বিলুপ্তির পথে লোকজ খেলাধুলা

আপডেট : ৩০ মে ২০১৪, ২০:৪৯
মানুষ শুধু কাজ নিয়ে বেঁচে থাকতে পারে না। বেঁচে থাকার জন্য প্রয়োজন চিত্ত বিনোদন। বিনোদনের বিভিন্ন উপকরণ ও উপায়ের মধ্যে খেলাধুলা সর্বশ্রেষ্ঠ। খেলাধুলার মাধ্যমেই জাতির মধ্যে ঐক্যের সৃষ্টি হয়, দেশপ্রেম জাগ্রত হয়। কোনো জাতির অতীত ঐতিহ্য সম্পর্কে জানা যায়। তাঁদের সাহস ও বীরত্ব সম্পর্কে ধারণা পাওয়া যায়। তবে বর্তমানে আমাদের দেশে খেলাধুলার ধারণায় কিছুটা পরিবর্তন এসেছে। আমরা আমাদের নিজস্ব লোকজ খেলাধুলা ভুলতে বসেছি। এ কারণে বাংলার হাজার বছরের ঐতিহ্যবাহী খেলাধুলা বর্তমানে বিলুপ্তির পথে। শহরাঞ্চল তো বটেই এখন গ্রামের ছেলেমেয়েরাই গ্রাম বাংলার ঐতিহ্যবাহী খেলাধুলা ভুলতে বসেছে। এখন আর গ্রামের পর গ্রাম ঘুরে বেড়ালেও সেভাবে ঐতিহ্যবাহী খেলাধুলা খেলতে দেখা যায় না। সে স্থান ও সময় এখন দখল করেছে ফুটবল, ক্রিকেট, টেলিভিশন, কমপিউটারের বিভিন্ন গেম, কোচিং সেন্টার, প্রাইভেট টিউটর, বিভিন্ন বিদেশি রাইডস প্রভৃতি। শহরাঞ্চল ছাড়াও বর্তমানে গ্রামের অবস্থাপন্ন একজন অভিভাবকও তাঁর সন্তানকে সারাদিন শুধু লেখাপড়ার মধ্যে ব্যস্ত রাখতে সচেষ্ট থাকেন। কীভাবে তার পরীক্ষায় ভালো ফল হবে শুধু সে চিন্তা করেন। কীভাবে তার শারীরিক ও মানসিক বিকাশ করা যায় সে চিন্তা করেন না। আর এতে ফল অনেক ক্ষেত্রেই হয় বিপরীত। নিম্নবিত্ত পরিবারের অভিভাবকরা তাঁদের সন্তানদের বিভিন্ন কাজে নিয়োজিত রাখতে বাধ্য হন। অনেকে সময় পেলেও তাদের মধ্যে খেলাধুলার প্রতি তেমন আগ্রহ দেখা যায় না। আর যারা খেলার সুযোগ পায় তারাও ফুটবল ও ক্রিকেটের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে। তবে এ কথা আজ অস্বীকার করার উপায় নেই যে, ক্রিকেট ও ফুটবল বিদেশি খেলা হলেও বর্তমানে তা আমাদের সংস্কৃতির সঙ্গে মিশে গেছে। এ কথা দুঃখজনক যে,বর্তমানে শহরের ছেলেমেয়েরা ফুটবল, ক্রিকেট বা অন্য কোনো বিদেশি খেলা খেলে থাকে ঘরে বসে কমপিউটার বা ভিডিও গেমের মাধ্যমে বা অন্য কোনো খেলার উপকরণ নিয়ে ব্যস্ত থাকে নিজেদের অ্যাপার্টমেন্টে। এছাড়া তাদের জন্য তেমন কোনো বিকল্প ব্যবস্থাও আমরা করতে পারিনি। লোকজ খেলাধুলা সম্পর্কে তাদের তেমন কোনো ধারণা নেই। ফলে গ্রাম বাংলার ঐত্যিহ্যবাহী খেলাধুলা বিলুপ্ত হতে হতে এর নাম এবং অস্তিত্ব এখন খুঁজে পাওয়াই কঠিন। প্রত্যন্ত গ্রামেও এখন গোল্লাছুট, গ্যাদন, বরফপানি, কুমির, বেগুনপেটা, ডালিম ডালিম, গাছটোকা, মোরগ যুদ্ধ, লই, হাডুডু, মার্বেল, কানামাছি, দাড়িয়াবান্ধা, ডাংগুলি, লাঠিবাড়ি, বাঘ-ছাগল, ওপেন্টি বাইস্কোপ, ছি, বৌছি,দড়িলাফ, আগডুম বাগডুম, ইচিং বিচিং, চোর ডাকাত পুলিশ, ঘুুড়ি ওড়ানো, পুতুল, কুতকুত, লুডু, হাতি, টিপু, লাটিম প্রভৃতি খেলা এখন বিলুপ্তির দ্বারপ্রান্তে। অঞ্চলভেদে এসব খেলার নিয়ম ও নামের মধ্যে কিছুটা পার্থক্য রয়েছে। তবে এর মৌল বিষয়ের মধ্যে তেমন কোনো পার্থক্য নেই। গ্রামীণ এইসব খেলাকে এখনই পৃষ্ঠপোষকতা না করলে সেগুলো বাস্তবে টিকিয়ে রাখা সম্ভব হবে না। এজন্য সরকারের ক্রীড়া মন্ত্রণালয়কেই সবার আগে এগিয়ে আসতে হবে। তাছাড়া দেশের বিভিন্ন বড় বড় কোম্পানি, ধনী ব্যক্তিরাও পৃষ্ঠপোষকতা দিয়ে এসব ঐতিহ্যকে বাঁচিয়ে রাখতে পারেন। বর্তমানে ইলেকট্রনিক মিডিয়া অত্যন্ত শক্তিশালী তারাও এক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। যেমন ষোল শতকে বর্তমানের জনপ্রিয় খেলা ক্রিকেট হারিয়ে যেতে বসেছিল। তখন ইংল্যান্ডের ধনী ব্যক্তিরা এমসিসি গঠন করে ক্রিকেটকে রক্ষা করেন। এতে বিলুপ্ত হতে হতে ক্রিকেট রক্ষা পায় এবং বর্তমানে জনপ্রিয় খেলায় পরিণত হয়েছে। গ্রাম বাংলার ঐতিহ্যবাহী খেলাগুলোকে সঠিকভাবে পৃষ্ঠপোষকতা করা গেলে এক সময় তা সারা বিশ্বব্যাপী জনপ্রিয় হয়ে ছড়িয়ে পড়তে পারবে। সে উপাদান ও শক্তি এসব লোকজ খেলাধুলার মধ্যে রয়েছে। শুধু প্রয়োজন সঠিক পৃষ্ঠপোষক ও দক্ষ সংগঠক। দেশের অনেক অজনপ্রিয় খেলারও ফেডারেশন আছে। অথচ আমাদের এইসব দেশিয় খেলার জন্য নেই কোনো ক্রীড়া ফেডারেশন। তাই গ্রামীণ ঐতিহ্যবাহী সকল খেলার জন্য একটি আলাদা ফেডারেশন করা যেতে পারে। যে ফেডারেশনের কাজ হবে গ্রাম বাংলার হাজার হাজারের ঐতিহ্যবাহী খেলাকে সংগ্রহ, সংরক্ষণ, জনপ্রিয় ও আয়োজনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখা, তরুণ প্রজন্মের মধ্যে আগ্রহ সৃষ্টি করা। মনে পড়ে অসময়ে খেলার জন্য মায়ের হাতে কত মার খেয়েছি। অথচ এখনকার ছেলেমেয়েদের জোর করেও খেলতে পাঠানো যায় না। সারাক্ষণ তারা মোবাইল, টেলিভিশন, ফেসবুক, টুইটার প্রভৃতির সঙ্গে সময় কাটাতে ভালোবাসে। প্রত্যন্ত পাড়াগাঁয়েও এখন প্রায় প্রতিটি চায়ের দোকানে বিনা পয়সায় সারাদিন ডিশ লাইনে, সিডিতে টেলিভিশন দেখা যায়। নামমাত্র মূল্যে মোবাইলের মেমরি কার্ডে শত শত নাটক, সিনেমা, গান লোড করে সহজেই দেখা যায়। ফলে মানুষের জীবন যাপন ও রুচিতে দ্রুত পরিবর্তন এসেছে। আমাদের প্রজন্মও বড় হতে থাকলো আর গ্রামীণ খেলাগুলোও দ্রুত হারিয়ে গেলো। সেই খেলাগুলোর কথা মনে হলে এখনও কেমন যেন হারিয়ে যাই এক অজানা ভালোলাগায়। এসব খেলাকে এভাবে হারিয়ে যেতে দেওয়া আমাদের কোনোক্রমেই উচিত হবে না। এগুলো আমাদের হাজার বছরের ঐতিহ্য ও নিজস্ব সম্পদ। সিরাজগঞ্জ