জাতীয় মাশরুম :দেখা হয় নাই চক্ষু মেলিয়া

আপডেট : ৩০ মে ২০১৪, ২০:৪৯
ঢাকার একটি সুপার শপে এই গরমে বাংলাদেশে উত্পাদিত বাটন মাশরুম দেখে আমি মুগ্ধ। অত্যন্ত আনন্দের বিষয় বাংলাদেশে বাটন মাশরুম উত্পন্ন হচ্ছে। কিন্তু পরক্ষণেই মনটা খারাপ হয়ে গেলো, কেননা এটি উত্পাদন করেছে এদেশের একটি প্রাইভেট প্রতিষ্ঠান। আমাদের জাতীয় মাশরুম উন্নয়ন ও সম্প্রসারণ কেন্দ্র পঞ্চাশ কোটি টাকা ব্যয় করে বুঝতে পেরেছে এদেশে বাটন মাশরুম হবে না। সম্প্রতি এক মাশরুম শিল্পোদ্যোক্তার অশ্রুসিক্ত লেখা পাঠ করে আমার অত্যন্ত প্রিয় সবজি মাশরুম বিষয়ে খোঁজ নিতে ঐ লেখকের সঙ্গে যোগাযোগ করে বিশ্বসেরা বাটন মাশরুমের বেহাল অবস্থার কারণ অনুসন্ধানে তথ্য সংগ্রহ করি। বিশ্বসেরা বাটন মাশরুমের জন্য প্রথম উপাদান এর কম্পোস্ট। আমাদের জাতীয় মাশরুম উন্নয়ন ও সম্প্রসারণ কেন্দ্র এখনো কম্পোস্ট করতে পারেনি। কোনো-কোনো বছর যা কিছু মাশরুম হয়েছে তা নিতান্তই কাকতালীয়। কম্পোস্ট করতে গিয়ে এ প্রতিষ্ঠান কোনো দেশকে অনুকরণ করেনি। অনুকরণ করলে জ্ঞানের সীমাবদ্ধতা সত্ত্বেও মাশরুম হতো। আমি বুঝতে পারি না সীমিত জ্ঞান নিয়ে এই প্রতিষ্ঠান কীভাবে কম্পোস্টের ফর্মুলা বের করে এবং যা কোনোভাবেই বিজ্ঞানসম্মত নয়। বাটন মাশরুমের কম্পোস্ট করার সময় ফাঞ্জিসাইড ব্যবহার করা যাবে না, এই প্রতিষ্ঠান সেটি করে এবং লিথাল ডোজে ফাঞ্জিসাইড ব্যবহার করে। মাশরুম উচ্চশ্রেণির ছত্রাক তাই ছত্রাকনাশক ব্যবহার না করাটাই বাঞ্ছনীয়; তবে ওয়েস্টার মাশরুম চাষে প্রয়োজনে শর্তসাপেক্ষে ব্যবহার করা যেতে পারে—কিন্তু তার জন্য তাত্ত্বিক জ্ঞান জরুরি। এ ক্ষেত্রে যে বিষয়টি খুব গুরুত্বপূর্ণ তা হলো : যখন আমরা খোলা মাঠে জমিতে প্রয়োগ করি তখন ফাঞ্জিসাইডের ডোজ হিসেব করতে হয় গ্রাম/লিটার, কিন্তু যখন ইনভিট্রো পরীক্ষণ করবো যেমন মাশরুম প্যাকেটের ভেতরে, টেস্টটিউবে, পেট্রিডিসে বা বোতলে তখন দিতে হবে মিলিগ্রাম/লিটার (বা কেজি) হিসেবে। ব্যাভিস্টিন নামক ফাঞ্জিসাইডটি ( কার্বেন্ডাজিম) মাশরুম চাষে সর্বোচ্চ যে মাত্রায় ব্যবহার করার অনুমতি আছে তার ২০ গুণ বেশি মাত্রায় ব্যবহার করার কথা বলে জাতগুলোর জেনেটিক চরিত্র নষ্ট করা হচ্ছে বলে আমি বিশ্বাস করি। জাতীয় মাশরুমের ত্রৈমাসিক প্রকাশনায় প্রকল্প পরিচালক কর্তৃক লিখিত সাপ্লিমেন্টবিহীন বীজ উত্পাদনের এক অভিনব প্রযুক্তি প্রবন্ধ পাঠ করে এইসব স্বপ্নে পাওয়া উদ্ভট তথ্য গিলতে খুব কষ্ট হচ্ছিলো। ব্যাভিস্টিন সিস্টেমিক ফাঞ্জিসাইড এবং মারাত্মক মিউটাজেনিক গুণ সম্পন্ন ফাঞ্জিসাইড যেটি সবুজ ফসলের ছত্রাক দমনে ব্যবহার করলে ছত্রাকগুলো তার নতুন রেস তৈরি করে, ফলে পরবর্তী সময়ে এই ফাঞ্জিসাইডের ডোজ আরো বাড়াতে হয়, একসময় ঐ ছত্রাক-জীবাণুগুলো এই ফাঞ্জিসাইডের প্রতি আর সংবেদনশীল থাকে না। সবুজ ফসলের ক্ষেত্রে চাষিরা কোনো ফসলে এটিকে মৌসুমে ২-৩ বার ব্যবহার করলে এটির রেজিস্ট্যান্ট হবার আশঙ্কা থাকে না, আমরা জানি এক্ষেত্রে আমাদের বুদ্ধিমান চাষিরা ক্রপ-রোটেশন পদ্ধতি অবলম্বন করে থাকেন। কিন্তু মাশরুমের ক্ষেত্রে এই ছত্রাকনাশকটি কোনো নিয়ম-নীতি ছাড়া সারা বছরই নির্বিচারে ব্যবহারের বিধান আমাদের মাশরুমের যাত্রাকে থামিয়ে দেবে বা দিয়েছে। মাশরুম উচ্চ শ্রেণির ছত্রাক, তাই এই ফাঞ্জিসাইড ব্যবহারে মাশরুমের প্রথম দিকে আপাত উপকার করছে বলে মনে হলেও পরে দেখা যাবে জাতটির স্থায়ী গুণগত পরিবর্তন হয়ে গেছে। এভাবে গত ২৫ বছর ধরে আমাদের দেশের আবহাওয়ায় অভিযোজিত মাশরুম জাতটির হয়তো ক্ষতি করে ফেলছি আমরা নিতান্ত অজ্ঞতার বশবর্তী হয়ে। প্রতিবেশী দেশগুলো মাশরুম নিয়ে কীভাবে কাজ করছে সেটি জেনে নিয়ে অনুকরণ করলেও মাশরুম এমন মুখ থুবড়ে পড়তো না। আমরা তো দরকার হলেই প্রতিবেশী দেশ থেকে অনেক কৃষিপণ্য আমদানি করি। আমাদের মাশরুমের প্রয়োজনে কেন তাদের উন্নয়ন কৌশল বিনা খরচায় আমদানি করছি না? এই লেখাটি লিখতে গিয়ে হঠাত্ একটি শঙ্কা অনুভূত হচ্ছে—সেটি হলো প্রাইভেট প্রতিষ্ঠান এই শীতের ফসল অনেক ব্যয়ভার বহন করে উত্পাদন করে ঢাকায় বিপণন করছে আর অন্যদিকে ঢাকার সাভারেই অবস্থিত জাতীয় মাশরুম উন্নয়ন ও সম্প্রসারণ কেন্দ্র থেকে বলা হচ্ছে—এদেশে বাটন মাশরুম হবে না ! এখনো এর ব্যর্থতার কারণ অনুসন্ধান করেনি কৃষি মন্ত্রণালয়। মাশরুমের অগ্রগতির জন্য দরকার দক্ষ মানব সম্পদ আর নতুন কর্মকৌশল। ফেল করার সুযোগ নেই। সিলেট