব্দ শুনে এলাকায় আতংক ছড়িয়ে পড়ে। লোকজন দিগবিদিক ছুটোছুটি শুরু করে। আশপাশের দোকান বন্ধ হয়ে যায়।
প্রত্যক্ষদর্শীদের বরাত দিয়ে মতিঝিল থানা পুলিশ জানায়, হত্যাকাণ্ডে দুই যুবকই অংশ নিয়েছিল। তারা আগে থেকেই ভবনের সামনে অপেক্ষা করছিল।
মতিঝিল বিভাগের ডিসি আশরাফুজ্জামান বলেন, কী কারণে সুলতান আহমেদকে হত্যা করা হয়েছে তা নিশ্চিত করা যায়নি। আমরা নিহতের পরিবারের সঙ্গে কথা বলেছি। তারা প্রাথমিকভাবে কিছুই জানাতে পারেননি। আমিন হোসেন ও কামরুল হাসান শাম্মীকে জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়েছে। তারাও কোন ধরনের তথ্য দিতে পারেননি। তবে ঠিকাদারী নিয়ে দ্বন্দ্বসহ বেশ কিছু বিষয় মাথায় রেখে তদন্ত চলছে। হত্যাকারীদের গ্রেফতারে পুলিশ অভিযান শুরু করেছে।
সুলতান আহমেদের অফিসের স্টাফরা জানান, সুলতান আহমেদ সম্প্রতি যমুনা নদীর তীর সংরক্ষণ প্রকল্পের কাজ পান। আর তা চলতি মাসে শেষ করে বুড়িগঙ্গা নদী পুনরুদ্ধারে ৭০ কোটি টাকার কাজ পান। এ নিয়ে তার সঙ্গে কারো কোন ধরনের বিরোধ তৈরী হয়নি। তবে ২০১০ সালে পাবনার বেড়ায় পানি উন্নয়নের একটি কাজ নিয়ে আফজাল হোসেন নামে এক ব্যক্তির সঙ্গে তার বিরোধ ছিল। আফজাল হোসেন ঐ সময় তার কাছে মোটা অংকের চাঁদা দাবি করেছিল। আর চাঁদার টাকা না দেয়ায় আফজালের লোকজন সুলতান আহমেদকে ২০১১ সালে অপহরণও করেছিল। আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর সহায়তায় তিনি উদ্ধার হয়েছিলেন। এ ঘটনায় মামলা হয়। বর্তমানে মামলাটি বিচারাধীন ।
নিহত সুলতান আহমেদের বাসা বাসাবোর ৮৫/২/বি কদমতলায়। গ্রামের বাড়ি ঢাকার ধামরাই উপজেলার কৃষ্ণনগর। পিতা মৃত হাজী মোহাম্মদ ইব্রাহিম মিয়া। তিনি এক ছেলে ও দুই মেয়ের জনক ছিলেন। ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ মর্গে ময়নাতদন্ত শেষে গতকালই লাশ দাফনের জন্য গ্রামের বাড়িতে নিয়ে যাওয়া হয়েছে।
যুবলীগ কর্মীর গলাকাটা লাশ: গতকাল ভোরে ১৮৯, সেনপাড়া পর্বতা নিজ বাসার সামনে রাস্তায় যুবলীগ কর্মী মিজানুর রহমানের লাশ পড়ে থাকতে দেখে এলাকাবাসী কাফরুল থানায় খবর দেয়। খবর পেয়ে পুলিশ সকাল সাড়ে সাতটার দিকে তার লাশ উদ্ধার করে ময়নাতদন্তের জন্য ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ মর্গে পাঠায়। তার গ্রামের বাড়ি বরিশালের মুলাদী উপজেলার কাজীরচর, পিতা নুরু মিয়া। দুই ভাই ও এক বোনের মধ্যে তিনি সবার বড়।
কাফরুল থানার অফিসার ইনচার্জ (ওসি) আব্দুল কাইয়ুম জানান, মিজানুর রহমান মিরপুর-১০ এ চা বিক্রি করতেন। বুধবার গভীর রাতে দোকান বন্ধ করে বাসার উদ্দেশে বের হন। গতকাল সকালে তার গলাকাটা লাশ পাওয়া যায় বাসার কাছে। ওসি জানান, কী কারণে তাকে হত্যা করা হয়েছে তা পরিবারের পক্ষ থেকে কিছুই জানাতে পারেনি। হত্যার কারণ ও ঘাতকদের গ্রেফতারে পুলিশ অভিযান শুরু করেছে।
