পর্যটন সম্ভাবনাময় নিঝুম দ্বীপ

আপডেট : ৩০ মে ২০১৪, ২২:৩৭
বঙ্গোপসাগরের উপকূলে সবুজ বনবেষ্টিত জীববৈচিত্র্যের অপরূপ সমারোহ আর প্রকৃতির সৌন্দর্যের লীলাভূমি নৈসর্গিক নিঝুম দ্বীপ। এ দ্বীপে রয়েছে বিস্তীর্ণ সমুদ্র সৈকত। গভীর সমুদ্র থেকে ভেসে আসে সমুদ্রের আহবান। নির্মল বাতাসে এ সময় মন হারিয়ে যায় সূদুর দিগন্তে। অদ্ভুত এক নির্জনতা ঘিরে আছে দ্বীপের অভ্যন্তর। এখানে ইলেক্ট্রনিক্স হর্নের কানফাটা আওয়াজ নেই। আছে সৈকতে দাঁড়িয়ে অস্তগামী সূর্যের রক্তিম আভার অপরূপ দৃশ্য। রয়েছে জাতীয় উদ্যান ও সংরক্ষিত গভীর বনভূমি। সমুদ্রতটে বিস্তীর্ণ সবুজ বনভূমিতে বিরল নানা জাতের পাখির কলতান, কুহুকুহু’র ও কিচিরমিচির ডাক এবং অসংখ্য হরিণের ছুটাছুটিতে নিস্তব্ধ বনভূমি জেগে ওঠে। বনরাজির পাশে সমুদ্র জলে গ্যাজ্ঞেলিক ডলফিনের দৌড়-ঝাঁপ মন জুড়িয়ে দেয়। শান্ত-স্নিগ্ধ, নৈসর্গিক সৌন্দর্য এবং জীববৈচিত্র্য টেনে আনে এ দ্বীপে ভ্রমণবিলাসী পর্যটক ও পাখি প্রেমিকদের। অবস্থান ঃ ১৯৫০ সালে সাগরের কূল ঘেঁষে জেগে উঠে নিঝুম দ্বীপের চর। দেশের দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চল ও উপকূলীয় এলাকার মাঝখানে এর অবস্থান। আয়তন বেড়ে ৮১ বর্গকিলোমিটারে দাঁড়িয়েছে। নোয়াখালীর দ্বীপ উপজেলা হাতিয়ার পশ্চিম-দক্ষিণে বঙ্গোপসাগর ও মেঘনা নদীবেষ্টিত নিঝুম দ্বীপ। হাতিয়া সদর থেকে এর দূরত্ব প্রায় ৪০ কিলোমিটার। পূর্বে এ দ্বীপটি জাহাজমারা ইউনিয়নের একটি ওয়ার্ড ছিল। বর্তমানে নিঝুম দ্বীপ নামে এটি নবগঠিত ইউনিয়ন । নামকরণ ১৯৭০ সালে প্রলংকরী ঘূর্ণিঝড় ও জলোচ্ছ্বাসের পর দুর্যোগকবলিত এক জাহাজ থেকে ভেসে আসে দ্বীপে কয়েক বাক্স কমলা। চরে কমলা পড়ে থাকতে দেখে জেলে ও রাখালরা এ দ্বীপের নাম রাখে কমলার চর। ১৯৬৯ সালে জরিপকারীরা এ চরে জরিপ করতে গিয়ে ওসমান নামে এক রাখালের দেখা পায়। তার নাম অনুসারে চর ওসমান রাখা হয়। যা বনবিভাগের তালিকায় রেকর্ডভুক্ত রয়েছে। পরে হাতিয়ার সাবেক এমপি, কৃষি ও বন প্রতিমন্ত্রী মরহুম আমিনুল ইসলাম কালাম এ দ্বীপের নাম রেখেছেন নিঝুম দ্বীপ। সাগরের বুকে নতুন এক বাংলাদেশ বঙ্গোপসাগরের বুকে জেগে উঠছে এক বিশাল ভূ-খন্ড। হাতিয়ার নিঝুম দ্বীপের দক্ষিণে মেঘনার মোহনায় বঙ্গোপসাগরের বুকে ধমারচর। এ ধমারচরের সাথে যুক্ত হয়ে বঙ্গোপসাগরে ভেসে উঠছে শত বর্গকিলোমিটার নতুন চর। জোয়ারের সময় ডুবে যায়, ভাটার সময় মাছের পিঠের মত এ চর ভাসতে থাকে। বঙ্গোপসাগরের স্বাভাবিক পানির স্তর থেকে এ চর উঁচু। দিন দিন পলিমাটি ভরাট হয়ে চরের আয়তন বাড়ছে। ধমারচর থেকে আরো ৪০-৫০ কিঃমি দূরে ভাটার সময় জেলেদের নৌকা আটকে যায়। স্থানীয় লোকজনের মতে এ চরের সীমানা এক থেকে দেড়শ’ কিলোমিটার । এ চর পরিপূর্ণতা লাভ করলে বাংলাদেশের মানচিত্রে যোগ হবে নতুন এক বিশাল ভূ-খন্ড। ধমারচরের সামনে জেগে ওঠা লেংটা ও জালিয়ার চরে বনবিভাগ ইতিমধ্যে বনায়ন শুরু করেছে। বনায়ন ও জীববৈচিত্র্য বনবিভাগ ১৯৭১-৭২ সালে নিঝুম দ্বীপের শতফুল নামক স্থানে চর ওসমান বিট অফিস স্থাপন করে বনায়ন শুরু করে। পরে ১৯৯২ সালে জাহাজমারা রেঞ্জ-এর আওতায় দ্বীপের নামার বাজারে বিট অফিস স্থানান্তর করে। তখন বনবিভাগ ১২ হাজার ৩৬০ একর ভূমিতে ম্যানগ্রোভ বাগান সৃজন করে। রোপণ করা হয়েছে কেওড়া, গেওয়া, বাইন, বাবুল, করজ্ঞমা, পুনন্যাল, নোনাঝাউসহ নানা জাতের বৃক্ষ। বনে ছেড়ে দেয়া হয় চিত্রল হরিণ, বেজি, গুঁইসাপ, অজগর, মহিষ ও বন্য কুকুর। বন এখন গভীর অরণ্যে পরিণত হয়েছে। বনগুলোতে গাঙচিল, বক, হিরন, বাঁলিহাঁস, সারস, ডাহুক, চিল, ঈগল, মাছরাঙা, বউ কথা কও, হরিয়াল, পানকৌড়ি, কাঠঠোকড়া, শালিক, দোয়েল ও বুলবুলিসহ দেশি ও অতিথি পাখির অবাধ বিচরণক্ষেত্রে পরিণত হয়েছে। বনের ভিতরে বয়ে যাওয়া খালগুলো প্রকৃতিকে করেছে আরো আকর্ষণীয়। বনের পার্শ্বে সমুদ্রে বিলুপ্ত প্রায় প্রজাতির গ্যাজ্ঞেলিক ডলফিনের নিরাপদ বিচরণক্ষেত্রে পরিণত হয়। বনে ৬৬ প্রজাতির গাছপালা, ১১৭ প্রজাতির বন্যপ্রাণী, ৭৮ প্রজাতির পাখি রয়েছে। এতে করে পুরো বন এলাকায় প্রাকৃতিক জীববৈচিত্র্যের মিলন ভূমিতে পরিণত হয়। বনের আকর্ষণ হরিণ ১৯৭৮ সালে জীববৈচিত্র্য ও পর্যটকদের আকর্ষণীয় করতে বনবিভাগ ৪ জোড়া চিত্রল হরিণ নিঝুম দ্বীপে অবমুক্ত করে। ২০০৬ সালে জরিপে হরিণের সংখ্যা দাঁড়ায় প্রায় ১৪ হাজার। হরিণের বংশবৃদ্ধিতে খাদ্য ও পানি সংকট দেখা দেয়। হরিণের প্রধান খাদ্য কেওড়া গাছের পাতা। গাছগুলো বড় হয়ে হরিণের নাগালের বাইরে চলে যায়। বনে বানর না থাকায় গাছের ডাল ও পাতা নিচে ফেলার কেউ নেই। এতে খাদ্য সংকট এবং বনের ভিতর অনেক খাল পলিমাটিতে ভরাট হয়ে যাওয়ায় পানি সংকট তীব্রতর হয়। এতে করে হরিণ পার্শ্ববর্তী বিভিন্ন চরে ও লোকালয়ে ছড়িয়ে পড়ে। প্রতিদিন হিংস্র কুকুরের শিকার হচ্ছে হরিণের দল। অন্যদিকে সংরক্ষিত বন এলাকায় ঘেরাও না থাকায় দস্যুদের হরিণ শিকারের সুযোগ সৃষ্টি হয়। দিন দিন হরিণের সংখ্যা কমে আসছে। দর্শনীয় স্থান বনেঘেরা নৈসর্গিক সৌন্দর্যের খালগুলোর মধ্যে চৌধুরীর খাল, পটকাখালী খাল, সোয়ানখালী খাল, ডুবাই খাল, ধামসাখালী খাল, ভট্রোখালী খাল, কাউনিয়া খাল, লেংটা খাল। এ দর্শনীয় খালগুলো জোয়ারের পানিতে পূর্ণ হলে মায়াবী সৌন্দর্য্য ছড়ায়। চৌধুরীর খাল ও ডুবাই খালের পাড়ে বনের মায়াবী হরিণের দল পর্যটকদের আকর্ষণ কাড়ে। সমুদ্র পাড়ে ১২ কিমি সমুদ্রসৈকত, সৈকতে এরা ভ্রমণবিলাসীদের মনে আনন্দ ছড়ায়। যাতায়ত ব্যবস্থা নিঝুম দ্বীপ যেতে হলে নদীপথে জোয়ার-ভাটার উপর নির্ভর করতে হয়। অক্টোবর থেকে মার্চ পর্যন্ত নদী থাকে শান্ত। এ সময় ভ্রমণকারীদের জন্য নদীপথ নিরাপদ। নিঝুম দ্বীপ যেতে হলে ঢাকার সায়েদাবাদ বাস টার্মিনাল থেকে নোয়াখালীর বাসযোগে অথবা উপকুল ট্রেনে জেলা শহর মাইজদীতে আসতে হবে। মাইজদী থেকে সড়কপথে যেতে হবে প্রায় ৪৬ কিমি হাতিয়ার চেয়ারম্যান ঘাটে। সেখান থেকে সি-ট্রাকে, ট্রলারে ও ষ্পির্ডবোর্ডে যেতে হবে ৩০ কিমি দূরে হাতিয়ার নলচিরা ঘাটে। সে স্থান থেকে সড়কপথে ওছখালী হয়ে ৩১ কিমি জাহাজমারার মুক্তাদিয়ার ঘাট। আবার এক থেকে দেড় কিমি নদীপথ পার হলেই নিঝুম দ্বীপ। অথবা চেয়ারম্যান ঘাট থেকে ট্রলার ও স্পির্ডবোটে সরাসরি নিঝুম দ্বীপ যাওয়া যায়। এ পথ ছাড়াও ঢাকার সদরঘাট স্টিমারযোগে সরাসরি হাতিয়ার নলচিরা ঘাটে এসে নিঝুম দ্বীপ যেতে পারেন। থাকার ব্যবস্থা নিঝুম দ্বীপে প্রতিবছর আনে হাজারো পর্যটক। তাদের থাকার সুবিধার্থে গড়ে উঠেছে রেস্ট হাউজ ও বোর্ডিং। রয়েছে বনবিভাগের রেষ্ট হাউজ, জেলা পরিষদের ডাকবাংলো, পর্যটন কর্পোরেশনের হোটেল ‘অবকাশ’, নামারবাজার জামে মসজিদ বোর্ডিং, বন্দরটিলায় উপকূলীয় পর্যটন রিক্রিয়েশান সেন্টার ও সিডিএসপির রেষ্ট হাউজ। থাকার সুবিধার পাশাপাশি খাবারেরও সুবিধা রয়েছে। অফুরন্ত পর্যটনের সম্ভাবনা সাগরকন্যাখ্যাত নিঝুম দ্বীপ জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণ ও ইকো ট্যুরিজম সম্প্রসারণের আরো সুবিধা সৃষ্টি, নিরাপদ যাতায়াত ব্যবস্থা, থাকার সুব্যবস্থা ও বিদ্যুত্ সরবরাহ এবং নিরাপত্তা বিধান করা হলে অনেক বেশি পর্যটকদের সমাগম ঘটবে। পর্যটন শিল্পে রাজস্ব আয়ের নতুন দ্বার উম্মেচিত হবে। জাতীয় উদ্যান ও সংরক্ষিত বন ২০০১ সালের ৮ এপ্রিল সরকার নিঝুম দ্বীপসহ পার্শ্ববর্তী ১১টি জেগে উঠা চর নিয়ে ৪০ হাজার ৩৯০ একর বনভূমি জাতীয় উদ্যান ঘোষণা করে। ২০১২ সালের ১৮ ডিসেম্বর নিঝুমদ্বীপ জাতীয় উদ্যানের অংশসহ ১৮ হাজার ১৬ একর বনভূমিকে সংরক্ষিত বন ঘোষণা করে। জাতীয় উদ্যান ও সংরক্ষিত বন এলাকা ঘোষণা করা হলেও একশ্রেণীর ভূমিগ্রাসী দস্যুরা বন নিধন করে ভৃমিহীনদের বসতি স্থাপনে উত্সাহিত করছে। গত কয়েক বছরে ৬/৭ হাজার একর বনভূমি বেদখল হয়ে যায়। বনের সীমানা চিহ্নিত ও ঘেরাও না থাকায় এবং স্থানীয় প্রশাসনের সাথে বন বিভাগের ভূমি নিয়ে বিরোধের সুযোগ নিচ্ছে বন দস্যুরা। বনবিভাগের উন্নয়ন নিঝুম দ্বীপে জাতীয় উদ্যান উন্নয়ন প্রকল্পের আওতায় বনায়নসহ হরিণের পানির চাহিদা মিটানোর জন্য ৪টি পুকুর কাম কিল্লা নির্মাণ করা হয়। গত ২২ মার্চ পরিবেশ ও বনমন্ত্রী আনোয়ার হোসেন মঞ্জু নিঝুম দ্বীপের বনাঞ্চল পরিদর্শন করেন। এ সময় তিনি বনবিভাগের অফিস কাম (দ্বি-তল ভবন) রেষ্ট কর্ণারের নির্মাণকাজের ভিত্তিপ্রস্তুর স্থাপন করেন। বিভাগীয় বন কর্মকর্তা সানাউল্যা পাটওয়ারী জানিয়েছেন, নিঝুম দ্বীপে সৌন্দর্য অবলোকন করতে পর্যটকদের জন্য ৫০ ফুট উঁচু টাওয়ার নির্মাণ ও হরিণ ও পশু-পাখি দেখার জন্য বনের গাছের উচ্চতা সমান ২০ ফুট পর্যবেক্ষণ টাওয়ার নির্মাণ করা হবে। পুকুর, খাল ও লেক খনন এবং বন্যপ্রাণী সংরক্ষণে জনসচেতনা বৃদ্ধি কার্যক্রম অব্যাহত রাখা হয়েছে। জনবসতি গত তিন যুগ ধরে নিঝুম দ্বীপে ১৫ হাজার একর খাসভূমিতে গড়ে উঠেছে জন বসতি। বর্তমানে জনসংখ্যা প্রায় ৩০ হাজার। এ দ্বীপে রয়েছে ২টি বাজার, বেসরকারি ২টি প্রাথমিক বিদ্যালয়, বিভিন্ন সাহায্য সংস্থার নির্মিত ৭টি ঘুর্ণিঝড় আশ্রয়কেন্দ্র ও ১টি পুলিশ ফাঁড়ি এবং নবগঠিত একটি ইউনিয়ন পরিষদ। জীবন-জীবিকা প্রাকৃতিক দুর্যোগের সাথে যুদ্ধ করে এ দ্বীপের মানুষ বেঁচে আছে। নদীভাঙ্গা গৃহহীন, ছিন্নমূল ভূমিহীন মানুষ বিভিন্ন চর থেকে এ দ্বীপে বসতি স্থাপন করে। দ্বীপের ৭০ ভাগ মানুষ মত্স্যজীবী ও ৩০ ভাগ কৃষিজীবী। গভীর সমুদ্র ও নদীতে জীবনের ঝুঁকি নিয়ে মাছ ধরে জীবিকা নির্বাহ করে। প্রায় ২০ হাজার জেলে মহাজনদের দাদনের উপর নির্ভরশীল। মাছ ধরার জাল ও নৌকাসহ প্রয়োজনীয় উপকরণ সংগ্রহ করতে হয় দাদনের টাকা দিয়ে। সারা বছর মাছ ধরে দাদনের টাকা পরিশোধ করতে হয়। মাছ ফেলে সিংহভাগ চলে যায় মহাজনের ঘরে। মহাজনের কৃপায় দু‘বেলা দুমুঠো অন্ন জোটে, আর মাছ না ফেলে পরিবার-পরিজন নিয়ে অর্ধাহারে ও অনাহারে থাকতে হয় জেলেদের। অন্যদিকে নদীতে মাছ ধরতে গেলে দস্যুদের চাঁদা দিতে হয়ে জেলেদের। চাঁদা না দিলে জাল নৌকা ও জীবন সবই হারাতে হয়। এই দুর্ভোগ লেগে আছে সারা বছর। প্রাকৃতিক দুর্যোগের সময় বসবাসকারীরা থাকে আতংকিত। নেই দ্বীপে কোন বেড়িবাঁধ। পানি উন্নয়ন বোর্ড এ দ্বীপে বেড়ীবাধ ও হাতিয়া-নিঝুম দ্বীপ ক্রসড্যাম নির্মাণের একটি প্রকল্প ২০০৯ সালে উর্ধতন কতৃপক্ষের বরাবরে পাঠালেও তা ফাইলবন্দী হয়ে পড়ে আছে। তবে উপজেলা এলজিইডি দ্বীপে ১২ কিমি পাকা রাস্তা ও কয়েকটি ব্রিজ ও কালভাট নির্মাণ করেছে।