মা নি ক মি য়া

একজন সত্ প্রতিবেশী

আপডেট : ৩১ মে ২০১৪, ১৯:৩৩
ধানমন্ডিতে আমার বাড়ি এবং মানিক ভাইয়ের বাড়ি পাশাপাশি। আমার বাড়িটি নির্মাণ করি ১৯৬০ সালে, ইহার কিছুদিন পর মানিক ভাই তাহার বাড়িটি নির্মাণ করেন। ওই সময় এই এলাকায় একটি বাড়ি ছাড়া আর কোনো বাড়ি ছিল না। মানিক ভাইয়ের সাথে আমার প্রথম পরিচয় হয় ধানমন্ডিতে। এই সময় আমার বাড়ির বাউন্ডারির কাজ চলতেছিল। একদিন মানিক ভাই আমার পাশে তাহার প্লটটি দেখিতে আসেন, তখন তাহার সাথে আলাপ ও পরিচয় হয়, যদিও তাহার নাম ও পরিচয় আমার জানা ছিল। তাহার ফটো আমি পত্র-পত্রিকায় বহুবার দেখিয়াছি, কিন্তু ব্যক্তিগত পরিচয় ছিল না। আমার প্লটের পশ্চিম পাশের প্লটটি তাহার। তখন আমি আমার বাড়ির কমন বাউন্ডারি দেওয়ার ব্যাপারে তাহার সহিত আলাপ করি এবং অনুরোধ করি সীমানা দেখাইয়া দেওয়ার জন্য, যাহাতে আমি ওয়ালটা সঠিক জায়গায় করিতে পারি। তখন তিনি বলিলেন, ‘আপনি মাপঝোখ করিয়া সঠিক জায়গায় করুন আমার কোনো আপত্তি থাকিবে না।’ আরও বলিলেন, ‘যেহেতু পশ্চিমের ওয়ালটি আমাদের দুইজনের করার কথা সেহেতু আপনি ওয়ালটি করুন এবং যে খরচ পড়িবে তাহার হিসাব রাখিবেন এবং আমাকে জানাইলে ৫০% টাকা আমি আপনাকে দিয়া দিব।’ ওই সময় ধানমন্ডির সব বাড়ির বাউন্ডারির ওয়াল হইত মাত্র আড়াই ফুট উঁচু, তখনই আমি বুঝিলাম মানিক ভাই একজন উদার মনের মানুষ। ইহার পরে আমার প্রতিবেশী হিসেবে তিনি এবং তাহার স্ত্রী যতদিন বাঁচিয়া ছিলেন ততদিন একজন সত্ প্রতিবেশীর কাছ থেকে যে সুন্দর ও ভালো ব্যবহার পাওয়ার কথা ছিল তাহা আমি পাইয়াছি। তাহার পুত্র-পুত্রবধূর কাছ থেকেও আমি সত্ প্রতিবেশী সুলভ ব্যবহার ও সম্মান পাইতেছি। আমার বর্তমান বয়স ৮৩ বছর চলিতেছে। আমি সবসময় ফজরের নামাজের পর আমার প্রতিবেশীদের জন্য দোয়া করি। বিশেষ করিয়া মানিক ভাই ও তাহার স্ত্রীর জন্য খাস দোয়া করি। সত্ প্রতিবেশি হিসেবে মানিক ভাইয়ের কয়েকটি সুন্দর স্মৃতি কথা না বললেই নয়।  তখন আমাদের বাড়ির বাউন্ডারির ওয়াল মাত্র আড়াই ফুট উঁচু, ওই সময় মানিক ভাই সকালে সাধারণত তাহার বাড়ির পিছনে বিরাট বারান্দায় একটি ইজি চেয়ারে বসিতেন এবং বিকালে সামনের বাগানে বসিতেন, কাজেই আমি ঘর হইতে বাহির হইলে প্রায় সবসময়ই তাহার সাথে দেখা হইত। একদিন তিনি আমাকে জিজ্ঞাসা করিলেন, ‘আপনার বাচ্চাদের কোথা হইতে দুধ খাওয়ান?’ তখন আমি বলিলাম, ‘একজন গোয়ালা হইতে দুধ লই।’ তখন তিনি তাহার বাবুর্চিকে ডাকিয়া বলিলেন, ‘কাল হইতে মুহিত সাহেবকে দুই সের করিয়া দুধ দিবা।’ তখন হইতে তিনি এবং তাহার মৃত্যুর পর তাহার স্ত্রী যত দিন বাঁচিয়া ছিলেন ততদিন, তারপর আনোয়ার হোসেন মঞ্জুর কাছ হইতে এই দুধ আমি পাইতে থাকি যত দিন না আনোয়ার হোসেন মঞ্জু ধানমন্ডির বাড়িতে গরু পালা বন্ধ করিয়া দেন। এইখানে বিশেষভাবে আমি বলিতে চাই যে, এই দুধের জন্য আমি মানিক ভাইকে এবং তাহার পরিবারকে কোনো টাকা দিতে পারি নাই।  মানিক ভাই প্রায়ই বরিশাল হইতে বড় মাছ আনিতেন এবং খুব সকাল বেলা ওই মাছ তিনি দক্ষিণের বারান্দায় ইজি চেয়ারে বসিয়া বাবুর্চি দ্বারা কাটাইতেন। যেহেতু তিনি একটু উচ্চৈঃস্বরে কথা বলিতেন, সেহেতু আমি আমার বেডরুম হইতে বুঝিতে পারিতাম যে আজ একটি বড় মাছ আসিয়াছে। তখন আমার স্ত্রীকে বলিতাম, একটু পরেই মানিক ভাইয়ের বাড়ি হইতে এক টুকরা বড় মাছ আসিবে। এইরূপ অনেক ঘটনা আছে যাহা লিখিতে গেলে ২০/৩০ পাতায় শেষ হইবে না। আনোয়ার হোসেন মঞ্জু ও তাহার স্ত্রী এই ট্রেডিশনটি রক্ষা করিয়া চলিতেছেন। সত্ ও ভালো প্রতিবেশী পাওয়া ভাগ্যের ব্যাপার। আমার পূর্ব দিকের বাড়ির মালিক মরহুম আবদুল হামিদ সাহেব। তিনি চিফ কনজারভেটার অব ফরেস্ট ছিলেন এবং তিনি আমার একজন বন্ধুসুলভ ব্যক্তি ছিলেন। বর্তমানে সেই বাড়িতে তাহার পুত্র (অব.) সচিব আসফাক হামিদ থাকেন। সে আমার পুত্রের মতো। একজন সত্ ও ভালো মানুষ। আমার দক্ষিণ দিকে যাহার থাকেন তাহারাও মোটামুটি ভালো। মানিক ভাইয়ের ব্যাপারে লিখিতে গেলে লেখার শেষ নাই। মানিক ভাইয়ের বাসায় আমি পাকিস্তান আমল হইতে বড় বড় নেতাদের আসিতে দেখিয়াছি। যেমন—খান অব কালাবাগ, গাফ্ফার খানের ছেলে, হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী সাহেবসহ আরও অনেককে। সোহরাওয়ার্দী সাহেবের সাথে আমি কয়েকবার এই বাড়িতে দেখা করিয়াছি। তিনি আমার কোম্পানির একটি রিট আবেদনের উকিল ছিলেন। ওনার সাথে ছিলেন শ্রী সবিতা রঞ্জন পাল ও হামিদুল হক চৌধুরী। বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য যে বাংলাদেশ হওয়ার কিছুদিন পূর্বে প্রত্যেক দিন সকালে শেখ মুজিবুর রহমান সাহেব একটি লুঙ্গি ও চাদর গায়ে দিয়া মানিক ভাইয়ের বাসায় আসিতেন। ওই সময় মানিক ভাই দক্ষিণের বারান্দায় বসিতেন। মুজিব সাহেব উচ্চৈঃস্বরে ‘মানিক ভাই মানিক ভাই’ ডাকিতে ডাকিতে সেখানে প্রবেশ করিতেন। ওনার ডাকের আওয়াজে প্রত্যেকদিন আমার ঘুম ভাঙিয়া যাইত, কারণ আমার বেড রুমের পশ্চিমের জানালাটি মানিক ভাইয়ের দক্ষিণের বারান্দার খুব কাছাকাছি ছিল এবং তখন বাউন্ডারি ওয়ালটি ছিল মাত্র আড়াই ফুট উঁচু, কাজেই আমার জানালার কাছে দাঁড়াইলে আমি তাহাদের দেখিতে পাইতাম। ওইসব ঘটনা ও আরও এইরূপ ঘটনা আমার স্মৃতিতে আজও উজ্জ্বল হইয়া আছে, কিন্তু এইসব ঘটনা বলার বা শোনার কেহই নাই। সত্ প্রতিবেশীকে আল্লাহ পছন্দ করেন, আমি দোয়া করি আল্লাহ সত্ প্রতিবেশী মানিক ভাই ও তাহার স্ত্রীকে বেহেস্ত নসিব করুন এবং তাহাদের সন্তানদের মঙ্গল করুন। লেখক :পরিচালক, সোস্যাল ইসলামী ব্যাংক লি.