কোনো শারীরিক রোগের সুচিকিত্সার জন্য সাধারণত একজন চিকিত্সকেরই প্রয়োজন হয়, তেমনিভাবে কোনো সামাজিক রোগের চিকিত্সা শুধু একজন সামাজিক চিকিত্সকই করতে পারেন। যাঁরা দার্শনিক তাঁরাই তো সামাজিক রোগের সুচিকিত্সক। আর আমরা জানি, দার্শনিকরা কখনো কোনো দলের হন না। তাঁরা কখনো দলবাজি করেন না। তাঁরা সংসারকর্মও তেমন করেন না। আর করলেও সংসারের জন্যও কোনো সময় দিতে পারেন না। দার্শনিকদের কোনো নিজস্ব স্বার্থ নেই। পৃথিবীর সকল মানব সন্তানকেই তাঁদের আপন সন্তান মনে করেন। কীভাবে সবার মঙ্গল করা যায় এবং সহজ প্রক্রিয়া বের করার জন্য তাদের প্রতিনিয়ত জ্ঞান আহরণ করতে হয়। কথিত আছে যে, দার্শনিক ইবনে রুশ্দ তাঁর বিবাহ ও পিতার মৃত্যুকালীন রাত্রি ছাড়া আর কোনো রাত্রিতে অধ্যয়ন ত্যাগ করেননি।
একমাত্র দার্শনিকরাই পারেন রাষ্ট্র পরিচালনার বিভিন্ন ক্ষেত্রে সুপরামর্শ দিয়ে দেশের উন্নয়নকে ত্বরান্বিত করতে। আজ চারদিকে তাকালে শুধু যে জঞ্জাল, স্বাস্থ্যহীন মানুষ আর বুভুক্ষ ভিক্ষুকের দল নজরে আসে তার একমাত্র কারণ হলো, আমরা দর্শন (জীবন দর্শন) থেকে ক্রমান্বয়ে দূরে সরে যাচ্ছি। দর্শনশাস্ত্রের অবহেলাই এ অবস্থার একমাত্র কারণ। তাই সকলেই দর্শনশাস্ত্রের মূল্যবান তথ্য এবং প্রকৃতির ওপর নির্ভরশীল হলেই এ পৃথিবীতে আর আহাজারি, দুঃখ-বেদনা থাকবে না। থাকবে শুধু অনাবিল সুখ ও আনন্দ।
তাই দার্শনিক সৃষ্টির জন্যে সরকারিভাবে প্রয়োজনীয় সুব্যবস্থা করাই হবে এ মুহূর্তে একমাত্র করণীয়। উল্লেখ্য যে, বিশ্বের সর্বত্র বিশ্ববিদ্যালয়ের পাঠ্যক্রমে দর্শনশাস্ত্র এক গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হিসেবে বিবেচিত হলেও শুধু বাংলাদেশেই তা অবহেলিত হয়ে আসছে, যা সত্যিই দুঃখজনক।
দর্শনশাস্ত্রে ভর্তি হতে হলে অবশ্যই সাহিত্য এবং জ্যামিতিতে ভালো জ্ঞান থাকতে হবে। তাছাড়া ইতিহাস পর্যালোচনা করলে দেখা যায় যে—সক্রেটিস, প্লেটো, এরিস্টটলসহ খ্যাতিমান সকল দার্শনিক হাতেগোনা কয়েকজন মেধাবী ছাত্রকেই দর্শনের শিক্ষা দিয়েছিলেন। কারণ তাঁরা মনে করতেন, অধিকসংখ্যক ব্যক্তির দার্শনিক হওয়ার কোনো প্রয়োজন নেই। রাষ্ট্রের বৃহত্তর স্বার্থের দিকে খেয়াল রেখে খুব কম সংখ্যক অতিশয় মেধাবী ছাত্রকেই রাষ্ট্রীয় আর্থিক সহায়তায় দর্শনশাস্ত্র পড়ানোর ব্যবস্থা করা উচিত হবে। আমার মতে, মফস্বল এবং শহরের কলেজগুলোতে অবিলম্বে দর্শন বিভাগ বন্ধ করে দেওয়া উচিত। কারণ অধিকসংখ্যক ব্যক্তির দার্শনিক হওয়ার কোনো প্রয়োজন নেই। তাছাড়া বিশ্ববিদ্যালয়ে দর্শন বিভাগে ভর্তি হওয়ার জন্য লজিক নিয়ে এইচএসসি পাস করারও কোনো প্রয়োজন নেই। বিজ্ঞান বিভাগ থেকে অংক নিয়ে এইচএসসি পাস করা একজন মেধাবী ছাত্রেরই দর্শনশাস্ত্র পড়া উচিত। কম মেধাবী ছাত্রদের কখনো দর্শন বিভাগে ভর্তি হওয়া উচিত নয়। তবে জ্ঞান আহরণের জন্য সবারই কমবেশি দর্শন পড়া উচিত। এখানে উদাহরণ দেওয়া যেতে পারে যে, অগ্নিকন্যা প্রীতিলতা ১৯২৯ সালে ঢাকা বোর্ডের সম্মিলিত মেধা তালিকায় প্রথম স্থান অধিকারী করেছিলেন। পরবর্তী সময়ে তিনি কলকাতার বেথুন কলেজ থেকে দর্শনে গ্রাজুয়েশন করার পরে সমাজসেবায় আত্মনিয়োগ করেন।
ঢাকা
