ফাঁকা রাস্তায় ছিন্নমূল মানুষের ‘শান্তি’র ঘুম

আপডেট : ৩১ মে ২০১৪, ২৩:০২
রাত দুইটায় নীলক্ষেতের মোড়ে আইল্যান্ডের ওপরে ষাটোর্ধ্ব মাসুমা বিবি বিছানা পেতে বসে বসে ঢুলছেন। পাশেই বৃদ্ধ আব্দুল মান্নান শুয়ে শুয়ে কথা বলতে বলতে কখন যে নাক ডাকতে শুরু করেছেন তা নিজেও জানেন না। এ দুই ছিন্নমূল মানুষের পাশেই আইল্যান্ডে হোর্ডিং-এ হাস্যোজ্বল নারীর মুখ। সেখানে বিজ্ঞাপনে শান্তির সন্ধান দিচ্ছেন তারা। বিজ্ঞাপনে বলা সেই শান্তির খোঁজ না পেলেও হোর্ডিং-এর নিচে পরম ‘শান্তি’তে ঘুমাচ্ছেন এই দু’জন। রাতের নিস্তব্ধতা যেমন অনেকের কাছে আতঙ্কের কারণ, অনেকের কাছে সেই নীরবতা আসে আশীর্বাদ হয়ে। যাদের ঘর নেই, ছিন্নমূল উদ্বাস্তু মানুষ রাজধানীর আনাচে-কানাচে তখন খুঁজে নেয় ঘুমানোর নিভৃত কোণ। বন্ধ দোকানের সামনে, সিঁড়ির ধাপে কিংবা রাস্তার আইল্যান্ডে চট বিছিয়ে বেঘোরে ঘুমায় তারা। নগর জুড়ে সোডিয়াম বাতিগুলো মায়াময় আলো ছড়ায়। সেই হলুদ আলোয় এসব মানুষের দুঃখময় জীবনও যেন ফিকে রং ধারণ করে। সারাদেশের বিপন্ন মানুষের প্রধান গন্তব্যই যেন এই রাজধানী ঢাকা। শুধু শিক্ষার্থী ও শিক্ষিত বেকাররাই নন—গৃহহীন, উদ্বাস্তু মানুষের মিছিলও ঢাকায় এসে খুঁজে নিতে চায় আয়ের পথ। এসব মানুষকে বুকে জায়গা করে দেয় রাজধানী ঢাকা। প্রত্যেকের দুঃখ, দীর্ঘশ্বাস, আনন্দের মুহূর্ত মিশে থাকে এই বাতাসে। প্রত্যেকেই এই শহরকে কেন্দ্র করেই ফেরাতে চায় তাদের ভাগ্য কিংবা কোনোমতে টিকিয়ে রাখে তাদের অস্তিত্ব। বাংলামোটর মোড়ের সোহাগ কমিউনিটি সেন্টারের সামনে মাঝে মাঝেই বসে খাবারের হাট। কমিউনিটি সেন্টারে বিয়ের অনুষ্ঠান শেষ হয়ে গেলে জমে এই হাট। দরিদ্র ছিন্নমূল মানুষ আর রিকশাওয়ালারাই এর ক্রেতা। এমন খাবার মেলে শাহবাগেও। সুমন সোনারগাঁও হোটেলের সামনে ফুল বিক্রি করে। পথের ধারের দোকানের বিরিয়ানি খেয়ে সে ঘুমানোর জায়গা খুঁজে নেয়। বাড়ি থেকে পালিয়ে আসা সুমনের এই শহরে তার বয়সী কয়েকজন ছেলে ছাড়া আর কেউ নেই। তবে ঢাকার রাস্তায় একটু নিভৃত কোণে পলিথিন দিয়ে বানানো ঘরেও বেশ কিছু পরিবার বাস করে। রাতের ঢাকায় তাদের এই ঘরগুলোর সামনে রাতের বেলা জ্বলে ওঠে চুলা। রান্না চড়ানো চুলাকে ঘিরে বসে থাকে ছেলে-মেয়েরা। ব্যস্ত ঢাকার মানুষ যখন ঘুমায় তখন এই ছিন্নমূল মানুষগুলো যেন জেগে ওঠে। সুনসান রাস্তাগুলো তখন হয়ে ওঠে বাচ্চাদের খেলার জায়গা। পা ছড়িয়ে গল্প করে সারাদিন কাজ করা মানুষরা। ঢাকা শহর জুড়েই ছড়িয়ে আছে এমন ছিন্নমূল মানুষদের জীবন। শাহজাহানপুরে রাজারবাগ পুলিশ লাইনের উল্টো পাশে ঘুমান ষাটোর্ধ্ব চান মিয়া। বললেন, দিনের বেলা ভিক্ষা করি। রিকশা চালাতে পারি না। একটা দোকান বানানোর জন্য টাকা জমাচ্ছি। ১০ হাজার টাকা জমলেই তিনি ফিরে যাবেন কুষ্টিয়ায় গ্রামের বাড়িতে। তবে পরিবার নিয়ে চলে এসেছেন অনেকেই। উপকূল এলাকার জমি হারানো, স্বজন হারানো বিপন্ন মানুষ চলে এসেছেন নিজেদের ভাগ্য ফেরাতে। বস্তিতে ঘর ভাড়া করে থাকার মত আয় নেই বলে রাস্তার ধারেই বসবাস। এমনই একজন খলিল। দুইটা বাচ্চা আর বউকে নিয়ে থাকেন ঢাকার ফুটপাতে। কখনো ধানমন্ডির ৮ নম্বর ব্রিজের ওপরে। কখনো অন্য কোনো অন্ধকার রাস্তায়। তিনি বললেন, পুলিশ শুতে দেয় না। আমাদের তো কেউ বিশ্বাস করে না। চুরি-টুরি করি কি-না। এজন্য এক জায়গায় বেশিদিন থাকতে দেয় না। আজ এখানে কাল সেখানে মাথা গুঁজে দিন পার করি। তবে তিনি জানালেন, রিকশা চালানো শুরু করেছেন। হাতে কিছু টাকা জমলেই বস্তিতে উঠে যাবেন। ঘর ভাড়া নিয়ে থাকবেন। রাতের বেলা বউ-বাচ্চা নিয়ে খোলা জায়গায় থাকতে ভয় করে তার।