বর্তমানে বিশ্বব্যাপী তথ্যপ্রযুক্তির ক্ষেত্রে যে অগ্রগতি হচ্ছে, সেটা ব্যবহার করে আমাদের দেশেও প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর কাছে বিভিন্ন সুযোগ-সুবিধা পৌঁছে দেয়া সম্ভব। বিশেষ করে শিক্ষাখাতে তথ্যপ্রযুক্তির ব্যবহার বাড়িয়ে সর্বস্তরের মানুষের কাছে শিক্ষার আলো পৌঁছে দেয়া যায়।
গতকাল শুক্রবার ইত্তেফাক কার্যালয়ের সভাকক্ষে অনুষ্ঠিত ‘শিক্ষক ডটকম : একটি ভার্চুয়াল আলোকবর্তিকা’ শীর্ষক গোলটেবিল বৈঠকে বক্তারা এসব কথা বলেন। যৌথভাবে এই বৈঠকের আয়োজন করে সরকারের ডাক, টেলিযোগাযোগ ও তথ্যপ্রযুক্তি মন্ত্রণালয়ের তথ্যপ্রযুক্তি (আইসিটি) বিভাগ এবং দৈনিক ইত্তেফাক।
মন্ত্রণালয়ের আইসিটি বিভাগের সচিব নজরুল ইসলাম খানের সঞ্চালনায় গোলটেবিল বৈঠকে প্রধান অতিথি ছিলেন ডাক, টেলিযোগাযোগ ও তথ্যপ্রযুক্তি মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী জুনাইদ আহমেদ পলক। অনুষ্ঠানের শুরুতে স্বাগত বক্তব্য রাখেন দৈনিক ইত্তেফাকের পরিচালক তারিন হোসেন। বৈঠকে শিক্ষক ডটকমের (www.shikkhok.com) প্রতিষ্ঠাতা এবং বাকিংহামের ‘ইউনিভার্সিটি অব অ্যালাবামা’র কম্পিউটার অ্যান্ড ইনফরমেশন সায়েন্স বিভাগের সহকারী অধ্যাপক ড. রাগিব হাসান মূলপ্রবন্ধ উপস্থাপন করেন। উপস্থাপনায় তিনি শিক্ষক ডটকম, ই-লার্নিং, ক্লাউড কম্পিউটিংসহ বিভিন্ন বিষয়ে আলোচনা করেন।
ড. রাগিব হাসান বলেন, ‘শিক্ষক ডটকমের প্রতিষ্ঠা ২০১২ সালে। বিদেশি বিভিন্ন ভাষায়, বিশেষ করে ইংরেজি ভাষায় ই-লার্নিংয়ের প্রচুর ওয়েবসাইট রয়েছে। এসব সাইটে বিভিন্ন বিষয়ে প্রাথমিক পর্যায় থেকে শুরু করে উচ্চশিক্ষার সাথে সঙ্গতিপূর্ণ বিভিন্ন কোর্স রয়েছে। কিন্তু বাংলা ভাষায় এই ধরনের কোনো ওয়েবসাইট নেই। এই অভাব থেকেই নিজের ভাষায় এই ধরনের একটি ওয়েবসাইট গড়ে তোলার তাগিদ অনুভব করি, যেটি ব্যবহার করে আমাদের দেশের শিক্ষক-শিক্ষার্থীরা খুব সহজে এবং স্বল্পব্যয়ে পছন্দের বিষয়ে শিখতে এবং শেখাতে পারে।’
শিক্ষক ডটকমের প্রতিষ্ঠাতা বলেন, ‘শিক্ষক ডটকমের সব ধরনের কনটেন্ট সবার জন্য উন্মুক্ত। এই ওয়েবসাইটে যে কেউ প্রবেশ করে সব ধরনের লেসন শিখতে পারবে। সবার কাছে সহজে তথ্য পৌঁছানোর জন্য আমরা মাইক্রো লেসন মডেলের প্রচলন করেছি। এতে করে ছোট ছোট লেসনে শিক্ষার্থীরা পূর্ণ মনোযোগ বজায় রেখে সংশ্লিষ্ট পাঠটি সঠিকভাবে গ্রহণ করতে পারে।’ এসময় তিনি শিক্ষক ডটকমের কয়েকটি ভিডিও টিউটোরিয়াল দেখান। কেউ কোনো বিষয়ে শেখাতে আগ্রহী হলে যোগাযোগ করলে সকল সহায়তা দেয়া হবে বলেও তিনি জানান।
ড. রাগিব আরো বলেন, ‘উন্মুক্ত এই সাইটে যে কেউ চাইলে যেকোনো বিষয় শেখাতে পারবেন। আমাদের ভবিষ্যত পরিকল্পনার মধ্যে রয়েছে দেশের স্কুল-কলেজের পাঠ্যক্রমের সঙ্গে মিল রেখে শিক্ষক ডটকমে কোর্স সংযোজন করা। সহজলভ্য প্রযুক্তির মাধ্যমে শিক্ষার্থীরা এগুলো ব্যবহার করতে পারবে। ইন্টারনেটের মাধ্যমে যেমন এই সাইট থেকে সরাসরি শেখার সুযোগ রয়েছে, তেমনি এখানকার ভিডিও টিউটোরিয়ালগুলো যে কেউ চাইলেই কপি করে মোবাইল ফোনে নিয়েও দেখতে পারবে। আমাদের মূল লক্ষ্য হলো প্রান্তিক পর্যায়ের শিক্ষার্থীদের কাছে ডিজিটাল এই শিক্ষা সহায়ক কনটেন্টকে পৌঁছে দেয়া। তার জন্য বিভিন্ন উদ্যোগ আমরা গ্রহণ করছি।’ রাগিব হাসান জানান, বর্তমানে এই সাইটে ৫৫টি কোর্স চালু রয়েছে। আর শিক্ষক ডটকমে এখন নিবন্ধিত শিক্ষার্থীর সংখ্যা ৭০ হাজারেরও বেশি।
বৈঠকে তথ্যপ্রযুক্তি প্রতিমন্ত্রী জুনাইদ আহমেদ পলক বলেন, ‘প্রযুক্তি ব্যবহার করে জনকল্যাণমূলক কাজ করলে তাতে সহায়তা করবে সরকার। তরুণদের এগিয়ে নিতে, দেশকে এগিয়ে নিতে সরকার আইসিটি সেক্টরের বন্ধ তালা খুলে দিয়েছে।’ ২০০৮ সালের পর থেকে বর্তমান সরকারের নেতৃত্বে আইটি সেক্টরে ব্যাপক উন্নয়ন হয়েছে, এটা বলার অবকাশ নেই বলে তিনি মন্তব্য করেন। তিনি সবাইকে অনুরোধ জানিয়ে বলেন, ‘ডিজিটাল বাংলাদেশ গড়ার আন্দোলনে সবাইকে সামিল হতে হবে। আমরা রাগিব হাসানের চিন্তা ও মেধাকে কাজে লাগাতে চাই। শিক্ষক ডটকমের উদ্যোগকে প্রত্যন্ত অঞ্চলের শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে পৌঁছানোর জন্য যাবতীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করবে সরকার।’
প্রতিমন্ত্রী আরো বলেন, ‘দেশে এখন ১১ কোটি মানুষের হাতে পৌঁছে গেছে মোবাইল ফোন। এর মধ্যে ৩ কোটিরও বেশি মানুষ এখন মোবাইলে ইন্টারনেট ব্যবহার করছে। ২০০৯ সালে যেখানে দেশে ইন্টারনেট ব্যবহারকারী ছিল মাত্র ৩ শতাংশ, সেখানে বর্তমানে ইন্টারনেট ব্যবহারকারীর সংখ্যা ২৪ শতাংশে পৌঁছেছে।’
আইসিটি সচিব নজরুল ইসলাম খান বলেন, ‘নিজের ভাষায় ই-লার্নিং হলে সেটা বেশ সুবিধাজনক হয়, মানুষের শেখার আগ্রহ বাড়ে। সরকারের পক্ষ থেকে তাই এই ধরনের উদ্যোগে সহায়তা করা হবে। এ ছাড়া বর্তমানে ফ্রিল্যান্সারদের প্রশিক্ষণ এবং তাদের কাজের ক্ষেত্র তৈরি করছে সরকার। মোবাইল অ্যাপস ডেভেলপমেন্ট বিষয়েও দক্ষ জনবল তৈরিতে সরকার কাজ করছে।’
বৈঠকে অন্যান্যের মধ্যে উপস্থিত ছিলেন ইত্তেফাকের ব্যবস্থাপনা সম্পাদক আশিস সৈকত, তথ্যপ্রযুক্তি সম্পাদক মোজাহেদুল ইসলাম, বাংলাদেশ কম্পিউটার কাউন্সিলের নির্বাহী পরিচালক এসএম আশফাক হোসেইন, বেসিসের সাবেক সভাপতি ফাহিম মাশরুর, সিটিও ফোরামের সভাপতি তপন কান্তি সরকার ও সাধারণ সম্পাদক সৈয়দ মাসুদুল বারী, ওরাকলের কান্ট্রি ম্যানেজার মোহাম্মদ মোতাহারুল ইসলাম সুমন, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কম্পিউটার বিজ্ঞান ও প্রকৌশল বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ফায়সাল হোসেন, ইস্ট ওয়েস্ট বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক মুস্তাফা প্রমুখ।
