উইলফ্রেদো ভারগাসের (৩৩) ধারণা ছিল, ধনী হওয়া— এ আর কি কঠিন কাজ। মার্কিন মুলুকে পা রাখলেই তো বিত্ত-বৈভব ধরা দেবে তাঁকে। এমন আশাতেই দেশে রেখে এসেছিলেন স্ত্রী ও তিন সন্তানকে। ভেবেছিলেন তাঁর প্রেরিত অর্থে তাদের দিন কাটবে স্বর্গসুখে। কিন্তু বাস্তব বড় কঠিন! ২০১১ সালে যুক্তরাষ্ট্রে এসেই তিনি কাজ নিয়েছিলেন ওয়াশিংটন ডিসির কুইক পিলা নামক একটি রেস্টুরেন্টে। সেই থেকে তিনি ওখানেই আছেন। কাজ বদলানোর সুযোগ পাননি। ন্যূনতম মজুরিতে চাকরি করেন বলে তিনি ঘন্টায় পান ৮ দশমিক ২৫ মার্কিন ডলার। ভালভাবে চলতে গেলে এ অর্থ তাঁর নিজের জন্যই যথেষ্ট নয়। তারপরও ১৫ দিন অন্তর একটি নির্দিষ্ট পরিমাণ অর্থ দেশে পাঠান তিনি। কিন্তু সেটি করতে গিয়েও মাঝে-মধ্যে ধার করতে হয় তাঁকে। এরমধ্যে ভাল চিকিত্সার অভাবে তাঁর স্ত্রী মারা গেছেন। এক আত্মীয়ের তত্ত্বাবধানে থাকা সন্তানদের দিন কাটছে কোনোমতে।
উইলফ্রেদো ভারগাস এখনো আশা ছাড়েননি। এর পেছনে অবশ্য যুক্তিও রয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের বর্তমান ফেডারেল ন্যূনতম মজুরি ঘণ্টায় ৭ দশমিক ২৫ ডলার। কিন্তু ৩৮টি রাজ্য এরই মধ্যে মজুরি বৃদ্ধির বিষয়টিকে অনুমোদন কিংবা সেটিকে বিবেচনার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। এ তথ্য পাওয়া গেছে রাজ্যের আইনপ্রণেতাদের জাতীয় সম্মেলন থেকে। উদাহরণস্বরূপ, হাওয়াই ও ম্যারিল্যান্ড সিদ্ধান্ত নিয়েছে আগামী কয়েক বছরের মধ্যে ন্যূনতম মজুরি পৌঁছাবে ঘন্টায় ১০ দশমিক ১০ ডলারে। ওয়াশিংটন ডিসির সিটি কাউন্সিলের ভোটাভুটিতে রায় এসেছে ২০১৬ সাল নাগাদ ন্যূনতম মজুরি ঘন্টায় ১১ দশমিক ২৫ ডলার করার।
২০১৬ সাল নাগাদ জাতীয় স্তরে ন্যূনতম মজুরি ঘন্টায় ১০ দশমিক ১০ ডলার করার একটি প্রস্তাব সম্প্রতি সিনেটে রুখে দিয়েছেন রিপাবলিকান সিনেটররা। কিন্তু তাতে দমে যাননি ডেমোক্রেট সিনেটররা। তাঁরা আরো সমর্থন নিয়ে ফের বিলটি উত্থাপনের প্রস্তুতি নিচ্ছেন। আমেরিকান ডেভেলপমেন্ট ব্যাংকের জ্যেষ্ঠ অর্থবিশেষজ্ঞ মারিয়া লুইসা হায়েম এ ব্যাপারে মন্তব্য করেছেন, সর্বনিম্ন মজুরি ১০ দশমিক ১০ ডলারে উন্নীত হলে ল্যাটিন আমেরিকা ও দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর রেমিটেন্সের ওপর বড় ধরনের ইতিবাচক প্রভাব পড়বে। ২০ থেকে ৩০ শতাংশ মজুরি বাড়লে অভিবাসী শ্রমিকরা অনেক বেশি অর্থ পাঠানোর সুযোগ পাবে। আর এ কথাটি সবাই জানে যে, রেমিটেন্স বৃদ্ধির সঙ্গে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সর্বনিম্ন মজুরির পরিমাণের রয়েছে গভীর সম্পর্ক। উইলফ্রেদো ভারগাস ১৫ দিন অন্তর গুয়েতেমালায় পাঠাতে পারেন ১৬০ মার্কিন ডলার। তিনি আশা করছেন, বারাক ওবামা ১০ দশমিক ১০ ডলার ন্যূনতম মজুরির বিলে সই করলে তিনি অন্তত ২০০ ডলার করে পাঠাতে পারবেন। এতে করে তাঁর সন্তানদের ভাল খাবার ও চিকিত্সা নিশ্চিত হবে। কিন্তু রক্ষণশীল থিংক ট্যাংক হেরিটেজ ফাউন্ডেশনের প্রধান অর্থনীতিবিদ স্টিফেন মুর বিষয়টিকে এতোটা সহজ মনে করছেন না। তিনি মনে করেন, মজুরি বুদ্ধিতে অভিবাসী শ্রমিকদের বিপদে পড়ার সম্ভাবনাটাকেও একেবারে উড়িয়ে দেয়া যায় না। কারণ তখন নিয়োগকর্তারা চাকরি দেয়ার আগে অনেক বেশি যাচাই-বাছাই করবে। এতে করে অনেকে বেকার হয়ে পড়তে পারেন। বিশেষ করে অদক্ষ ও আধাদক্ষ শ্রমিকরা বেকার হয়ে পড়তে পারেন। বেশি মজুরির বিনিময়ে দক্ষ শ্রমিক কামনা করা হবে- এটিই তো স্বাভাবিক।
আরবান ইনস্টিটিউটের জ্যেষ্ঠ অর্থনীতিবিদ মারিয়া এনচাতেগুই মুরের সঙ্গে দ্বিমত পোষণ করে বলেছেন, নিবন্ধিত শ্রমিকদের চিন্তার কোনো কারণ নেই। কিন্তু অনিবন্ধিত শ্রমিকদের উপর ন্যূনতম মজুরি বৃদ্ধিজনিত সংস্কারের তেমন কোনো প্রভাবই পড়বে না হয়তো। কেননা তাদের বেশিরভাগই কাজ করে আন্ডারগ্রাউন্ড অর্থনীতিতে। ন্যূনতম মজুরির নিয়ম লঙ্ঘন করলেও তারা চাকরি হারানোর ভয়ে রিপোর্ট করে না। এর সঙ্গে যুক্ত রয়েছে তাদের দক্ষতা ও যোগ্যতার প্রশ্ন। আরবান ইনস্টিটিউটের তথ্যানুসারে যুক্তরাষ্ট্রে বসবাসরত অবৈধ শ্রমিকদের ৪২ শতাংশেরই হাইস্কুল ডিপ্লোমা নেই। অধিকাংশেরই ইংরেজিতে দক্ষতা কম। ফলে সবসময়ই তারা আতঙ্কে থাকে কখন তাদেরকে দেশে ফেরত পাঠিয়ে দেয়া হয়। পিউ রিসার্চ সেন্টারের তথ্যানুসারে, ২০১২ সালে যুক্তরাষ্ট্রে অবৈধ অভিবাসী ছিল ১১ দশমিক ৭ মিলিয়ন। এ সংখ্যাটা এখন আরো অনেক বেশি।
৪৭ বছর বয়স্কা মারিয়া ভেলাসকো ৯ বছর আগে এল সালভাদর থেকে যুক্তরাষ্ট্র এসেছিলেন অস্থায়ী ওয়ার্ক পারমিট নিয়ে। মেয়াদ শেষ হয়ে গেলেও তিনি যুক্তরাষ্ট্রে রয়ে গেছেন দুই ছেলে-মেয়ের কথা চিন্তা করে। তারা এল সালভাদরেই থাকেন। মারিয়া ভেলাসকো ওয়াশিংটন ডিসির দুটি রেস্টুরেন্টে কাজ করে প্রতিমাসে ৫০০ ডলার পাঠাতে পারেন। কিন্তু অবৈধ শ্রমিক হওয়ার কারণে তাঁকে কাজ করতে হয় ন্যূনতম মজুরির চেয়ে এক ডলার কমে। মজুরি বাড়ানোর কথা বললে তাঁকে হুমকি দেয়া হয়, জানিয়ে দেয়া হবে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে। তবে তিনি আশা করছেন, সর্বনিম্ন মজুরি বৃদ্ধি করলে তাঁর অবস্থার উন্নতি ঘটবে। ল্যাটিন আমেরিকা, ক্যারিবীয় অঞ্চল ও দক্ষিণ এশিয়ার অবৈধ শ্রমিকদের বিষয়ে কাজ করছে শ্রমিক অধিকার গ্রুপ চেইঞ্জ টু উইন। এর সঙ্গে জড়িত জাইম মলিনা জানিয়েছেন, প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার অভাব ও চাকরির নিরাপত্তার কারণে অবৈধ অভিবাসীরা সবসময় তটস্থ থাকে। তারা অবৈধ শ্রমিকদের ভয় না পেয়ে মনে জোর রাখার পরামর্শ দেন। বোঝাতে চেষ্টা করেন, যুক্তরাষ্ট্রের সমৃদ্ধির জন্য তাদেরও প্রয়োজন রয়েছে। তাঁদের কথাতেই উইলফ্রেদো ভারগাস ও মারিয়া ভেলাসকো মাঝেমধ্যে ধর্মঘটে শরীক হন মজুরি বৃদ্ধির দাবিতে। কিন্তু তাতে কাজের কাজ কিছুই হচ্ছে কি-না এ বিষয়ে তারা সন্দিহান। সামনের মাসেও একদিনের ধর্মঘট করার পরিকল্পনা রয়েছে তাদের। —আল জাজিরা ওয়েবসাইট অনুসরণে
