এক কলসি পানির জন্য দুই মাইল হাঁটছে মানুষ!

আপডেট : ৩০ মে ২০১৪, ২২:৩৮
শুষ্ক মৌসুমে সুন্দরবন সংলগ্ন বাগেরহাটের শরণখোলা থেকে সাতক্ষীরার শ্যামনগর পর্যন্ত ১৬ উপজেলায় খাবার পানির তীব্র সংকট দেখা দিয়েছে। এসব উপজেলায় প্রায় ৫০ লাখ মানুষ বসবাস করেন। এক কলসি পানি সংগ্রহের জন্য এক গ্রাম থেকে অন্য গ্রামে ছুটছেন সেখানকার বাসিন্দারা। সুপেয় পানির জন্য অন্ততপক্ষে দুই মাইল দূরে হেঁটে যেতে হচ্ছে তাদের। পাইকগাছা উপজেলার লতা ইউনিয়নের শামুকপোতা গ্রামের একেকটি পরিবারকে প্রতি মাসে ক্ষেত্র বিশেষে ৪শ’ থেকে ৬শ’ টাকার পানি কিনে খেতে হচ্ছে। সাতক্ষীরা ভিত্তিক স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন ‘উত্তরণ’র এক গবেষণা প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, দক্ষিণ-পশ্চিম অঞ্চলের নদীগুলো আগের মত খরস্রোতা না থাকায় মিঠা পানির উত্স কমে গেছে। সুপেয় পানির অভাবের কারণগুলো হল— গঙ্গা নদীর গতিমুখ পরিবর্তন, অবৈধ দখলদারদের কবলে পড়ে খাল ও নদীর স্বাভাবিক প্রবাহ হ্রাস, ভূ-গর্ভস্থ পানির স্তর অস্বাভাবিকভাবে নীচে নেমে যাওয়া, সার ও কীটনাশকের ব্যবহার, যত্রতত্র উপকূলীয় বাঁধ নির্মাণ, বৃষ্টিপাত তুলনামূলকভাবে কমে যাওয়া, লবণাক্ততা ক্রমশ বৃদ্ধি পাওয়া, শুষ্ক মৌসুমে বোরো ক্ষেতে অবিরাম সেচ প্রদান, হাসপাতাল ও ক্লিনিকের বর্জ্য দ্বারা পানি দূষণ, ফারাক্কা বাঁধের ফলে মিষ্টি পানি আসার পথ রুদ্ধ, ভূ-গর্ভস্থ জলাধারের অভাব এবং সমুদ্র পৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধি। সূত্র মতে, দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের প্রায় ৭৯ শতাংশ নলকূপে মাত্রাতিরিক্ত আর্সেনিক রয়েছে। জরিপে উল্লেখ করা হয়েছে, খুলনার ডুমুরিয়া, কয়রা, পাইকগাছা, দাকোপ, বটিয়াঘাটা, সাতক্ষীরার আশাশুনি, শ্যামনগর, কালিগঞ্জ, দেবহাটা, তালা, বাগেরহাটের সদর, রামপাল, মংলা, শরণখোলা, চিতলমারী এবং মোড়লগঞ্জের বিভিন্ন গ্রামের অধিবাসীরা এখনো মিঠা পানির উেসর নাগালের বাইরে রয়েছেন। পাইকগাছা উপজেলার জনস্বাস্থ্য বিভাগের উপ-সহকারী প্রকৌশলী শেখ সরফরাজ আলী জানান, গভীর নলকূপ বসানোর ক্ষেত্রে সফলতা না পাওয়ায় অগভীর নলকূপ, বৃষ্টির পানি, পুকুরের পানি ব্যবহার করে খাবার পানির সংকট মোকাবেলা করতে হচ্ছে। দাকোপের জনস্বাস্থ্য বিভাগের প্রকৌশলী মো. মঞ্জুর মোর্শেদ চৌধুরী বলেন, আমরা এলাকায় গভীর পানির নলকূপ বসানোর চেষ্টা করেছি, কিন্তু পানির স্তর অধিক মাত্রায় নীচে নেমে যাওয়ায় সে উদ্যোগ সফল হয়নি। মংলার উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা বলেন, সেখানকার চিত্রও একই রকম। তবে পূর্বের তুলনায় বর্তমানে সংকট খানিকটা কমেছে। জনস্বাস্থ্য প্রকৌশলী অধিদপ্তরের মতে, প্রজেক্টের মাধ্যমে পৌরসভায় পানির সংকট দূর করার চেষ্টা চলছে। ২৫ কিলোমিটার দূরে পাইপলাইন বসানো হয়েছে। দ্বিতীয় ফেজে ১২ দশমিক ৭৫ কিলোমিটার দূরত্বে পাইপলাইন বসিয়ে শহর এলাকায় পানি সরবরাহ করা হচ্ছে। গ্রামের দিকে রেইন ওয়াটার হার্ভেস্টিং প্লান্ট, এম এ আর প্লান্ট, পি এস এফ প্লান্ট, এস এফ পি প্লান্ট, রিভার অসমোসিস প্লান্ট প্রভৃতির মাধ্যমে মিঠা পানি সংরক্ষণের ব্যবস্থা নেয়া হয়েছে। পাইকগাছা উপজেলার লতা ইউনিয়নের চেয়ারম্যান কাজল কান্তি বিশ্বাস জানান, বর্ষা মৌসুমে চার মাস বৃষ্টির পানি সংরক্ষণ করে মানুষ তাদের চাহিদা মিটায়। বছরের বাকি আট মাস পানি কিনে পান করতে হয়। এই ইউনিয়নের শামুকপোতা গ্রামের অধিবাসী বিরাজ কান্তি মণ্ডল জানান, সংসারের প্রয়োজনে তাকে প্রতি মাসে অন্তত ৫শ’ টাকার পানি কিনতে হয়। আশাশুনি উপজেলার শ্রীউলা গ্রামের অধিবাসীরা দুই মাইল পথ হেঁটে এসে চৌধুরী বাড়ি গিয়ে পানি সংগ্রহ করে। এনজিও সূত্র মতে, অপরিকল্পিতভাবে মাত্রাতিরিক্ত ভূ-গর্ভস্থ পানি উত্তোলনের ফলে দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলে সুপেয় পানি সংকটের সৃষ্টি হয়েছে। সমীক্ষায় বলা হয়েছে, সেচ ব্যবস্থায় পাম্প প্রক্রিয়ায় ক্রমাগত ভূ-গর্ভস্থ পানি উত্তোলনের কারণে তলদেশের পানির প্রবাহ হ্রাস পেয়েছে।